তিতাস পুত্রের বাড়ি ফেরা

Pub: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ ৭:০৮ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ ৭:০৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবদুল হাই শিকদার

তিতাসের তীর থেকে পাললিক দোতারা সেতার, লোক
লোকান্তর পার হয়ে হাতে নিয়ে কালের কলস, আপনি
কবিতার সাথে সম্পাদন করলেন সোনালী কাবিন।
মীরের বাচ্চা বটে!

এরপর ঘনায়মান অন্ধকারে অনেক হলো কবি ও কোলাহল।
উপমহাদেশের পথে-ঘাটে দেখা গেল মিথ্যাবাদী রাখালদের।
এক চক্ষু হরিণ থেকে ঠিকরে বেরুলো পানকৌড়ির রক্ত। গন্ধের বাক্স
বোঝাই করে বণিকরা এলো। দেখা দিল দ্বিতীয় ভাঙ্গন। আমাদের
মুখগুলো সেলাই করা হলো স্থ’ূল ভঙ্গিতে। স্টেন গান কাঁধে নিয়ে
হেঁটে যায় উনিশশো তেয়াত্তর সাল। আহ্ একি অশ্রু একি রক্ত। নদীরও
সতীন হয়—এ এমন এক দেশ!

তবুও আপনি বিরামপুরের যাত্রী। জাহানকোষা কামান চিৎকার করে
বললো, না কোন শূন্যতা মানি না। বারুদগন্ধী মানুষের দেশে তখন
তুমিই তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল। তোমার রক্তে তোমার গন্ধে
উম্মাতাল আমরা এমন এক যুদ্ধে নামলাম, যে যুদ্ধে কেউ জেতে না।
তবুও দোয়েল ও দয়িতার জন্য নদীর ভেতরে জেগে ওঠে নদী। হৃদয়পুরের
জন্য ভেসে আসে নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর।

তবুও আলোক পুলক শিহরণে ডাক দিলো ডাহুকী। পিপাসার
বালুচরে তোমার জন্য দীর্ঘ দিবস দীঘ রজনী কাটিয়ে উচ্চারিত হলো
অমিয় বাণী আমি দূরগামী। আশ্চর্য অলৌকিক জাদুকরের মতো
আপনি সঙ্গীনকে সঙ্গীত বানিয়ে প্রেমপত্র পল্লবে তাহেরা তাহেরা
বলে হাত বাড়ালেন উর্দ্ধাকাশে। অমনি ঝাঁক বেঁধে নেমে এলো
আরব্যরজনীর রাজহাঁস। পুরুষ সুন্দর নিশিন্দা নারীর হাতে সাহসের
সমাচার, পেশ করলো চার পাতার প্রেম। অমনি সীমাহীন যেন বা
প্রচীন বটবৃক্ষের মতো রচিত হলো আমাদের বেড়ে ওঠার ইতিহাস।

মরু মুষিকের উপত্যকা পার হয়ে বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ দেখে,
কবির আত্মবিশ্বাস দেখেও পাখির কাছে ফুলের কাছে যাওয়া
বাদ দিয়ে, কবিতার জন্য সাত সমুদ্রকে পাশ কাটিয়ে, উড়াল কাব্যের
নামে আমাদের অদৃশ্যবাদীরা বসলো রান্না-বান্না নিয়ে। শোনা গেল
প্রহরান্তে পাশ ফেরার শব্দ। আর আপনি বখতিয়ারের ঘোড়ায়
চেপে মোল্লাবাড়ির ছড়া। দাঁড় করালেন কাবিলের বোনকে। যেন এক
আগুনের মেয়ে কলঙ্কিনী কিন্তু জ্যোতির্বলয় ঘেরা। বার মাসে
তের পার্বণের দেশে চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসিতে যেইই হাসুক,
আপনি দেখালেন ক্ষীরের মতো গাঢ় নরোম এ মৃত্তিকা প্রিয়তমা
কৃষাণী আমার। ত্রিকোণ আকারে যেন ফাঁক হয়ে রয়েছে মৃন্ময়ী।

শুকনো কাগজওয়ালাদের শহরে আপনি আপনার ভাঙ্গা সুটকেস
ভরে নিয়ে এসেছিলেন তেরশত নদীর কল্লোল। হাজার প্রজাতির
পাখির কলরব। খনার মন্ত্রের মতো টিপ টিপ বৃষ্টির শিল্প। পিঠার
পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ। সাইকেলে ঘন্টাধ্বনি—রাবেয়া
রাবেয়া—আমাদের মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট।
গন্ধভরা ঘাস। ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর। মাছের আঁশটে
গন্ধ, চরের পাখি। গরীব চাষীর খড়ের গম্বুজ। বাঁশঝাড়ে ঘাসে
ঢাকা দাদার কবর।

আপনার পকেটে হয়তো ছিলো বেনসনের প্যাকেট। হয়তো গলায়
ঝোলানো ছিল নীল টাই। হয়তো চেয়েছেন খুব শ্রেণীর উচ্ছেদ।
হয়তো খেজুর তলায় পেতেছেন শীতলপাটি। তবু বন্দুক থেকে
জীবনের জলাধারে ফিরেছেন তুমুল রোহিত। দেখেছেন তার ছাপানো শাড়িতে
রয়েছে নদীর নাম। তাইতো বণিক জীভেও লেগেছিল কুরুলিয়ার
পুরানো কই ভাজার স্বাদ।— যদিও জলদস্যুদের গালাগালের ভয়ে
আজীবন এড়িয়ে গেলেন প্রবালের হাতছানি।

আর সেই আপনার মধ্যে এখন কি না বাড়ি ফেরার তাড়া!
মায়াবী পর্দা দোলাতে দোলাতে ছড়ানো ছিটানো ঘরবাড়ি,
পরিচিত নদী, মারেফতি গানের রাত, কলার বাগান পেরিয়ে,
জলার দিকে পাখিদের উড়াউড়ি দেখতে দেখতে আপনি বাড়ি
ফিরে যাবেন। আপনি যাবেন দূরে।—সেজন্যই কি দুধের উপর
ভাসা সবটুকু সর চামচে নিংড়ে খেয়ে চলে গেছেন! আপনার
অনুপস্থিতিতে এখন হাই তুলবে এদেশের গুমোট আকাশ। মনে কি
পড়বে, সুখ আমি আসবো না, দুঃখ আমি আর আসবো না বোন।
—কি জন্য এইসব আসবো না? কেন আসবেন না আল মাহমুদ?

আপনি বলেছিলেন বাংলা আপনার বচন, আপনিও জন্মেছেন এই
জলজ বদ্বীপে। মায়ের ভাষার জন্য কথা বলার দায়ে আপনি ভিটেছাড়া
হয়েছিলেন। কিন্তু আজ এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আপনাকে নিয়ে শহীদ
মিনারে যাওয়া হলো না।

ফাবি আইয়ে আলায়ে রাব্বি কুমা তুকাজজিবান।

আপনি বুদ্ধদেব বসুর হাতে হাত রেখে আঁৎকে উঠেছিলেন, এতো
ঠান্ডা! আর আপনি গেছেন মুক্তিযুদ্ধের গনগনে আগুনে আপনার মায়ের
নাকের নোলক খুঁজতে।

আপনাকে আমরা গার্ড অব অনার দিতে পারলাম না।

আপনি আমাদের চেনেন! খুব ভালো করে জানেন, কি ভয়ানক
প্রক্রিয়ায় আমাদের জন্ম। তাইতো বলেই থাকি, মুক্তিযোদ্ধা হলেই
তো আর রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া যায় না। জাতীয় ঈদগাহের জানাজা
আর তোপধ্বনিরই বা দরকার কি?—এদিকে আরেক কান্ড, আমাদের
ধর্মদাসের দামড়াগুলো আপনার জান্নাত লাভের জন্য আহাজারী
করে করে পাড়া মাথায় তুলেছে! না, কোন শোক বাণী নয়, নয় কোনো
বিবৃতির কুয়াশা। শেষ পর্যন্ত তিতাসপুত্রের জন্য মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে
দু’গজ জমিনও জোটানো গেল না।

ফাবি আইয়ে আলায়ে রাব্বি কুমা তুকাজজিবান

আপনি কি আমাদের কালে জন্মেছিলেন? নাকি আমাদের
নচ্ছারগুলো জন্মেছিলো আপনার কালে? একজন কবিকে কি দেব
আমরা? পরমাত্মার শিষ্য যে। যদিও ভবিষ্যতের দিকে সে থাকে চেয়ে
বিষণœ বদনে। তবুও ওপারে প্রথম কাতারে তার নাম। তাইতো বাহুতে
তার লাফিয়ে ওঠে প্রতিবাদী সবুজ ফড়িং।—স্ব-স্বভাবে জেগে ওঠে
বিশাল প্রকৃতি। অঙ্গুলি হেলনে তার নিসর্গও ফেটে যায় নদীর ধারায়।
উচ্চারণে কেঁপে ওঠে মাঠ। ছত্রভঙ্গ মিছিল ও মানুষ অদ্ভুত রহস্য নিয়ে
পাক খেয়ে এক হয়ে যায়।—নুহের প্লাবনের মতো কবির সৌরভের
কাছে ক্ষমতান্ধরা পরাজিত কুকুরের মতো বাধ্য হয়ে নিচু করে মাথা।
আর তাদের কুৎসিত দাঁতের বিরুদ্ধে হাজার নদী সারিবদ্ধভাবে
দাঁড়িয়ে গেল তিতাসের তীরে। আপনার প্রত্যাবর্তনকে মহিমান্বিত
করবার জন্য করুণ বিউগল ঠোঁটে উড়ে এলো কোটি কোটি ভোরের
দোয়েল। আপনার যাত্রা পথের উপর সামিয়ানার মতো শ্বেত শুভ্র
পালক বিস্তার করলো ঝাঁক ঝাঁক বকের পাখা। কাঁঠাল চাপার বন
পরম মমতায় আজলা ভরে ছিটাতে থাকলো অপার্থিব আতর।
যা কোনোদিন কোনো শাসক চোখেও দেখেনি। দেখবেও না
কোনোদিন। আর সংঘবদ্ধ হারামজাদাদের ঘেউ ঘেউকে স্তব্ধ করে দিলো
তিতাসের নবীন পানি। ঠিক সেভাবে যেভাবে নীল নদ ডুবিয়ে মেরেছিলো
ফেরাউনের ধাবমান বাহিনীকে।

জলের সবটুকু সচ্ছলতা চোখে নিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে ডাক দিলো
তিতাস, আয় বাপ, আয় আয় পুত্র আমার। ফিরে আয় আমার
কবিতা।—চোদানীরপুতদের পিছনে কারা তোকে ঘুরিয়ে মারে?
—সে ডাক দাম্ভিকদের শ্রবণেন্দ্রীয়কে বধির করে। হিংসা আর
নিচুতার এসিডে ডোবা পঙ্কিল পোকাদের দাহ করে। তাদের লা
জবাব বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে, গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি
পার হয়ে সেই ডাক পৌঁছে যায় অনন্তলোকে।

আরে, এতো আর য়ার তার বাড়ি ফেরা নয়। তিতাসের পুত্র বলে
কথা! কবি আল মাহমুদের বাড়ি ফেরা।—তাইতো অস্থির হয়ে ওঠে
পশ্চিমের আকাশ। তারপর কালের কলস ঢেলে ঢেলে আকুল
ব্যাকুল দু’হাতে ছড়াতে থাকলো রঙ আর আলোকের অনির্বচনীয় ঝর্ণাধারা।

ফাবি আইয়ে আলায়ে রাব্বি কুমা তুকাজজিবান!


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1092 বার