• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

জাতীয়

গুম হওয়া পরিবারের আকুতি অঙ্গীকার হোক: গুম চিরতরে বন্ধ হবে

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ ৫:২২
আপডেট: শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ ৫:২২

গুম হওয়া পরিবারের আকুতি অঙ্গীকার হোক: গুম চিরতরে বন্ধ হবে

নিউজ ডেস্ক
দিন যায় রাত আসে। অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। দরজায় কেউ কড়া নাড়লেই মনে হয় এই বুঝি প্রিয় সন্তান ডেকে বললো মা আমি এসেছি। দরজা খোলো। প্রিয়তম স্বামী এসে তার স্ত্রীকে বলছে ফারজানা দরজা খোলো। আমি এসে গেছি। একদিন দু’দিন নয়- গত ৫ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে একেকটি পরিবার এভাবেই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। কারো ছেলে হারিয়েছে। কারো স্বামী। কারো বা আদরের ভাইটি নিখোঁজ। তাদের প্রত্যেককেই প্রকাশ্যে জনসম্মুখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। কাউকে রাত আড়াইটায় স্ত্রীর পাশ থেকে সয্যাশায়ী থাকা অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছে র‌্যাব। গুম হওয়া ১০টি পরিবার তাদের স্বজনদের গুম হওয়ার ঘটনা শুনিয়েছেন। তারা চায় রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে অঙ্গীকার করুক যে দেশে আর কোনো গুম হবে না। গুম যেন চিরতরে বন্ধ হয়।

ভাইয়ের অপেক্ষায় থাকা সানজিদা বলেন, তেজগাঁও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তার খালাতোভাইকেসহ তুলে নেয়া হয়। শাহীনবাগের বাসায় সুমনের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন স্ত্রী নাসিমা আক্তার, দুই মেয়ে আফছা ইসলাম ও আরোয়া ইসলাম। মেয়েরা সব সময় বাবার ছবি হাতে নিয়ে কান্না করে। ছেলের শোকে মা সয্যাশায়ী। তিনি বলেন, মা পথ চেয়ে বসে আছেন কবে ভাইয়া ফিরবে। আমরা চাই আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গীকার করুক দেশে আর গুম হবে না। গুম চিরতরে বন্ধ হবে। দেশে এরকম জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন আর যেন না হয় তার অঙ্গীকার করতে হবে। এছাড়া যাদের গুম করা হয়েছে তাদের জীবিত ফেরত দেয়া হোক। তাদের সম্পর্কে জানানো হোক কোথায় আছেন। কেমন আছেন।

এমএ আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাত আড়াইটায় শাহীনবাগের নিজ বাড়ি থেকে র‌্যাব পরিচয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আদনানকে। স্ত্রীর পাশ থেকে তুলে নেয়া হয়। আদনান তেজগাঁও কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে মালয়েশিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা পেয়ে পড়তে যাবে- তার কিছুদিন আগেই তাকে নিয়ে যায়। আদনান তেজগাঁও থানা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে গুম বা নিখোঁজ হয়নি। আমাদের সবার সামনে থেকে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে যায়। এক বছর পর ২০১৪ সালের শেষে একবার খোঁজ পেয়েছিলাম সে আছে। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব জায়গায় আমরা খুঁজেছি। সবারই এক কথা- আমরা জানি না। ৪ ভাই বোনের মধ্যে আদনান সবার বড়। আদনানের শোকে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আদনানের বাবা ঢাকার একটি হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি বলেন, যারা গুম হয়েছে তারা ছাত্র, যুবক কিংবা বৃদ্ধ হোক তাদের খোঁজ আমরা চাই। সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যমে নিখোঁজদের পরিবারকে অতিসত্তর যেন তাদের বিষয়ে জানানো হয়। জাতীয় নেতৃবৃন্দের ওয়াদা করতে হবে সামনের দিকে ১টি মানুষও আর গুম হবে না। কোনো বৃদ্ধ পিতা-মাতা যেন সন্তান হারানোর কষ্ট না পায়। এটা জনগণের কাছে ওয়াদা করতে হবে।

আল আমিনের বাড়ি ঢাকার বাড্ডায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স মাস্টার্স শেষে এলএলবিতে পড়ালেখা করতেন তিনি। পাশাপাশি বিসিএসের জন্য চেষ্টা করছিলেন। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তিনি গুম হন। ৪ ভাই বোনের মধ্যে আল আমিন সবার বড়। বিএনপি করতেন। আল আমিনের ভাই রুহুল আমিন বলেন, বাবা মা তাকে ছাড়া একদমই ভালো নেই। কারণ ভাইয়ার ওপর আমরা সবাই নির্ভরশীল ছিলাম। আমরা চাই দেশে আর কোনো গুম না হোক। তারা যদি কোনো অন্যায় করে থাকে তাহলে তাদের জেলে পাঠানো হোক। এরচেয়েও বেশি অন্যায় করলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে লাশটা অন্তত আমাদের হাতে দেয়া হোক। আমরা তো এখন কিছুই করতে পারি না। না করতে পারি মৃতের দোয়া, না করতে পারি জীবিত থাকার দোয়া।

আসাদুজ্জামান রানার বোন মিনারা বেগম বলেন, ভাইয়ের কথাতো গত ৫ বছর ধরেই বলছি। আর কত বলবো। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর যে ৮ ব্যক্তিকে একদিনে গুম করা হয় রানা তাদের একজন। রানা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। নিখোঁজের পর জানতে পারি বিএনপির দলীয় তালিকায় তার নাম আছে। মুগদায় বড় বোনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করতেন রানা। ৫ ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পেশায় কৃষক বাবা আব্দুল রাজ্জাক ও মা আয়েশা সিদ্দিকা পরিবার নিয়ে রংপুরে থাকেন। ৫ বছর ধরে বাবা মা অপেক্ষার প্রহর গুনছে ছেলের জন্য।
মাজহারুল ইসলাম রাসেলের বাবা মো. আমিনুল হক বলেন, ২০১৩ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বারিধারা থেকে রাসেল নিখোঁজ হন। আমরা পরিবার নিয়ে শেরপুরে থাকি।

রাসেলের বাসা ছিল রাজধানীর নাখালপাড়ায়। অনার্স মাস্টার্স শেষে বিসিএস প্রিলিতে টিকেছিল সে। বিসিএস-এর কোচিং এ যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় রাসেল। আমাদের জানা মতে সে সরাসরি কোনো মঞ্চের রাজনীতি করতো না। এমনিতে সে বিএনপিকে সমর্থন করতো। নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ ৩ বছর তাকে খুঁজেছি। প্রথম দিকে র‌্যাব-১ এর এক অধিনায়ক রাসেলের খোঁজ দিতে পারলেও নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের পর এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলেনি। কান্না জড়িত কণ্ঠে রাসেলের বাবা বলেন, আমি ছোট একটি ব্যবসা করি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মানুষের মধ্যে যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ কিছুটা ভালো থাকি। বাড়িতে যাওয়ার পরে একটি ভিন্ন মানুষ হয়ে যাই। ছেলের শোকে মা মজিদা বেগম মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সে এখন নিজের নামটি পর্যন্ত বলতে পারে না। তিনি বলেন, আমাদের ভাগ্যে যেটা হয়েছে আর কোনো বাবা মায়ের ভাগ্যে যেন এমনটা না হয়। আমার ছেলে জীবিত আছে না কি মৃত শুধু এটা জানতে চাই।

আব্দুল কাদের ভূইয়া মাসুমের মা বলেন, ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর বসুন্ধরা থেকে মাসুমকে তুলে নিয়ে যায়। ৩ ভাই বোনদের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্সের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল মাসুম। সে খুব মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। প্রত্যেক ক্লাসে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ালেখা করেছে। ছিল বিএনপির সমর্থক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একজন মা। তাই আমিও একজন মা হিসেবে তার কাছে আমার ছেলেকে ভিক্ষা চাচ্ছি। সারাক্ষণ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলি সন্তানকে তুমি ফেরত দাও। সন্তান এসে আমাদের মাটি দিক। মৃত্যুর আগে যেন তার মুখটা একবার দেখে মরতে পারি।

নিখোঁজ জাহিদুল করিম তানভীরের খালাতো বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি বলেন, আমার খালা ছেলেকে হারিয়ে সংসারত্যাগী মানুষে পরিণত হয়েছেন। খুবই কম বয়স তার। কিন্তু ছেলেকে হারিয়ে হঠাৎ তার বয়সটা বেড়ে গেছে। কোথাও বের হন না। কারো সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলেন না। ৪ ভাই বোনের মধ্যে তানভীর ছিলেন সবার বড়। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। অনেকটা গোবেচারা টাইপের লোক ছিলেন। বসুন্ধরায় নিজ বাড়িতে নির্মাণকাজে ঠিকাদারকে টাকা পরিশোধের সময় র‌্যাব আমার বড় ভাই সুমনের সঙ্গে তাকে তুলে নিয়ে যায়। শুধু আমার ভাই বা খালাতো ভাই নয়, অনেকগুলো গুম হওয়া পরিবারের সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে জড়িত। আমাদের সবার একটাই প্রত্যাশা- গুম বন্ধ হোক। আমরা ভুক্তভোগী। আমরা জীবন দিয়ে বুঝতেছি গুম জিনিসটা কি ভয়াবহ।
নিখোঁজ সেন্টুর স্ত্রী লাভলী আক্তার জানায়, সেন্টুর গ্রামের বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জ মাদাইনগরে। তিন ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মাদাইনগর সানারপাড়ে থাকতেন। বাসার নিচেই নিজস্ব রড সিমেন্টের দোকান ছিল। স্থানীয় এক নেতা হত্যা মামলায় তার নামে একটি চার্জশিট কোর্টে দাখিল করা হয়।

ওই মামলায় স্যারেন্ডার করার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা কোর্টে এসেছিলেন সেন্টু। কোর্টের পেছনের গলি দিয়ে হেঁটে আসার সময় প্রথমে দু’জন পরবর্তীতে আরো ৭ থেকে ৮ জন এসে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তোলে। এ সময় তার স্ত্রী তাদের আইনজীবীকে ফোন করতে গেলে র‌্যাবের সদস্যরা তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায়। সেন্টুকে তোলা মাইক্রোবাসটি তৎক্ষণাৎ পথচারি ও রিকশাওয়ালারা আটকে দেয়। ৫ থেকে ৭ মিনিটের মাথায় র‌্যাব-১০ লেখা দুটি গাড়ি চলে আসে। এসেই সাধারণ পথচারি ও রিকশাওয়ালাদের এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। সেন্টুর স্ত্রী বলেন, সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে তারা আমার স্বামীকে নিয়ে চলে যায়। একটি মানুষ যদি অন্যায় করে তার জন্য দেশে বিচার আছে, আইন আছে। কিন্তু এভাবে গুম করলে একটি পরিবার কি নিয়ে বাঁচবে। আমার বাচ্চাদের এখন বলতে পারি না যে তাদের বাবা মারা গেছেন না জীবিত আছেন। আমি চাই এর সুষ্ঠু তদন্ত হোক।

ছাত্রদল নেতা চঞ্চল হোসেনের স্ত্রী রেশমা আক্তার বলেন, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের দুই তিন মাস আগে দলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বেশি সক্রিয় হন চঞ্চল। ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে দুপুর আড়াইটায় নিখোঁজ হন তিনি। আজ পর্যন্ত তার সন্ধান পাইনি আমরা। ৮ বছর বয়সী ছেলে আহাদকে নিয়ে বর্তমানে শ্বশুরের বাসায় থাকেন রেশমা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে আহাদ জানে তার বাবা এখনো বিদেশ আছেন। সে প্রায়ই বলে আম্মু বাবা ফোন দেয় না কেন। ছেলের চোখের দিকে তাকালে হাজারও প্রশ্ন দেখতে পাই যার কোনো উত্তর আমার জানা নেই।

পারভেজ হোসেনের স্ত্রী ফারজানা আক্তার বলেন, পারভেজসহ মোট ৪ জনকে ২০১৩ সালের ২রা ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে অপহরণ করা হয়। ওইদিন দুপুর ২টায় স্ত্রী ফারজানা আক্তারের সঙ্গে পারভেজের সর্বশেষ কথা হয়। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, পারভেজ ছিল ৭১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দুই ছেলে মেয়ে ঋদি ও আরাফ। আরাফ গর্ভে থাকাবস্থায় তার বাবা গুম হন। ৪ বছর বয়সী আরাফ গত ৪ থেকে ৫ দিন আগে হঠাৎ করে বললো মা-মনি পাপার ছবিটা দাও। পাপাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তখন তাকে বললাম তোমার পাপা কাজে ব্যস্ত আছে। তিনি বলেন, আমি চাই না আর কেউ গুম হোক। আমাদের মতো কাঁদুক বা রাস্তায় দাঁড়াক। একজনকে গুম করা মানে তার পুরো পরিবারকে গুম করা। পরিবারের হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনাকে গুম করা। আমরা তাদের মৃত্যুদিবসও পালন করতে পারি না। না পারি বিধবা হয়ে থাকতে, না পারি সধবার মতো চলতে।সূত্রঃ মানবজমিন


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com