পাখির গ্রাম এখন চুয়াডাঙ্গা বেলগাছি

Pub: মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ ২:৩৬ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ ২:৩৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
আফজালুল হক: চুয়াডাঙ্গা শহর সংলগ্ন বেলগাছি গ্রাম। গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিভিন্ন গাছের ডালে বেধে রাখা আছে অসংখ্য মাটির ভাঁড় বা ছোট কলস। রাস্তার দুই পাশে গাছেল ডালে বেধে রাখা আছে প্রায় দেড় হাজার মাটির কলস আর চারশ’ বাঁশের ঝুড়িই। এ গুলো পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের বাসস্থান। গ্রামের মাঠে-ঘাটে এখন বিলুপ্ত প্রায় দেশি প্রজাতির বিভিন্ন পাখি ও অতিথি পাখিদের নিরাপদ বিচরণ দেখা মেলে খুব সহজেই চুয়াডাঙ্গা সংগ্লন বেলগাছিতে। এই গ্রামের মানুষের প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে পাখির কলধ্বনিতে। কয়েকজন স্বপ্নবান যুবক গ্রামটিকে পাখিদের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলেছেন। গাছে গাছে গড়ে তুলেছেন পখির কৃত্রিম আবাসস্থল। তাই দেখা মিলছে অনেক বিরল প্রজাতির পাখির। বেলগাছি এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামেই পরিচিত।
খাঁচায় বন্দী করে নয়। গাছের ডালে মাটির কলস আর বাড়ির কার্ণিসে ঝুড়ি বসিয়ে পাখিদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আবাসস্থল। নির্ভয়ে বাস করছে দেশী প্রজাতির নানা পাখি।
বেলগাছি গ্রামের শিক্ষক বখতিয়ার হামিদ বিপুল ও বখতিয়ার হোসেন দুই বন্ধু মিলে শুরু করেন পাখি রক্ষার কাজ। পরে তাদের সাথে যোগ দেয় গ্রামের ৩৫ জন যুবক। সবাই মিলেই গড়ে তোলেন ‘বেলগাছি যুব সমাজ’। এরইমধ্যে পাখি শিকার নিষিদ্ধ করেছে সংগঠনটি। গ্রামজুড়ে তাই পাখির কলরব।
চুয়াডাঙ্গার বেলগাছির হঠাৎপাড়ার স্কুল শিক্ষক বকতিয়ার হামিদ বলেন,ছোট বেলায় দেখতাম গ্রামের পুকুর, বিল ও মাঠ-ঘাট থেকে পাখি শিকারিরা বন্দুক, ফাঁদ পেতে, গাছে আঠা দিয়ে নিরীহ পাখি শিকারের দৃশ্য। সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করি একদিন পাখি শিকার বন্ধ করবো। আর পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলবো। সেই একক চেষ্টায় পাখিদের অভয়ারণ্য বেলগাছি গ্রাম। পাশে পেয়েছে বেলগাছি গ্রামের ‘যুব সমাজ’ নামের সংগঠনটি।যাদের একান্ত প্রচেষ্টায় পাখিদের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে সেই শিক্ষিত যুবকরা হলেন- শাহিন, সাহেল, টুটুল, সাব্বির, সাদ্দাম, মোমিন, সোনা, ফয়সাল, ফিরোজ, সবুজ, আরাফাত, আব্দুলসহ প্রমুখ।
বেলগাছি গ্রামের কৃষক রাজু বলেন, গ্রামের যুবকরা পাখি সংরক্ষণ করার কারণে ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খাচ্ছে পাখিরা। কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় কম।
চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র জিপু চৌধরী জানান, শিক্ষিত যুবকরা নিজেদের অর্থ ও প্রচেষ্টায় বেলগাছি গ্রাম পাখিদের প্রিয় আবাস ভূমিতে পরিণত করেছে। অবাধে পাখি শিকার বন্ধ হয়েছে। প্রাকৃতিক সোন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার ডিসি গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। এর ফলে এলাকায় পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, পাখিরা অবাধে বিচরণ করতে পারছে। চুয়াডাঙ্গার সাবেক ডিসি জিয়াউদ্দীন আহম্মেদ সবার সহযোগীতায় চুয়াডাঙ্গাকে পাখিদের অভয়ারণ্য ঘোষনা করেন। বর্তমানে ৩৫ জন যুবক যুব সমাজ সংগঠনে আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন। যুবকরা টিউশনি করে যে টাকা পায় তা দিয়ে নিজেদের পড়াশুনার খরচ মিটিয়ে বাকি টাকা দিয়ে পাখিদের জন্য খাদ্য ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করছেন।

পাখি শিকার ও হত্যা বন্ধে জনগনকে সচেতন করার জন্য লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, সাইনবোর্ড টাঙ্গানোসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
ফলে পুরো জেলা পাখিদের অভয়ারণ্য হওয়ায় এখন এ জেলায় যে দিকেই তাকানো যায় কোন না কোন পাখি যেমন দেখা যায়। তেমনই সারাক্ষণ পাখিদের কিচির মিচির ডাকও কানে আসে। এমন উদ্যোগ নেয়ায় বাংলাদেশের মানুষ চুয়াডাঙ্গাকে নতুন করে চিনছে পাখিদের অভয়ারণ্য জেলা হিসাবে। এই শীতে অতিথি পাখিদের দেখা যায় মাঠ-ঘাট, বিল, বাওড়, ডোবা ও পুকুরে। বেলগাছি গ্রামে যে সব পাখি দেখা যায়- ঘুঘু, কোকিল, শালিক, চড়–ই, দোয়েল, কাক, বক, কুলঝুঁটি, কাঁটঠোকরা, পানকৌড়ি, ধলেশ্বর, শামুকভাঙ্গা, হাঁসপাখি, কাঁদাখোঁচা, চেগা, ডাহুক, কোড়াপাখি, বালিহাঁস, ময়না, টিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কাঠবিড়ালি, হুতুমপেঁচা, গুইসাপসহ অন্য প্রাণিরাও জায়গা করে নিয়েছে এখানে ।
চুয়াডাঙ্গা পৌর সভার ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলার সিরাজুল ইসলাম মনি বলেন, শিক্ষিত যুবকরা নিজেদের অর্থ ও প্রচেষ্টায় বেলগাছি গ্রাম পাখিদের প্রিয় আবাস ভূমিতে পরিণত করেছে। অবাধে পাখি শিকার বন্ধ হয়েছে। প্রাকৃতিক সোন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

এখন প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে ব্যাচে ছাত্র পড়ানোর আগে সূর্য ওঠার পরপরই বেলগাছি যুবসমাজের বন্ধুদের নিয়ে পাখির বাসাগুলো দেখতে বের হন শিক্ষক বিপুল। আর বিকেলে ফসলে ভরা হলুদ-সবুজ মাঠে পাখিদের আনাগোনা কত বাড়ল তা দেখতেও তাঁরা বের হন সদলবলে।

বিপুলের সহযোদ্ধা আশরাফুল আঙুল উঁচিয়ে ফসলে ভরা সোনালি মাঠের শেষ সীমানা দেখিয়ে বললেন, ওইখানে দেখেন কতগুলো নিমগাছ। এগুলো কেউ রোপণ করেনি। গ্রাম থেকে নিমফল নিয়ে পাখিরাই সেখানে ফেলেছে। এখন সেখান থেকে নিমের ডাল গ্রামের সবাই নেয়। ওই নিমবাগানটি পাখিদের তরফ থেকে গ্রামবাসীর জন্য দেয়া উপহার। প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখতে জেলার বিভিন্নস্থান থেকে অসংখ্য দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা যায়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1046 বার