শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
ভোর ৬টা। ঢাকার একটি ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন সুমি আক্তার (ছদ্মনাম)। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। প্রতিদিনের এই পথচলা তার জন্য এক যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। জ্যাম, গণপরিবহনে সিট না পাওয়া, আর চারপাশের কিছু মানুষের অস্বস্তিকর দৃষ্টি– সব মিলিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তার অর্ধেক শক্তি ফুরিয়ে যায়। অন্যদিকে, প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহবধূ তাহমিনা বেগম (ছদ্মনাম)। হাঁস-মুরগি পালন আর সেলাইয়ের কাজ করে তিনি সংসারে বাড়তি আয় আনেন। কিন্তু সংসারের বড় কোনো সিদ্ধান্তে কিংবা নিজের জমানো টাকা খরচের ক্ষেত্রে আজও তার কোনো স্বাধীনতা নেই।
সুমি কিংবা তাহমিনা– আমাদের সমাজের কোটি নারীর প্রতিনিধি। তারা লড়ছেন, নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমাজ কি তাদের সেই লড়াইকে সহজ করে দিচ্ছে, নাকি পদে পদে বাধা তৈরি করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই যে সত্যটি প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে তা হলো– নারীর ক্ষমতায়নে নারীবান্ধব সমাজের কোনো বিকল্প নেই।
ক্ষমতায়ন আসলে কী?
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে ধারণা ছিল, নারীর শিক্ষা লাভ করা কিংবা চাকরি করাই বুঝি ক্ষমতায়ন। কিন্তু আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ক্ষমতায়নের কেবল একটি অংশ মাত্র। প্রকৃত ক্ষমতায়ন হলো নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। একজন নারী যখন কোনো ভয় বা সংকোচ ছাড়া নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং সমাজ যখন সেই মতামতকে গুরুত্ব দেয়, তখনই প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটে।
নারীবান্ধব সমাজ: স্বপ্নের বাস্তব রূপ
একটি নারীবান্ধব সমাজ বলতে আমরা কী বুঝি? এটি এমন এক সামাজিক কাঠামো, যেখানে নারী শুধু একজন ‘ভোগ্যপণ্য’ বা ‘পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যম’ নন, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গণ্য হন। এমন সমাজের মূল ভিত্তিগুলো হলো: নিরাপত্তার নিশ্চয়তা: নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো নিরাপত্তা। ঘর থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া এবং নিরাপদে ফিরে আসার নিশ্চয়তা সমাজকে দিতে হবে। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রে যখন নারীরা হয়রানি ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকবেন, তখন তাদের কাজের গতি ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যাবে।
অর্থনৈতিক সমতা ও কাজের স্বীকৃতি: যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীকে মূল্যায়ন করতে হবে। সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর আইনি ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা নারীবান্ধব সমাজের অন্যতম দায়িত্ব।
সহায়ক অবকাঠামো: একজন নারী যখন মা হন, তখন তার ক্যারিয়ার ও মাতৃত্বের মধ্যে এক বিশাল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একটি নারীবান্ধব সমাজ এই সমস্যার সমাধান করে। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে মানসম্মত ডে-কেয়ার সেন্টার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং নারীবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা নারীর পেশাদার জীবনকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
মানসিকতার পরিবর্তন: আইন করে বা সুযোগ তৈরি করে হয়তো সাময়িক পরিবর্তন আনা যায়, কিন্তু টেকসই পরিবর্তনের জন্য দরকার দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকায়ন। কন্যাশিশুকে ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া এবং ছেলেশিশুকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানো– এই মানসিক পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে পরিবার থেকেই।
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। রাজনীতি, প্রশাসন, করপোরেট সেক্টর থেকে শুরু করে পোশাকশিল্প আর খেলাধুলার মাঠেও আমাদের নারীরা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। কিন্তু এই অর্জনের পেছনে রয়েছে নারীদের একক লড়াই ও ত্যাগ। সমাজ কি এখনো পুরোপুরি নারীবান্ধব হতে পেরেছে?
পরিসংখ্যান ও প্রতিদিনের খবর আমাদের ভিন্নকথা বলে। আজও কর্মজীবী নারীকে ঘরের সব কাজ সামলে অফিসে যেতে হয়, যাকে আমরা বলি ‘ডাবল বার্ডেন’ বা দ্বিগুণ বোঝা। আজও রাতে একা পথ চলতে একজন নারী নিরাপদ বোধ করেন না। আজও বিয়ের পর অনেক উচ্চশিক্ষিত নারীকে ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে হয় পরিবারের চাপে। অর্থাৎ নারীর ব্যক্তিগত উন্নয়ন ঘটলেও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
নারীবান্ধব সমাজ কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি নারীর মানবাধিকার। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের কোণে বা ভয়ের চাদরে বন্দি রেখে কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না।

