হাছন রাজা স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

Pub: শনিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সৈয়দা আঁখি হক:

শ্রীভূমির লোকায়ত ভাবজগতের বাসিন্দা দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামে ১৮৫৪ সালে ২১ ডিসেম্বর তার জন্ম। প্রকৃতির শুভাশুভ শক্তি স্বয়ংক্রিয় ধারায় প্রভাবিত হয়ে মানুষের জীবনে-মনে নানা পরিবর্তন ঘটায়। জমিদার পুত্র সৌখিন হবেন এটাই স্বাভাবিক। কৈশোরেই তিন লাখ বিঘার জমিদারি পরিচালনায় হাছন হয়ে উঠলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী, দুর্দান্ত ও বিচক্ষণ এক রাজা। অন্যায়কারীর জন্য তিনি ছিলেন কঠোর ও ভয়ঙ্কর। কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থীর জন্য ছিলেন কোমল। একহাতে করেছেন রাজ্য শাসন, অন্য হাতে করেছেন দান।

‘যার থাকে কোটি কোটি কল্প, সৎ চিন্তার কর্ম ফলে সেই হয় বৈরাগ্য’। সেই বৈরাগ্যের সুবাতাস লেগেছিল আল্লাহর ইশ্কে কাতর হাছন রাজার মনে। সঙ্গীতে ছিল তার বিশেষ ব্যুৎপত্তি।

অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, জগৎ-জীবন, ঈশ্বরানুরক্তি ও আত্মদর্শনের চরম অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন গানে। তার সুর একেবারেই স্বতন্ত্র। প্রেমের কাঙাল হাছন প্রেমাস্পদের প্রেমাকাক্সক্ষায় উন্মাদ, দেওয়ানা। তার আল্লাহ, দয়াল, হরি, কানাই, প্রিয়া, সোনাবন্ধু কোন মানব অভয়বধারী ব্যক্তি নন। বাহিরে জমিদার হলেও ভেতরে তিনি ছিলেন প্রেমের ফকির। যাকে চিনতে একটুও ভুল করেননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে সময় এবং প্রেক্ষাপট অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন ভাবের তন্ময়তা আচ্ছন্ন, উদাসীন, সৌখিন ও কৌতূহলি। হঠাৎ করেই তার মানস পরিবর্তন হয়নি। কঠোর বাস্তবতার প্রেক্ষাপট হাছন রাজাকে রাজর্ষি হাছনে পরিণত করে। এখানেই তার ভাবুকতা, কবিত্ব এবং সফলতা।

তার উপাসনার স্থান ছিল মানুষের অন্তর্লোক ও স্বয়ং আল্লাহ। উচ্চশ্রেণীর হেকিম, তীক্ষ্ণ চিন্তাশীল ও ভেষজ চিকিৎসায় পারদর্শী হাছনের কল্পনাশক্তি ছিল গভীর। বাঁশ-ছনে নির্মিত একটি মাটির মহলে বসবাস করতেন। তার ভাবুকচিত্ত সমাজের মঙ্গল কামনায় নিবেদিত ছিল। এর নিদর্শন রয়েছে গীতবাণীতে-

হাছন রাজা কান্দন করে লোকের লাগিয়া

সকলকে তরাও প্রভু সুমতি দিয়া \ হাছন রাজায় কান্দন করে, ধরিয়া প্রভুর পাও

লোকের বদলা মারিয়া মোরে, সকলকে তরাও \ প্রভুর কাছে এই প্রার্থনা কোন অত্যাচারী বা নারীলোভী রাজার হতে পারে না। অনিত্য সংসারে ছিল তার সীমাহীন জিজ্ঞাসা। জাগতিক ভোগ-বিলাস, আশা-আকাক্সক্ষা, বৈষয়িক প্রতিপত্তি এবং পার্থিব জীবন তার কাছে অসার মনে হয়েছে। সংসারে যাবতীয় মায়াজাল থেকে মুক্তি চেয়েছেন। তাই প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিলনের তীব্র আকাক্সক্ষায় ধন-সম্পদ বণ্টন করে মুক্ত হলেন ভবের জঞ্জাল থেকে। আপন উদ্ভাবিত দর্শন ইন্দ্রিয় ও ভাবনাদ্বারা অপ্রেমিকের উদ্দেশে বলেন-

বারে বারে করি মানা, বই আমার পড়বে না

প্রেমের প্রেমিক যেইজনা, এ সংসারে হবে না \ হাছন রাজায় কসম দেয়, আর যে দেয় মানা আমার গান শুনবে না, যার প্রেম নাই জানা \ আত্মোপলব্ধির ভেতর দিয়ে মরমি সাধন-লোকের সন্ধানে হাছন রাজা করেছেন আত্মবিশ্লেষণ। কিন্তু অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়ে তার নামে অতিরঞ্জিত, কল্পিত নানা গল্প প্রচার করেছে। যা তার বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিবেকহীনরা সত্যকে যুক্তি দ্বারা উপলব্ধি করতে পারেনি বলেই হাছন রাজার দর্শনলোকে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। অন্তরে দরিদ্র এই মানুষগুলো হাছন রাজার মানবপ্রেম ও স্রষ্টাপ্রেমকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাই মনগড়া কাহিনী সাজিয়ে তার জীবনদর্শনকে বিকৃতভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপন করে বাংলা সাহিত্যকে করেছে কলঙ্কিত।

এই বিকৃত ইতিহাস থেকে কতটুকু সত্যপোলব্ধি করবে আগামী প্রজন্ম? তাই প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অতিসত্তর হাছন রাজার জীবনদর্শন, গীতবাণী ও তার মানস জগৎ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৯-১৫ মিনিটে হাছন রাজা মিলিত হলেন প্রেমময়ের সঙ্গে। দেহের সঙ্গে দেহ, প্রাণে প্রাণে, আত্মায় আত্মায় মিলনের সুর বেজে ওঠে। আম গাছের ছায়ায় ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৮ ফুট প্রস্থ দেয়ালে ঘেরা কবরে ঘুমিয়ে আছেন প্রেমের কবি হাছন রাজা। দেয়ালে শ্বেত পাথরে বাঁধানো তারই গানের অংশ- লোকে বলে বলের, ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার…।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1191 বার