আজকে

  • ৫ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২০শে জুলাই, ২০১৮ ইং
  • ৭ই জিলক্বদ, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

চাকরিজীবী

Pub: বৃহস্পতিবার, জুন ২১, ২০১৮ ৯:০৬ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জুন ২১, ২০১৮ ৯:০৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

জাহাঙ্গীর আলম অরণ্য

বোঁটা থেকে ঝরে পড়া আঘাতে ক্ষত আধাবাসি ফুলের মতোই অফিসের চেয়ারে ঝরে পড়লো মামুন। নটায় অফিস কিন্তু সাড়ে আটটায়ই টেবিলে বসতে হলো। কাগজে কলমে অফিস ছুটির সময় পাঁচটা কিন্তু আটটার আগে কোনোদিনই নামতে পারে না অনেকেই। মামুন বের হয় আরো পরে। গতকাল নটায় অফিস থেকে বেড়িয়ে দুঘণ্টা রাস্তার জ্যামে আটকে থেকে বাসার জন্য কিছু কেনাকাটা করে ঠিক এগারোটায় বাসায় পৌঁছেছে। তারপর বউয়ের সাথে ঝগড়া বাধিয়ে ছেলেটার পিঠে দুঘা কষিয়ে দিয়ে অল্প খাবার খেয়ে নিলো। ব্যক্তিগত কিছু কাজ করতে করতে বউয়ের অসন্তুষ্টির গজগজানি কানে আসতেই আবার দুজনের ঝগড়া বেধে যায়। সমস্যাটা মূলত টাকা কেন্দ্রিক, ‘এই কয় টাকা যার আয় তার আবার বিয়ে করার সখ জাগলো কেনো!’
এমন খোঁটা প্রতিনিয়তই সহ্য করতে হয় মামুনকে।
গত মাসের বাসা ভাড়া অর্ধেকটা দিতে পারেনি। ছেলের জন্য একটা স্কুল ব্যাগ দরকার; তা না কিনে গ্রামে বাবা মাকে আস্ত এক হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে মামুন।
মা বাবাকে টাকা দেওয়ার ক্ষমতা এক রকম নেই, তাই দেয়ও না। তাই বলে এই কয়টা টাকার জন্য খোঁটা! কতো টাকা খরচ করে কতো কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন যে মা-বাবা, সন্তানের কাছে তাদের পাওয়ার কোনো কিছুই থাকবে না!
আর্থিক অসঙ্গতির যখন কোনো ধরনের সুরাহা খুঁজে পায় না, বউয়ের গজগজানির মুখে বাধ্য হয়েই তখন ঝগড়াটুকু সেরে নিতে হয় মামুনের। অনেকদিন ধরে বউকে একটা চাকরিতে ঢোকানোর চেষ্টা করছে কিন্তু চাকরি কই!
ঝগড়ার পরে রাতে ভালো ঘুম হয় নি, তার উপরে প্রতিদিনের মতো সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে অফিসের জন্য ব্যস্ত হতে হয়েছে। তাই অফিসে এসে এখন মামুন ঘুম-ক্লান্ত। আর যেহেতু ধিরে-সুস্থে কাজ করার সুযোগ নেই বরং অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকগুলো কাজ শেষ করে বস আকরাম সাহেবের কাছে জমা দিতে হবে তাই মামুনের মেজাজ এখন বেশ খিটখিটে।
পনেরো মিনিটের মধ্যে পাশের টেবিলের আমজাদ, সোহরাব প্রমুখ সবাই যার যার কাজে বসে পড়লো। মামুন অতি নি¤œস্বরে আমজাদের সালামের উত্তর দিয়েছে কিন্তু কারো দিকে তাকায় নি। নয়টা ছুঁই ছুঁই সময়ে আকরাম সাহেব তার অফিস চেম্বারে ঢুকলো এবং দুই মিনিটের মধ্যে মামুনকে ডাকলো, ‘কই খালী হাতে কেনো, নতুন প্রজেক্ট এর রিপোর্টটা কই!’
‘কাজ চলছে স্যার!’
‘চলছে মানে! অফিসে ঢুকেছেন কটায়!’
‘সাড়ে আটটায়।’
‘কেনো! সাড়ে আটটায় কেনো! সাতটায় আসলে কী গেট দিয়ে ঢুকতে পারতেন না! তা ছাড়া গতকাল সন্ধ্যা আটটা বাজতে না বাজতেই নাচতে নাচতে বাসায় চলে গেলেন, আরো দু-তিন ঘণ্টা কাজ করতে পারলেন না!’
মামুন ভয়ে নিচু হয়ে নিরুত্তর তাকিয়ে রইলো। আকরাম সাহেব ততোক্ষণে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘কী হলো, কথা কানে যাচ্ছে না! বলি এ কোম্পানিতে আপনি চাকরি করেন না! কোম্পানি আগে না বাসায় যাওয়া আগে!’
‘স্যার, এতো কাজ তো একার জন্য কষ্টকর হয়ে যায়, যদি আরেক জ…ন!’
‘কী বললেন! আমার মুখের উপর এতো বড়ো কথা! যান, আমার সামনে থেকে চলে যান! দশ মিনিটের মধ্যে রিপোর্ট চাই অন্যথায় রেজিগনেসন লেটার লিখে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাসায় চলে যান!’
ভয়ে বিমর্ষ হয়ে সিটে দিয়ে বসলো মামুন। হাতে চলছে কাজ, ভয়ে হীম হচ্ছে শরীর। মামুনের জন্য কয়েকজন সহকর্মীর মধ্যে সামান্য সহানুভুতি জাগলো আর কয়েকজন বেশ রসালোভাবে এটা উপভোগ করছে। তবে ভয় আর অশ্বস্তিতে সবাই যার যার কাজ নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এমন অবস্থা প্রায়শই তাদের কপালেও জোটে।
পরবর্তী দশ মিনিটে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় নি। কাজ শেষ করতে সময় লাগলো প্রায় এক ঘণ্টা। কম্পিউটারে দ্রুত কাজ করতে গিয়ে মাঝে কয়েক জায়গায় এলোমেলো হয়ে দুটো ভুল রয়ে গেলো আর সেটা আকরাম সাহেবের নজরে আসতেই অশ্লিল গালি-গালাজ করতে করতে মামুনকে প্রায় মারতে উদ্যত হলো, ‘যা, আমার সামনে থেকে চলে যা! একদম বাসায় চলে যা! এ অফিসে যেনো তোকে আর না দেখি! বেতনটা যখন গিলিস, তখন মনে থাকে না, অফিসের প্রতি কতোটা সিনসিয়ার থাকার কথা!’
মামুন নিজের চেয়ারের উপর ধসে পড়লো। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে মামুনের উপর বিরক্ত। ছেলেবেলায় মা-বাবা খানিকটা শাসন হয়তো করেছেন কিন্তু বেশি শাসনের প্রয়োজন কখনোই হতো না। শিক্ষিতের খাতায় নাম উঠার পর উল্টো ছেলেকে তারা সম্মান করেছেন। সম্মান করেছে পরিচিতজন সবাই। কারো কাছে অপমানিত হওয়ার মতো আচরণ কোনোকালেই মামুন করে নি। অথচ এতো পরিশ্রমের বিনিময়ে এতো বছর চাকরির পরে মাত্র এই কয়টা টাকা বেতনের বিনিময়ে…! ছেলেবেলার মুখস্ত পড়া মনে পড়ছে মামুনের, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে। বিদ্বান্ ব্যক্তি সদা পূজ্য! বিদ্বান্রে কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।’
মামুনের মন চাইছেÑ ছেলেবেলাকার এই বানোয়াট গাঁজাখুরি বইগুলো ছিঁড়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়, ‘না আর নয়, প্রতিদিনের একেক অপমান হজম করার আগেই আবার অপমান, মাত্র এই কয়টা টাকার জন্য! নাহ, আর নয়!’ মামুন রেজিগনেসন লেটার লেখা শুরু করলো. ‘কিন্তু আগামী সপ্তাহের বাজারের টাকা আসবে কোথা থেকে! আর গত মাসের বকেয়া বাড়িভাড়া আর এ মাসের পুরো ভাড়া শোধ হবে কীভাবে! আবার নতুন একটা চাকরি কয় মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে অথবা আদৌ আরেকটি চাকরি মিলবে কিনা, ঠিক নেই! আর এমনটা ভাবতে ভাবতেই দীর্ঘ একটা যুগ শতো অত্যাচার সহ্য করেও এই অফিসেই পড়ে থাকতে হলো। কিন্তু আর কতো! এটাও তো একটা জীবন! একজন মানুষের সবচেয়ে দুঃসময় হলো, কেউ তার উপর অত্যাচার করছে অথচ প্রতিবাদ করার অধিকার তার নেই, মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়। উহ, কতোবড়ো অনাচার! প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলে মার খেয়েও যে শান্তি আছে।’
অনেক ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত মামুন রেজিগনেসন লেটার লেখা শেষ করলো। এম ডি’র কক্ষে ছুটতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালো মামুন, মনের মধ্যে একটা অদৃশ্য স্বপ্ন উঁকি দিলো, ‘এতো বছরের পুরনো কর্মচারী, এতো সহজে চাকরি ছাড়তে দেবে না। বরং আকরাম সাহেবের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নালিশও হয়ে গেলো আবার দুহাজার টাকা বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থাও হতে পারে।’
লেটারটা হাতে নিলেন এম ডি, ‘বস ইজ অলওয়েজ রাইট। বসদের বিরুদ্ধে কিছু শুনতে চাই না। বস পছন্দ হলে থাকবেন, নইলে চলে যাবেন। আচ্ছা, আপনার স্যালারি কতো?’
‘উনিশ হাজার টাকা স্যার, এতে কিছুতেই সংসার চলছে না স্যার!’
‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। অন্য কোথাও নিশ্চয়ই আপনার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনার এই কাজ আমি বারো হাজার টাকা বেতন দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা কোনো পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়ি দিয়ে করিয়ে নেবো। আপনার রেজিগনেশন লেটার প্রহণ করলাম। এখন আসুন।’
‘কিন্তু স্যার!’
‘সময় নেই। আবুল, গেস্টদের ভেতরে নিয়ে আসো!’
মামুন রাস্তার দিকে পা টেনে টেনে এগিয়ে চললো। মাথায় তার ভাত আর বাসস্থানের চিন্তার নি¤œচাপ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ নি¤œচাপ অদৃশ্য হয়ে জীবনের মাঝ আকাশে ভোরের সূর্যের আলো ঝলমলিয়ে উঠলো। আর সেই আলোতে মামুন নিজেকে মানুষ হিসেবে আবিস্কার করলো, ‘চাকরি করাটাই কী জীবনের একমাত্র কাজ! শিক্ষিত মানুষদের জন্য পৃথিবীতে আর কী কোনো কাজ নেই! নাহ, কাজের জন্য আর কারো কাছে ধন্না দেওয়া নয়, আমি গ্রামে যাবো! আজকাল গ্রামাঞ্চলে কোনো কাজের মানুষ পাওয়া যায় না। সবাই সোনার হরিণ খুঁজতে ছুটে আসে ঢাকায়। তারপর আবর্জনা আর ইট-বালুর আস্তরণে খুঁজে বেড়ায় ভাগ্যের যাদুকাঠি। অশিক্ষিতরা শহরে আসে স্বাধীন হতে আর শিক্ষিত চাকরিজীবীরা আসে পরাধীন হতে। আর গ্রাম! গ্রামই তো আমার শিকড়, যেখানে পুরো অস্থিত্বকে ডুবিয়ে আকণ্ঠ পান করা যায় জীবনের সবটুকু সতেজ রূপ-রস। বৃদ্ধ বাবা সব কাজ একা করতে পারেন না। কাজের চাপে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। অথচ আমি নিজের কাজ ফেলে পরের গোলামি করতে করতে জীবনটাকে ধ্বংশ করার পায়তারায় মেতে উঠেছি। নাহ, আর নয় গোলামি। আমি শিক্ষিত মানুষ। আমি ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে চাই, স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে চাই, জীবনের সবটুকু রূপ-রস নিয়ে বাঁচতে চাই। আমি গ্রামে চলে যাবো। আমি আমার জমিতে চাষ করবো; বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। দেশের কৃষি ব্যবস্থায় আমি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবো। তাছাড়া চাকরি দিয়ে আমি দেশের অর্থনীতির জন্য কি-ই অবদান রাখছি। শুধু বেকারত্ব সমস্যা বৃদ্ধি করছি আর সরকারের তথা দেশের বোঝা হয়ে উঠছি। আমার অবর্তমানে আমার কাজ যদি অন্য যে কেউ চালিয়ে নিতে পারে, ব্যক্তি হিসেবে আমার তাহলে স্বাতন্ত্র্যতা কোথায়! বরং অন্য সবাই যেখানে একমণ ফসল ফলাতে পারে একমাত্র আমিই যদি সেখানে অতিরিক্ত আধামণ ফলাতে পারি, ব্যক্তি হিসেবে ওটাই আমার স্বাতন্ত্র্যতা। আর এই স্বাতন্ত্র্যতাই আমাকে তথা দেশকে একটা মজবুত অর্থনীতির উপর দাঁড় করাবে। আমি এমনভাবে আবাদ করবো যেটা একমাত্র আমার দ্বারাই সম্ভব এবং আমি অগ্রদূত হয়ে সব প্রযুক্তি সবার মধ্যে বিলিয়ে দেবো। আর এভাবেই আমার দ্বারা আমার ব্যক্তিগত আর দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবো। প্রথম দিকে গ্রামের অনেকে হয়তো বাঁকা চোখে দেখবে আমাকে। কিন্তু আমার মেধার অবদান দেখে পরে ঠিকই আমাকে মাথায় করে রাখবে। শিক্ষিত হওয়াটা দোষের নয়, দোষ হলো বেছে নেওয়া পেশার।’

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1105 বার

 
 
 
 
জুন ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« মে   জুলাই »
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com