না’গঞ্জে আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর হত্যায় বন্ধু পিন্টুর ফাঁসি

Pub: Wednesday, May 29, 2019 4:39 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলায় তারই বন্ধু পিন্টু দেবনাথকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছেন আদালত। এছাড়া তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিককে ৭বছরের সশ্রম কারাদন্ড সেই সঙ্গে আরও ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়েছে। অর্থদন্ডের টাকা আদায় করে নিহতের পরিবারকে প্রদান করতে আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২৯ মে) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আনিসুর রহমান আসামীদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। এই মামলায় খালাস পেয়েছেন প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত আমলাপাড়া এলাকার আব্দুল্লাহ আল মামুন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, মামলাটি বেশ স্পর্শকাতর ছিল। সে কারণেই দ্রুত মামলাটি শেষ করা হয়েছে।
মামলার বাদী নিহতের ভাই বিপ্লব ঘোষ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যার ফাঁসির আদেশ হয়েছে সেটা দ্রুত কার্যকর চাই। তবে আমরা বাপেন ভৌমিকের যাবজ্জীবন ও মামুনের ৭ বছর কারাদন্ড প্রত্যাশা করেছিলাম। এখানে এক আসামিকে খালাস দেয়ায় আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো। আমার ভাই হত্যার বিচার হলে ও দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলেই আমাদের পরিবার শান্তি পাবে।
এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলার চার্জশীট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করা হয়। প্রবীর ঘোষ হত্যায় ২০৩ পাতার চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়। মামলায় ৩০ জন সাক্ষী থাকলেও ২৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
প্রবীর হত্যায় বন্ধকীকৃত স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল সেট, রক্তের দাগ লেগে থাকা কোমরের বেল্ট, সিমেন্টের ব্যাগসহ বিভিন্ন আলামত উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলো কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার চন্দনপুর গ্রামের মৃত সতীশ দেবনাথের পুত্র বর্তমানে আমলাপাড়া কেসি নাগ রোডের ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দেবনাথ (৪১), তার সহযোগী কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার ঠেটালিয়া গ্রামের কুমদ ভৌমিকের পুত্র বাপন ভৌমিক ওরফে বাবু (২৭) ও আমলাপাড়া কেবি সাহা রোডের মৃত হাজী মহসিন মোল্লার পুত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন মোল্লা (৫১)।
যেভাবে প্রবীরের লাশ ৭ টুকরো করে ঘাতক পিন্টু
নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়া এলাকাতে রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার দ্বিতীয় তলার ফ্লাটেই প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করছেন পিন্টু দেবনাথ। এক সময়ে এ ফ্লাটে থাকতো তারই গুরু হিসেবে পরিচিত অপু রায়। অপুর মৃত্যুর পর কয়েক বছর এ ফ্লাটে থাকলেও তারা চলে যায়। তখন থেকেই এ ফ্লাটে থাকতো পিন্টু। মাঝেমধ্যে এ ফ্লাটে পিন্টু ও প্রবীর মিলে পান করতো বিয়ার ও মদ। সে কারণে বিয়ার কিংবা মদের পার্টি হলেই এখানে ছুটে আসতো প্রবীর। আর সে সুযোগটিও কাজে লাগায় পিন্টু। গত ১৮ জুন রাতে প্রবীরকে বিয়ারের প্রলোভন দেখিয়েই ফ্লাটে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে পিন্টু।
ঘটনার ২১ দিন পর গত ৯ জুলাই রাতে ওই ফ্লাটের নিচ তলার সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীরের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় গ্রেফতার হন পিন্টু দেবনাথ।
১৮ জুন কালীরবাজার স্বর্ণ মার্কেট ও বঙ্গবন্ধু সড়কের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিসি টিভি ফুটেজে দেখা গেছে, প্রবীর ঘোষ রাত ৯টা ২৫ মিনিটে কালীরবাজার রোড থেকে মূল সড়কে বেরিয়ে আসছেন। এরপর সর্বশেষ তাকে জাতীয় পার্টির কার্যালয় ঘেঁষা গলি দিয়ে রাত ৯টা ৩১ মিনিটে বের হতে দেখা গেছে।
জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাত সাড়ে ১০টায় বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহকে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো টুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।
২১ দিন পর ৯ জুলাই রাতে পুলিশ লাশের ৬ টুকরোর মধ্যে ৫ টুকরো উদ্ধার করলেও পাওয়া যায়নি দুই পায়ে গোড়ালির নিচের অংশ।
পরদিন ১০ জুলাই পিন্টুর ওই ভবনের নিচে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ট্যাংকটি ভেঙে ফেললেও গোড়ালির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে বিকেলে আদালত বাপেন ও পিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫দিন করে রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্য মতে আমলাপাড়ায় পিন্টু যে বাড়িতে থাকেন তার পাশের একটি বাড়ির ড্রেনে থাকা আবর্জনার মধ্যে থেকে ওই গোড়ালির অংশ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিন্টুর দেওয়া তথ্য মতেই রাতেই শহরের কালীরবাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিদর্শন করা হয় যেখান থেকে সে চাপাতি কিনেছিল। ওই দোকান মালিক সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া শহরের চারারগোপ এলাকাতে চান্দু অ্যান্ড কোং দোকানের পাশে কামারের দোকানে গিয়ে ওই চাপাতি শান করা হয়। ওই দোকান মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 1004 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ