মনবন্ধু আমাকে রেখে পাড়ি জমালো

Pub: মঙ্গলবার, আগস্ট ২১, ২০১৮ ৬:৫০ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, আগস্ট ২১, ২০১৮ ৬:৫০ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইশরাক পারভীন খুশি :
ছোট্ট মফস্বল শহরে আমার জন্ম। শহর ছোট হলেও জীবনান্দ সে শহরকে করে তুলেছেন অপরুপার মাতৃভূমি। ঐতিহাসিক বিচারেও সে শহর কম নয়। ছোটো সে শহর যে কত ছোটো আর কত বিশাল, তা প্রথম বুঝলাম যখন পারি জমালাম নতুন শহরে। আমার প্রিয় শহর নাটোর। যেমন ছোটো তেমনি আমার প্রিয় দেশমাতা বাংলাদেশও দেশ হিসেবে কত ছোটো তাও গোচরে এল প্রিয় স্বদেশ ছাড়ার পর।
সে অর্থে আমি একটা কুয়োর ব্যঙ বলা চলে।

সেই কুয়োর ব্যঙের মন সদাই পড়ে থাকে ফেলে আসা কুয়োর জন্য। আর কুয়োর সঙ্গীদের জন্য মন পুড়ে। কিন্তু আজ পর্যন্ত যা দেখলাম তা পরাণ পোড়ানো বন্ধুদের বলে যাবার বাসনা না মিটিয়ে পারা গেল না। কারণ, যেখানে যে নতুন আর সুন্দরের মুখোমুখি আমি হয়েছি সবর্দা আমার প্রাণপ্রিয় কুয়োবাসী আমার সঙ্গে সহাবস্থান করেছে।

বাংলাদেশ ছেড়ে কখনো উড়োজাহাজে উড়াল দেব তা কল্পনার বিন্দু বিসর্গেও ছিল না। পায়ের পাতায় কালো তিল দেখে কে যেন বলেছিল বিদেশ ভাগ্য ভালো। মনবন্ধু আমাকে একা দেশে রেখে যখন বিদেশ পাড়ি জমালো তখনও একবারের জন্য ভাবিনি যাওয়া হতে পারে। জীবনে যা নিয়ে স্বপ্ন দেখিনি তাই সহজ হয়ে ধরা দিল চাওয়ার আগেই। মূল কথায় আসি।

তখন ২০০৮ সাল। বিয়ের একমাস পর প্রাণ ভোমরা উড়াল দিয়েছে বিলাতে। এবার তো আমার রক্ষা নেই। দেশ ছাড়ার ডাক এসে গেল। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় বাবার বাল্যবন্ধু আকবর চাচার কথা। যিনি না হলে বিদেশ যাত্রা অসম্ভব হতো। বড় বড় আমেরিকাবাসী আত্মীয়স্বজন থাকার পরও আমার মতো কুয়োর ব্যঙকে স্পন্সর করতে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন আকবর চাচা। দুমাসের মাথায় ২০০৮-এর অক্টোবরে পাড়ি জমালাম বিলাত। তখন না পারি ইংরেজি বলতে আর না আছে একা একা লম্বা অভিজ্ঞতা।

সেই প্রথম জিন্সের প্যান্ট, বুট জুতো পরে কোলের কাছে শীতবস্ত্র নিয়ে দুরু দুরু বুকে উড়োজাহাজে বসেছি। মনে হচ্ছিল পিছনে ফেলে আসা বৃদ্ধ বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাইবোন, সংসার, বইয়ের শেলফ, টবে অদক্ষ হাতে লাগানো বনসাঁই, সুপারি গাছের ছাল দিয়ে বানানো কুঁড়েঘর, অসমাপ্ত নকশি কাঁথার ওয়াল ম্যাট, দেয়ালে টাঙানো টুকরো কাচে তৈরি ময়ুর জোড়া, মাটির থালায় আকাঁ আলপনা। ফেলে আসা দৈনন্দিন অভ্যেস, ভালোলাগা-মন্দলাগা।

ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজের সরাসরি ঢাকা টু হিত্রো ফ্লাইট। এগারো ঘন্টা একটানা চলা। অপেক্ষা, তারপর দেখা হবে প্রিয় মানুষের সঙ্গে। প্লেনটা যখন রানওয়েতে চলা শুরু করলো তখন শব্দে কান দুটো ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। যখন উপরে উঠতে লাগল তখন কানে তালা লেগে গেছে প্রবল চাপে। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে অপরূপ ঢাকাকে দেখে নিলাম শেষবারের মতো আরও একবার। রাতের ঢাকা যেন অসংখ্য জোনাক পোকা, লাল-নীল-হলুদ আলো হয়ে মিটমিট করে জ্বলছে। বুকের মধ্যে আচমকা দমকা হাওয়া উগরে বেরিয়ে এল সশব্দে আর চোখ দিয়ে অশ্রু। দেশ ছাড়ছি, ছাড়ছি মাতৃকা।

লেখক: নিউ ইয়র্ক প্রবাসী


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1170 বার