শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতাসীন দল বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবসহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচিত হন। তবে রাজনৈতিক প্রতিকূলতাসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত এক দশকে নতুন কাউন্সিল করতে পারেনি দলটি। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সপ্তম কাউন্সিল হওয়ার কথা জানানো হলেও এখন সেই সময়সূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে শূন্য পদ পূরণ ও নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ চলছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে কাউন্সিলের আগেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
গত জুনে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দলের সপ্তম কাউন্সিল হবে। দায়িত্বশীল অন্য নেতারাও একই সময়ের কথা জানিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের বিভিন্ন পদে নেতাদের পদায়ন এবং নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের তৎপরতায় কাউন্সিলের সময় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউন্সিল আরও পিছিয়ে যেতে পারে। বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতায় থাকলেও দলের হাইকমান্ড এখনই কাউন্সিল করার উপযুক্ত পরিবেশ মনে করছে না।
ওই নেতার ভাষ্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল মানে সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হওয়া। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো বর্ণিল সাজে সাজানো এবং নেতাকর্মীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করাই এই মুহূর্তে দলটির কাছে চ্যালেঞ্জ।
তবে কাউন্সিল না হলেও আগামী দিনে নেতৃত্বের ঘাটতি রাখতে চায় না বিএনপি। সে অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে দলের বিভিন্ন পদে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হচ্ছে এবং একাধিক শূন্য পদ পূরণ করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা হলেন, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম (ডোনার) ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। এর মধ্যে রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। বাকি তিন জন ছিলেন চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা।
এরপর ২০ আগস্ট বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একই দিন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলের গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘খ’ ধারার ৬ নম্বর উপধারা অনুযায়ী তাকে এই দায়িত্ব দেন দলীয় চেয়ারম্যান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় পদ ছাড়ার পর এবং নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ায় ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ জনে। বর্তমানে শূন্য থাকা স্থায়ী কমিটির আরও তিনটি পদ যেকোনও সময় পূরণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
এসব পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তাদের মধ্যে কমপক্ষে দুজন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও আলোচনায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে অন্য কাউকেও সামনে আনা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
কাউন্সিল ছাড়াই শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ
বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলীয় কাউন্সিল না হলেও নেতৃত্বের সংকট রাখতে চায় না নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এ জন্য অভ্যন্তরীণভাবে শূন্য পদ পূরণে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের শূন্য পদগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শূন্য পদগুলোতে নতুন নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
গত আগস্ট থেকেই এ প্রক্রিয়া চলছে। দলের একটি সূত্র জানায়, ডিসেম্বর নাগাদ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু পদে নতুন মুখ যুক্ত হতে পারেন। এসব তৎপরতার কারণে আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
আরেকটি সূত্র জানায়, শূন্য পদগুলোতে দলের গঠনতন্ত্র কঠোরভাবে অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কমিটির ঠিক নিচের সারিতে থাকা অথবা যোগ্য ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা নেতাদের পদায়ন করা হবে। এতে বিগত দেড় দশকে দলের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। কোনও হাইব্রিডকে স্থান দেওয়া হবে না।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারি নাগাদ দলের সপ্তম কাউন্সিলের কথা আলোচনায় ছিল। তবে এ মুহূর্তে এর সম্ভাবনা নেই। এ ধরনের প্রস্তুতিও এখনও শুরু হয়নি। বিভিন্ন কারণে এটি আরও পিছিয়ে যেতে পারে। তবে এ সময়ে অভ্যন্তরীণভাবে নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ত্যাগী ও যোগ্যরাই স্থান পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নতুন বছরেই ভারমুক্ত হচ্ছেন রিজভী?
বিএনপির চেয়ারম্যানের পরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ মহাসচিব। এ পদে আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ এবং মাঠের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিজ্ঞ নেতার ওপরই ভরসা রাখতে চান দলের হাইকমান্ড। এমনটি জানিয়েছেন একাধিক সূত্র। এ পদে এতদিন অনেক নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর রুহুল কবির রিজভী আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন।
গত ১৫ আগস্ট তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করায় এ ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। দীর্ঘদিন দলের দফতর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই মুহূর্তে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে রিজভীর নামই হাইকমান্ডের গুডবুকে। এ ক্ষেত্রে বিগত দিনে তার ত্যাগকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাই কাউন্সিল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২০২৭ সালের শুরুতেই তাকে ভারমুক্ত করা হতে পারে। তবে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
কাউন্সিলের চূড়ান্ত রোডম্যাপ নেই কেন?
বিএনপির নেতারা জানান, অতীতে দলীয় কাউন্সিলগুলো উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাউন্সিল ঘিরে সারা দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সদরে দলীয় পোস্টার-ব্যানার এবং শীর্ষ নেতাদের ছবি দিয়ে সাজানো হতো। তবে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল সীমিত পরিসরে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শর্তের কারণে তখন জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তারা।
এবারের সপ্তম কাউন্সিল স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলের নেতারা। তৃণমূল পর্যায়ে এর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সারা দেশের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবেন। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও নতুন সরকার হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জের কারণে এখনই এ ধরনের আয়োজনের উপযুক্ত পরিস্থিতি নেই। পাশাপাশি দেশবিরোধী শক্তির তৎপরতাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
আরেকটি সূত্র জানায়, বিএনপির চেয়ারম্যানের স্বাভাবিক মেয়াদ তিন বছর। তবে তারেক রহমান দায়িত্ব পেয়েছেন এক বছরও হয়নি। এ মুহূর্তে দলে তার বিকল্পও নেই। তাই এখনই কাউন্সিল হওয়া জরুরি নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্নভাবে তাদের দলীয় কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল করা যায়নি। এবার কাউন্সিল বর্ণিলভাবে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতিতে আরও সময় প্রয়োজন। চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হলে সবাইকে জানানো হবে।
পাঁচ দশকে দলীয় প্রধান যারা
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির ছয়টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয়েছে। প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে দলটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন চার নেতা, জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকে তা করতে পারেনি দলটি। এর জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন নেতারা।
বিএনপির প্রথম কাউন্সিল হয় ১৯৭৮ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর। এতে দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কাউন্সিলে চেয়ারম্যান হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। এরপর ১৯৮৪ সালের পর থেকে দায়িত্ব পান খালেদা জিয়া।
তৃতীয় কাউন্সিল হয় ১৯৮৮ সালের ৩ ও ৪ মার্চ, চতুর্থটি ১৯৯৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর এবং পঞ্চম কাউন্সিল হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। পঞ্চম কাউন্সিলে পুনরায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।
সবশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলেও চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ ধারার ৩ নম্বর উপধারা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তারেক রহমান।












