ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁর শানিত কলম কখনো থামেনি, চরমপন্থার রক্তচক্ষু কিংবা মৃত্যুর পরোয়ানাও যাকে একচুল পিছু হঠাতে পারেনি—দক্ষিণাঞ্চলের সেই চারণ সাংবাদিক, ঝিনাইদহ অঞ্চলে ভিডিও জার্নালিজমের অন্যতম প্রথাপ্রদর্শক আসিফ কাজল পা দিলেন জীবনের ৫৩তম বছরে। ঝিনাইদহের ক্ষুরধার এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ৫৩তম জন্মবার্ষিকী আজ।১৯৭৩ সালের এই দিনে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আসিফ কাজল। নব্বইয়ের দশকে কলেজ জীবনের উত্তাল দিনগুলোতে যখন অনেকেই ক্যারিয়ারের নিরাপদ বাতিঘর খুঁজছিলেন, তখন তিনি বেছে নিয়েছিলেন সত্য অনুসন্ধানের কণ্টকাকীর্ণ পথ। তৎকালীন জেলার একমাত্র সংবাদপত্র ‘দৈনিক ঝিনাইদহ’-এর পাতায় তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে ‘ঝিনেদার বাণী’র বার্তা সম্পাদক হিসেবে মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখে গ্র্যাজুয়েশনের পর পুরোদমে ঝাঁপিয়ে পড়েন এই পেশায়।
নব্বই ও দুই হাজার দশকের প্রারম্ভে চরমপন্থী অধ্যুষিত ঝিনাইদহের মাটি যখন রক্তাক্ত, তখন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অপরাধ ও দুর্নীতির রোমহর্ষক চিত্র তুলে এনেছেন তিনি। ‘দাদা তপন’-এর জনযুদ্ধ, ‘হানিফ বাহিনী’র পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি কিংবা মীর ইলিয়াসের ‘গণমুক্তি ফৌজ’—সব কটি কুখ্যাত চরমপন্থী দলই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জারি করে তথাকথিত ‘মৃত্যুদণ্ড’। কিন্তু লাল ফিতার হুমকি বা বন্দুকের নলকে তুচ্ছজ্ঞান করে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যে সাহসী সংবাদ পরিবেশন করেছেন, তা মফস্বল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।তিনি কেবল কলম সৈনিকই নন, ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক দূরদর্শী সংবাদকর্মী। বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জেলা প্রতিনিধি হিসেবে ঝিনাইদহে প্রথম ভিডিও সাংবাদিকতার নবদিগন্ত উন্মোচন ঘটে তাঁর হাত ধরেই। তাঁর হাত ধরে ও দিকনির্দেশনায় তৈরি হয়েছে একঝাঁক ক্ষুরধার তরুণ সাংবাদিক, যারা আজ জাতীয় গণমাধ্যমে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বিটিভি, পিআইডি ও ইউনিসেফসহ দেশি-বিদেশি প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৯টি বিশেষ পেশাদার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন এক ক্ষুরধার ও আধুনিক সাংবাদিক হিসেবে।মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানী কাজের অসামান্য স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি’ তাঁকে “দেশসেরা” মাঠ সাংবাদিকের অনন্য সম্মানে ভূষিত করে। ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবের সাবেক এই সফল সভাপতি তাঁর চারণ সাংবাদিকতার জন্য লোকমুখে স্থান করে নিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের ‘মোনাজাত উদ্দীন’ হিসেবে। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ইউএনবি (UNB), দেশের জনপ্রিয় দৈনিক ইনকিলাব ও দৈনিক লোকসমাজ-এর স্টাফ রিপোর্টার এবং স্থানীয় বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় ‘দৈনিক নবচিত্র’ পত্রিকার বার্তা প্রধান হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।সংবাদের পেশাদারি গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক ভাষার সুর ও সংস্কৃতি রক্ষায় তিনি এক অনন্য নিবেদিত প্রাণ। ‘আঞ্চলিক ভাষা ফাউন্ডেশন’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে মাঠের প্রান্তিক মানুষের মেঠো ভাষাকে রম্য গল্প, চুটকি ও ক্ষুরধার কলামে রূপ দিয়ে সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটিয়ে তোলেন সাহিত্যরসে। শুধু তা-ই নয়, কলমের পাশাপাশি লেখনীর শক্তিতে অসংখ্য অসহায় পরিবার ও সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন এই গুণী সাংবাদিক।আজকের এই শুভ দিনে ঝিনাইদহের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমের সহকর্মী, রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং হাজারো গুণগ্রাহী এই গুণী সাংবাদিককে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।













