শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
এনসিটি ইজারা চুক্তির প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যায় বন্দর ভবনের সামনে থেকে মশাল মিছিল বের করে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।ছবি: খবরের কাগজ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ইজারা চুক্তি সই হচ্ছে আজ ৮ অক্টোবর। এদিকে বন্দরের শ্রমিকনেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চুক্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে বন্দর অচল করে দেওয়া হবে।
এনসিটি চুক্তির অনুষ্ঠান সূচি খবরের কাগজের হাতে এসেছে। সেখানে উল্লেখ আছে, আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এই চুক্তি সই হবে। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকবেন। এর আগে গত ১ অক্টোবর এনসিটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন খবরের কাগজকে বলেন, ‘৮ অক্টোবর (আজ) ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে আমরা বিশ্বস্ত সূত্র থেকে আরও কিছুদিন আগেই জানতে পেরেছি। যদি তাই হয়, তাহলে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে।’
টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি ও বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘আমরা চাই না বন্দর, এনসিটি, সিসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া হোক। এই দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। এর আগের সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারও আমাদের আন্দোলনের কথা শুনতে বাধ্য হয়েছে। এবারও আমরা এমন আন্দোলন গড়ে তুলব, যেখানে জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে। জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে দিতে পারি না।’
এদিকে বিদেশিদের ইজারার হাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতারাও যোগ দেন। মশাল মিছিলটি বন্দর ভবনের সামনে থেকে পোর্ট কানেক্টিং রোড হয়ে বড়পুল গিয়ে শেষ হয়। এ সময় শ্রমিকদের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড ডিপি ওয়ার্ল্ড, গো ব্যাক গো ব্যাক’ স্লোগানে মুখরিত হয় পুরো এলাকা।
শ্রমিকনেতারা বলেন, বন্দর বিদেশিদের হাতে ইজারা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা জাতীয় স্বার্থের বিরোধী। আজ দেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে বন্দরকে বিদেশিদের হাতে বিক্রি করে দিতে চায় এ সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক স্থাপনা–এনসিটিসহ কোনো স্থাপনা দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। এ ছাড়া শ্রমিক ও বন্দরনির্ভর মানুষের জীবিকার জন্য হুমকি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যতে আরও কঠোর আন্দোলনের দিকে এগোচ্ছি। সরকারের কার্যক্রম আমাদের কঠোর আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বন্দরকে অস্থিতিশীল করা আমাদের লক্ষ্য নয়। কিন্তু এনসিটি নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আমাদের আন্দোলন আরও কঠোর হবে।’
এর আগে গত ৫ অক্টোবর এনসিটি-সিসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নেন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তির বিষয়ে কাজ শুরু হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি প্রক্রিয়ার কাজ জোরেশোরে এগিয়ে নিতে শুরু করে। তবে শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে চুক্তি প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। বিএনপি সরকার এই চুক্তি প্রক্রিয়ার কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়। নানা নাটকীয়তা শেষে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেই আলোচিত চুক্তি।
এই চুক্তি ইতিহাসে ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হবে
এক বিবৃতিতে জনমত উপেক্ষা করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির আয়োজনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি। এ চুক্তি ইতিহাসে কালো চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির নেতারা। গতকাল সন্ধ্যায় পাঠানো বিবৃতিতে নেতারা বলেছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ নিয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের নামে প্রচারিত আমন্ত্রণপত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) প্রকল্পের চুক্তি সই অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানানো হয়েছে। অথচ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই চুক্তির শর্ত, পরিচালনার অধিকার, আর্থিক দায় এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্টভাবে অবহিত না করে চুক্তি স্বাক্ষরের আয়োজন গভীর উদ্বেগের বিষয়। উন্নয়ন ও বিনিয়োগের কথা বলে জনমত উপেক্ষার এই প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করা যাবে না।
কমিটি স্পষ্টভাবে বলেছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার হলেও জনমত উপেক্ষা করে জাতীয় সম্পদ বিষয়ে একতরফা চুক্তি করার অধিকার নেই। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের জনগণের সম্পদ। জনগণের কাছে জবাবদিহি এড়িয়ে এই বন্দরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চেষ্টা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থি। জনগণের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হলে এ দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না। ইতিহাসে এই চুক্তি ‘কালো চুক্তি’ হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
বন্দরে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা প্রত্যাহার দাবি সিইউজের
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল স্থাপনা সুরক্ষার অজুহাতে অনুমতি ছাড়া ছবি, ভিডিও, স্কেচ ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নির্দেশনা জারির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বন্দরের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষিত এলাকা, অপারেশনাল তথ্য, স্কেচ, অবকাঠামোর ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ বা প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমে এসব তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সিইউজের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ এক বিবৃতিতে বলেন, বন্দরের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গণমাধ্যমের স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও প্রকাশের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।












