ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণের দাবিতে হঠাৎই আন্দোলনে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকরা। বিএনপি সরকারের আট মাসের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে ধরা হচ্ছে।
টানা কয়েকদিন ধরে চলা আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এরই মধ্যে শুধু রাজধানীর মিরপুরে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। আর এতে আসামি করা হয়েছে ১০ হাজার জনকে।
তবে এই আন্দোলনের পেছনে কী কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন।
টানা কয়েকদিনের মতো সোমবার (২ নভেম্বর) সকালেও রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। শ্রমিক আন্দোলনে আজও উত্তাল হয়ে ওঠে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকরা সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা ধরে শ্রমিকদের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ছুড়ে ও ধাওয়া দিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সকাল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকা অবরোধ করেন শ্রমিকরা। দুপুর ১২টা থেকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় এসে জড়ো হয়। এরপর শ্রমিকরা একযোগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেন।
এদিকে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে সড়কে নামতে দেয়নি পুলিশ। দুই দফায় আন্দোলনকারীরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, মিরপুর থানায় ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর, পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আজকেও কয়েকজনকে গ্রেফতার হয়েছে, তবে তাদের যাচাই-বাছাই চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত।
এছাড়া সকাল থেকে সাভার, আশুলিয়ায় আন্দোলনে নামেন পোশাকশ্রমিকরা। আশুলিয়ায় সকালে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্তের ওপারের ইশারায় দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন অনেকে। তিনি বলেন, কিছু পতিত শক্তির দোসর এখানে আছে। এই কয়েকদিন অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলেছে যেখানে সেখানে কোনো শ্রমিক ভাইবোন ছিলেন না। ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সীমান্তের ওপারের ইশারায় অনেকেই দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। আন্দোলন কঠোর হাতে দমনের হুুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরিতে কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মো. রাশেদ খাঁন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, সরকারের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিবো! লংমার্চ থেকে জামায়াতের আমিরের এমন বক্তব্যের পর শ্রমিক আন্দোলনের নামে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, এর দায় কি জামায়াত এড়াতে পারে?
যদিও শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, পোশাকশিল্পের অস্থিরতার ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তিনি ফেসবুকে লেখেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের মতো উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। কোনো মালিক কিংবা শ্রমিকই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন। এরই মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জরুরি বৈঠক করেন বিষয়টি নিয়ে। শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধের আহ্বান জানান সরকারের ঊর্ধ্বতনরা। এরপরও ঘোষণা উপেক্ষা করে আন্দোলনে নামেন শ্রমিকরা। ফলে এর পেছনে আসল রহস্য খুঁজছে পুলিশ।
এদিকে, বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক আন্দোলনের জেরে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকশ কারখানা।













