• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন বাস্তবতা যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে

প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:০৭
আপডেট: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:০৭

মতামত জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন বাস্তবতা যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে

মতামত জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন বাস্তবতা যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে

শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত

শিল্পায়ন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, নগরায়ণ ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের জ্বালানি চাহিদাও বাড়ছে। ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, এভিয়েশন ফুয়েল ও লুব্রিকেন্টের পাশাপাশি এলপিজি ও এলএনজির ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে জ্বালানি এখন শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহনের বিষয় নয়। এটি মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আনতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও আমদানি ব্যয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বেশি দামে জ্বালানি কিনলে পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প—সব খাতেই উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।

আমাদের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা পরিশোধন সক্ষমতা। রাষ্ট্রীয় ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান সক্ষমতা বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন, যা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় বেশ কম।

জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পাম্পে দাম বাড়ে না। বাড়ে পরিবহন ব্যয়, খাদ্য উৎপাদন ব্যয়, শিল্পের খরচ এবং আমদানি ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর
ফলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে গেলে সেই সুবিধা পুরোপুরি নেওয়ার সুযোগও সীমিত থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪৫ লাখ টনে নেওয়ার পরিকল্পনা তাই দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বাংলাদেশের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র বা পরিশোধনাগারে হামলা হলে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে সংঘাত শেষ হলেও তার অর্থনৈতিক অভিঘাত কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটা আরও বেশি। কারণ, আমাদের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশ থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এলএনজির ক্ষেত্রে কাতারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে। এই বহুমুখীকরণকে এখন আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো পর্যাপ্ত মজুত। সাম্প্রতিক সংকটে দেশের ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মজুত স্বাভাবিকের তুলনায় নেমে আসার ঘটনা আমাদের সতর্ক করেছে।

শুধু নিয়মিত আমদানি করলেই হবে না, অন্তত ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে না। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের শিল্প ও পরিবহন খাতও আগাম সরবরাহ পরিকল্পনা করতে পারবে, যা অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা কমাবে।

এর পাশাপাশি আমদানির অর্থায়নব্যবস্থায় নমনীয়তা দরকার। জ্বালানি আমদানিতে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা তারল্য নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যখন কম থাকে, তখন আগাম বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ব্যবহারের সক্ষমতাও তৈরি করা প্রয়োজন।

ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি সময়ে ভারত থেকে ডিজেল আনার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। একইভাবে চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি বাড়ানো যেতে পারে। তবে বিকল্প উৎস মানে শুধু বেশি দেশ থেকে তেল কেনা নয়। বিকল্প সমুদ্রপথ, বন্দর, পাইপলাইন, টার্মিনাল ও সংরক্ষণ সক্ষমতাও তৈরি করা।

জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত দক্ষতাও বাড়াতে হবে। গভীর সমুদ্রবন্দর, টার্মিনাল, পাইপলাইন, স্টোরেজ ট্যাংক ও রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানি করা জ্বালানি দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে একদিকে পরিবহন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কোনো একটি বন্দর বা সরবরাহ পথে সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে। জ্বালানি মজুতের পাশাপাশি এসব অবকাঠামোর সক্ষমতাকেও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং গণপরিবহনের উন্নয়ন তেলের ওপর চাপ কমাতে পারে। শিল্পকারখানায় জ্বালানিদক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা আগেই করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে হঠাৎ ঘাটতি তৈরি না হয়।

জ্বালানি খাতে আরেকটি সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকির চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকার যদি পুরো বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর না দেয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার আর্থিক চাপ বাড়ে। আবার পুরোটা সমন্বয় করলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তাই জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ সূত্র, নিয়মিত সমন্বয় এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার।

জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা পেট্রোবাংলার দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। জ্বালানি, অর্থ, পররাষ্ট্র, বিদ্যুৎ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত নীতি দরকার। সংকটের সময় আলাদা সিদ্ধান্ত নিলে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি লাগে।

তাই একটি স্থায়ী আন্তমন্ত্রণালয় জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো থাকা দরকার, যেখানে সরবরাহ, মজুত, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাজার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ও ব্যাংকগুলোকেও এই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পাম্পে দাম বাড়ে না। বাড়ে পরিবহন ব্যয়, খাদ্য উৎপাদন ব্যয়, শিল্পের খরচ এবং আমদানি ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

আ/আ


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com