গ্রন্থালোচনা : স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা

Pub: বুধবার, জানুয়ারি ৯, ২০১৯ ১:১২ অপরাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, জানুয়ারি ৯, ২০১৯ ১:১২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রফেসর ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী

২০১৮ সালের ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ ইউকের আহ্বানে লন্ডনে ৮ম বইমেলায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। দুই দিনব্যাপী ওই উৎসবে পরিচিত হলাম ব্রিটেনের লেখক, সাংবাদিকসহ সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে। অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির সদস্য আনোয়ার শাহজাহানের সাথে পরিচয়ের একপর্যায়ে তিনি আমাকে তাঁর লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটির দুই খণ্ড উপহার দেন। অতি মূল্যবান বিষয়ের ওপর লেখা সুদৃশ্য দুটি বই হাতে পেয়ে খুব খুশি হলাম। বিষয়বস্তু আংশিকভাবে জানা থাকলেও খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭৬ জন বীরযোদ্ধার মধ্যে বৃহত্তর অংশের নাম ছিল অজানা।

আনোয়ার শাহজাহান একজন সাহসী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী লেখক ও গবেষক। তাঁর প্রকাশিত ৬টি বইয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা উল্লেখযোগ্য এ বই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

স্বাধীনতাযুদ্ধে রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনবৃত্তান্ত এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের বীরত্বগাথা নিয়ে ৭৫৬ পৃষ্ঠায় দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’। বইটির প্রথম খণ্ডে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম ও বীরবিক্রম এবং দ্বিতীয় খণ্ডে বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা। ২০১৬ সালে একুশে বইমেলায় প্রথম খণ্ডটি প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। ভবিষ্যতে খেতাবপ্রাপ্ত বীরযোদ্ধাদের নিয়ে যাঁরা গবেষণা করবেন, তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান এ বই রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে। এ পর্যন্ত উল্লিখিত বিষয়ে দু-একটি বই প্রকাশিত হলেও আনোয়ার শাহজাহান রচিত ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বই বলা যেতে পারে।
বইটির দুই খণ্ডে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জন বীর-উত্তম, ১৭৫ জন বীরবিক্রম এবং বীরপ্রতীক ৪২৬ জনের রয়েছে যথাযথ পরিচিতি। এ বইয়ের তথ্য আহরণে অক্লান্ত পরিশ্রম ও অনুসন্ধিৎসু লেখক-মানস নিয়ে আনোয়ার শাহজাহান এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্নেল ওসমানীর স্বাক্ষরে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমোদনের পর তালিকাটি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে এবং ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গেজেট নোটিফিকেশন নম্বর-৮/২৫/ডি-১/৭২-১৩৭৮-এর মাধ্যমে ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্ন খেতাব প্রদান করে সম্মানিত করে। প্রকাশিত গেজেট থেকে খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের তালিকা সংগ্রহ করেছেন লেখক। পরে একে একে সবার পরিচিতি এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের আত্মত্যাগের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন বইটিতে। প্রথম খণ্ডে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জন বীর-উত্তম, ১৬৬ জন বীরবিক্রম মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব তুলে ধরলেও ৯ জন বীরবিক্রম মুক্তিযোদ্ধার পরিচিতি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আনোয়ার শাহজাহানের আন্তরিক প্রয়াস সত্ত্বেও সামান্য অসম্পূর্ণতা থেকে গেল। অবশ্য এই বিশাল গ্রন্থে যা আমরা পেয়েছি, তা কি যথেষ্ট নয়?
‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচিতি। গ্রন্থকার অনেক প্রয়াস সত্ত্বেও ৪২৬ জন বীরপ্রতীক যোদ্ধার মধ্যে ৩৮ জনের পরিচিতি সংগ্রহ করতে পারেননি। তবে তিনি আশাবাদী, অব্যাহত চেষ্টার ফলে দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধন করতে পারবেন বলে মনে করেন। বিদেশে বসে সুবৃহৎ এই গবেষণা সম্পন্ন করা অনেক দুরূহ তো বটেই; আনোয়ার শাহজাহান এই দুরূহ কাজ সুষ্ঠুভাবে সুসম্পন্ন করেছেন। ফলে জীবিত বীর-উত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। বলা বাহুল্য, খুব সুন্দর ও সাবলীল ভাষা প্রয়োগে তাঁর উপস্থাপিত পরিচিতিগুলো আমাদের মনঃপূত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই গবেষণা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ হবে, সেই প্রত্যাশা রেখে আমরা আনোয়ার শাহজাহানের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক সব প্রকাশনা কাজের জন্য অভিনন্দন জ্ঞাপন করি।

বই দুটির ভূমিকা লিখেছেন যথাক্রমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ বীর-উত্তম, ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত বীর-উত্তম এবং ৩ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বীর-উত্তম।

‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানদের সাহসিকতার ইতিহাস জানতে হলে বইটি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। এটি আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য এক অনবদ্য নথি হয়ে থাকবে।

‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকার বইপত্র প্রকাশন। প্রথম খণ্ডের প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ২০১৬, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩১০ এবং দ্বিতীয় খণ্ডের প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ২০১৭, পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৪৭। প্রচ্ছদ এঁকেছেন অনন্ত আকাশ।

প্রফেসর ড. মাহমুদ শাহ কোরেশীঃ বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক। প্যারিস (সবন), চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও সাভারস্থ গণবিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও ফরাশি ভাষার প্রাক্তন অধ্যাপক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1147 বার