fbpx
 

বাস থেকে কেনা জুস খেয়ে মেধাবী ছাত্রীর মৃত্যু

Pub: Thursday, October 3, 2019 9:08 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি :
‘প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্সেও প্রথম হওয়া মেধাবী ছাত্রী সুস্মিতা হোম চৌধুরী মন্টির জীবন কেড়ে নিল তরল পানীয়ের সঙ্গে মেশানো চেতনানাশক ওষুধ।

বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা নেয়ার পথে ত্রিশাল এলাকায় তার মৃত্যু হয়।

সুস্মিতা হোম চৌধুরী মন্টি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের কদিম ডৌহাখলা গ্রামের সুবীর হোম চৌধুরী (কাঞ্চন হোম চৌধুরী) মেয়ে।

মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে নিন্দার ঝড়। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও তার সহপাঠীরা শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

মন্টি নিজেই বাবাকে বারবার বারণ করত রাস্তায় কিছু খাবে না, ক্ষুধা থাকলেও খেতে ছিল বারণ। মেয়েটিও ঠিক সেভাবেই চলত। ভারতে বাবাকে চিকিৎসা করতে নিয়ে যাওয়ার পথেও এ দিকটায় সজাগ ছিল সব সময়।

প্রিয় মন্টি এবার সেই ফাঁদে পড়েই মারা গেল। কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সুবীর হোম চৌধুরী।

তিনি বলেন, মেয়েটা প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ব্রিজে আসে। তখন দুটো শিশু জুস কিনতে অনুনয়-বিনয় করে। সেদিন ছিল প্রচণ্ড রোদ তারপরও মন্টি সেটা তখন খায়নি। ব্যাগেই রেখে দেয়।

সুবীর হোম চৌধুরী বলেন, এই জুসের বোতল নিয়ে আবারও ঢাকা, বোনের বাড়ি এবং আত্মীয়দের বাড়িতেও ঘুরে আসে মন্টি। দুই ভাগিনাকে দিতে চেয়েছিল, ভুলে দেয়া হয়নি। ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা যাবে তাই ১৬ তারিখ রাত ১০টার দিকে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে সেই জুসের বোতল দেখতে পায়। সেই জুসই কেড়ে নিল আমার মেয়ের জীবন।

মন্টির মা প্রীতি হোম চৌধুরী জানান, ওই রাতে মন্টি কিছুই খেতে চায়নি। শুধু এক গ্লাস দুধ খেয়েছিল। এরপর দুই ঘণ্টার পর কাপড় গোছাতে গিয়ে ব্যাগের ভিতরে জুস পেয়ে একাই খায়। খাওয়ার এক সেকেন্ডের মাঝেই বিছানায় লুটিয়ে পড়ে মন্টি। আমরা ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার জ্ঞান ফিরে পরের দিন বিকাল ৪টায়, প্রায় ১৭ ঘণ্টা অচেতন ছিল সে।

অপরদিকে ডা. কমল কুমার হোম চৌধুরীর পুত্র কুন্তল কুমার হোম চৌধুরী জানান, মন্টি তার চাচাতো বোন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই সঙ্গে ছিলাম। জুসের খালি বোতলে দানাদার গুঁড়াযুক্ত রয়েছে।

তিনি জানান, ব্রিজেই তাকে অচেতন করে মালামাল লুট করার জন্য ছিনতাই চক্রের কাজ এটা। ওরাই দুটো শিশুকে দিয়ে মানবিক আবেদন করে জুসটা বিক্রি করে। মন্টি কিনলেও সেটা খায়নি। হয়তো সেখানে খেলে এতটা বিষক্রিয়া হতো না।

কুন্তল কুমার হোম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন জুসের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ থাকায় এটার বিষক্রিয়া মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। সেটা খাওয়ার কারণেই তার জিহ্বা, গলা, খাদ্যনালী ও লিডারে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরে কিডনিও ড্যামেজ হয়ে যায়।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রবিউল ইসলাম ছাড়পত্রে উল্লেখ করেন ১৩ দিন পূর্বে রাস্তার কোমল পানীয়ের সঙ্গে বিষক্রিয়া ছিল। এ কারণে তার শরীরের কিডনি, লিডারসহ অচল হয়ে যায়।

মন্টির বাবা সুবীল হোম চৌধুরী আরও বলেন, ময়মনসিংহ হাসপাতালের ডাক্তারের অবহেলাও মৃত্যু জন্য দায়ী। ২১ সেপ্টেম্বর তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ‘রোগী ভালো’ বলে ২৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছুটি দেয়। বাড়িতে আসার পর আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

মন্টির বাবা বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে আবারও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। দিন দিন মন্টির অবস্থা খারাপ হলেও হাসপাতালের ১১নং ওয়ার্ডের ৪নং ইউনিটের ডা. রবি সাহেব বারবার শুধু বলেছেন ‘আপনার মেয়ে ভালো আছে’।

মন্টির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় বুধবার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। ঢাকায় নেয়ার পথে ত্রিশাল এলাকায় যাওয়ার পর সুস্মিতা হোম চৌধুরী মন্টি মারা যান।

নিহত মন্টির বাবা বলেন, মিথ্যা সান্তনা দিয়ে আমার মেয়েকে উন্নত চিকিৎসাও করতে দেয়নি।

এ বিষয়ে হাসপাতালের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. হিবরুল বারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেন।

হাসপাতালের অভিযোগ নাম্বারে বৃহস্পতিবার কল দেয়ার পর বলেন, অভিযোগ সম্পর্কে এই মুর্হূতে কিছু বলা যাচ্ছে না।

মন্টির বাবা সুবীর হোম জানান, পানীয়ের সঙ্গে অচেতন জাতীয় ওষুধ মেশানো থাকায় তা খাওয়ার পর গলা ও শ্বাসনালীতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে ডাক্তার তাকে নিশ্চিত করেন।

মেধাবী ছাত্রীর মৃত্যুতে ডৌহাখলা উচ্চবিদ্যালয়েও ছিল শোকের মাতম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নরোত্তম রায় বলেন, মন্টি সর্বক্ষেত্রে পারদর্শী ছিল। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মন্টি। স্বপ্ন ছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার। সেই লক্ষ্যপূরণের জন্য চলছিল ঢাকায় যাতায়াত।

মন্টি ২০০৭ সালে ডৌহাখলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে। ২০০৯ সালে গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি (অনার্স) কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পায়। ময়মনসিংহ মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজ থেকে গণিতে অনার্স ও মাস্টার্সেও প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয় মন্টি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ