fbpx
 

অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় হারুন পুলিশ প্রশাসনে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে

Pub: Tuesday, November 5, 2019 11:06 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম আর কামাল, স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রেফতার ও আটক বাণিজ্যসহ নানা ধরণের বেআইনি কার্যকলাপের মাধ্যমে আলোচনায় আসা প্রভাবশালী এসপি হারুন বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন। ফলে যে কারো মনে হতেই পারে, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। যে ক্ষমতা দিয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। আইনের হাত তার দিকে প্রসারিত হয় না। দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা থাকলেও কোনো কিছুকেই তিনি তোয়াক্কা করেননি। অদৃশ্য এক শক্তির ইশারায় তিনি পুলিশ প্রশাসনে নিজের আধিপত্য বজায় রেখে চলেছেন। সাধারণ মানুষ তো তার কাছে পাত্তাই পায় না। এমনকি সরকারি দলের লোকজন, এমপি-মন্ত্রীকেও তিনি তোয়াক্কা করেন না। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে কোনোদিন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা শোনা যায়নি। উল্টো বিভিন্ন সময় তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন।
পুলিশের একটি বিশেষ শাখার সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে এসেই তিনি প্রবল বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট লোকজনসহ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের নানাভাবে তিনি হয়রানী করেন। কাউকে মাদক দিয়ে কাউকে চাঁদাবাজ বানিয়ে একরকম নারায়ণগঞ্জকে পুলিশের রামরাজত্বে পরিনত করেন। সরকারী বিভিন্ন দপ্তরে এসপি হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েও এসপি হারুনকে দমাতে পারেননি শামীম ওসমান। জেলার এসপি হয়েও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জেলার আ’লীগকে দুইভাবে বিভক্ত করে ফিরে গেলেন। যার খেসারত খোদ আ’লীগকে দিতে হবে বলে মনে করেন জেলাবাসী। শামীম ওসমানের সঙ্গে টক্কর দিয়ে টিকে যাওয়ায় এক পর্যায়ে এসপি হারুন অর রশিদ বোপরোয়া হয়ে উঠে। জেলাবাসীকে প্রমান করতে সমর্থ হন তিনি শামীম ওসমানের চাইতেও ক্ষমতাবান।
সূত্রটি জানায়, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি, জমি দখল আর বিভিন্ন ঘটনায় নাটক সাজিয়ে নিরপরাধ মানুষকে ডিবি ও এসপি অফিসে ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা আদায় করা নিয়ে তার বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগ আছে। তার দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির খবর সকলে জানলেও এক শ্রেনীর স্থানীয় দালালদের কারণে অনেকই প্রকাশ করতে ভয় পেতেন। ফলে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করা হারুন থেকে গেছেন নারায়ণগঞ্জে ঘটনার অন্তরালে। তিনি নারায়ণগঞ্জে ডি আই (২) সাজ্জাদ রোমনের মাধ্যমে স্থানীয় মিডিয়ার একটি অংশকে এসপি হারুনের পক্ষে নিয়মিত পজিটিভ প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়েছেন। যার বিনিময়ে সাজ্জাদ রোমন নিয়মিত ঐসকল সাংবাদিকদের সঙ্গে নানাভাবে নানা কায়দায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। মুলত সাজ্জাদ রোমনের মাধ্যমেই এসপি হারুন তার মিডয়া বান্ধব গড়ে তুলেন নারায়ণগঞ্জে।
এই এসপি হারুন নায়াণগঞ্জ থেকে অপকর্মের কারণেই পুলিশ হেড কোয়ার্টারে শাস্তিমুলক বদলী হয়েছেন রবিবার বিকালে। এর আগে এসপি হিসেবে তিনি প্রথম গাজীপুরে নিয়োগ পান। সেখানকার মানুষ আজও এসপি হারুনের নাম শুনলে ঘৃণায় থু থু ফেলে। আতঙ্কে কারো কারো রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। গাজীপুরে জমি দখল চাঁদাবাজিসহ তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ থাকলেও সেসব অভিযোগের কোনো সুরাহা আজও হয়নি বলে। গাজীপুরে এসপি হারুনের চার বছরের রাজত্বে মাদক ও আবাসিক হোটেলে দেহ ব্যবসা ও জুয়ার জমজমাট ব্যবসা চলে। আর এসব অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা তিনি হাতিয়ে নেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে বদলি হয়েই তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েন। শামীম ওসমান নিজেও এসপি হারুনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন। তিনি প্রশাসন দূর্ণীতিমুক্ত চেয়েছেন গত ১১ মাসে বেশ কয়েক বার। গাজীপুরে থাকাবস্থায় সরকার দলীয়রাও রেহাই পায়নি দূর্ণীতিবাজ এই এসপির হাত থেকে। সরকার দলীয় কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল মামুন ম-ল, নূরুল ইসলাম নূরু, মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদ ও তার পাঁচ সহোদরসহ অনেক দলীয় নেতাকর্মী এসপি হারুন কর্তৃক নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি গাজীপুর-২ আসনের এমপি জাহিদ আহসান রাসেলের চাচা মতিউর রহমানকেও হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উঠতি ব্যবসায়ীদের নানা অজুহাতে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো বলেও গাজীপুরের স্থানীয়দের অভিযোগ আছে। কালিয়াকৈরের যুবলীগ নেতা রফিক হত্যার পর ডিবির উৎপাতে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটিসহ আশপাশের এলাকা প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। তখন ১৫ দিনে প্রায় দেড়শ লোককে ডিবি আটক করে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এক ব্যক্তিকে দুই থেকে তিনবার আটক করার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু আলোচিত দুর্নীতিবাজ এসপি হারুন এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মানুষের পাশাপাশি দেশের মানুষ তার বিরুদ্ধে সরকারের কোনো অ্যাকশন না থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকরা রিপোর্ট অনুযায়ী তিনি চাঁদাবাজি আর দুর্নীতির মাধ্যমে বাড়ি গাড়িসহ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেনে। বিদেশে পাচার করেছেন শত শত কোটি টাকা।
পুলিশ ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এসপি হারুনের স্ত্রীর ১৫৩২ কোটির টাকার সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এই বিপুল পরিমান অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার করেছিলেন হারুন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের নিউ হাইড পার্ক এলাকায় নগদ ৫ মিলিয়ন ডলারে একটি বাড়ি কিনতে গেলে অর্থের উৎস নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। এরপরই ওই টাকা আটকে দেয় এফবিআই। এরপর ধরা পড়ে হারুনের স্ত্রীর ১৮০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদের পাহাড়, যা পরে আটকে দেয় এফবিআই। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হারুন অর রশিদ গাজীপুরে ১৬৩ বিঘা জমি কিনেছেন, এরমধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় ৫৬ বিঘা, কালিগঞ্জে ২২ বিঘা এবং গাজীপুর সদরে ৮৫ বিঘা রয়েছে। ঢাকা শহরে কিনেছেন একাধিক বাড়ি। এছাড়া মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোম প্রজেক্টের অধীনে সরাসরি বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৮৯০ কোটি টাকা। সেখানকার নাগরিকত্বও নিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছেন।
২০১৬ সালে গাজীপুরে ভূমি জালিয়াতি মামলায় এসপি হারুনের বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়। জোরপূর্বক ৮ বিঘা জমি রেজিষ্ট্রি করিয়ে নেয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা গাজীপুর মহানগরের ভোগড়ার বাসিন্দা এম দেলোয়ার হোসেন ওই মামলা দায়ের করেন। এই বাদীর বাড়ি থেকে পৌনে তিন কোটি টাকার সম্পদ লুটপাটেরও অভিযোগ আছে এসপি হারুনের বিরুদ্ধে। এই বিতর্কিত এসপির দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে শত শত প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে তিনি অধরাই রয়ে গেছেন।
২০১৪ সালে গাজীপুরের এসপি পদে নিয়োগ পান হারুন। টানা চার বছর সে দায়িত্বে তার দুর্নীতির পরিমান ৪ হাজার কোটি টাকার মত হতে পারে বলে মনে করেন পুলিশ বিভাগে কর্মরত তার সহকর্মীরা। নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর থেকেও এসপি হারুন অর রশিদ গত ১১ মাসে হাজার কোটি টাকা বিভিন্নভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন। তেল চোর, মাদক ব্যবসায়ী, ব্যবসাীয়, জমি বিক্রেতা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ মিটিয়ে, ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি, সাধারন মানুষকে ব্লাকমেইল করেছেন। সরকার দলীয় অনেক নেতাকে আটকে টাকা আদায়েরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যখনই ঘটনা ঘটেছে তখনই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মিডিয়া কর্মীদের শুধু এই বলে শান্তনা দিয়েছে, ভাই সময় হলে সব মিডিয়ায় প্রকাশ করব। এখন যদি প্রকাশ করতে যাই তাহলে সে আমাদের ক্রসফায়ারে হত্যা করবে। শুধু নিরাপত্ত্বাজনিত কারণে এখন কিছু না লিখার অনুরোধ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বিসিবি’র পরিচালক ও গুলশান ক্লাবের সভাপতি শিল্পপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, আম্বার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিমের কাছে ৮ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন এসপি হারুন। এই চাঁদা না দেয়ায় শুক্রবার রাতে তার শুলশানের বাসভবনে গভীর রাতে তিনি হানা দেন। তার সঙ্গে ছিলেন ডিবির পোশাক পরা, সাদা পোশাকধারী ও পুলিশের পোশাক পরা ৬০ থেকে ৭০ জন। এ সময় তার বাসা তছনছ করা হয়। তাকে বাসায় না পেয়ে তার স্ত্রী ও পুত্রকে তুলে নিয়ে যায়। তাদের গুলশান থানায় না রেখে কিংবা কোনো তথ্য না দিয়ে সরাসরি নারায়গঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে এসপি হারুনের প্রবেশ এবং তার স্ত্রী-পুত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এসপি হারুন দলবল নিয়ে শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনের নিচতলায় ঢুকে সঙ্গীদের ওপরে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। লিফটে করে ১১তলায় তার বাসভবনে তিন দফায় প্রায় ২০ জন প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পর তার সঙ্গে আসা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাসেলের স্ত্রী ও পুত্রকে বের করে নিয়ে আসেন। শওকত আজিজ রাসেল জানান, আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা ক্লাব থেকে তার গাড়িটিও জব্দ করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে গেছেন এসপি হারুন। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শওকত আজিজ রাসেলের বাসভবনে এসপির হারুনের এই বাহিনী নিয়ে প্রবেশের কথা জানে না গুলশান থানা পুলিশ কিংবা ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি। শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী ফারাহ রাসেল মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ কন্যা। তাদের ২৩ বছরের দাম্পত্য জীবন। আর ছেলে আহনাফ আজিজ যুক্তরাজ্য থেকে পড়াশোনা শেষ করে সদ্য দেশে এসেছেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হলেও রাজধানীর বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে চাঁদাবাজী করেছেন। প্রতিমাসে তিনি এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ঢাকায় এসে নিয়মিত গুলশানের লেকশোর হোটেলে বসেন। সেখানে বসেই চাঁদাবাজীর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন এবং চাঁদার টাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে যান।
উল্লেখ্য, এসপি হারুন নিয়মিতই নাম্বার প্লেটহীন গাড়িতে করে ঢাকায় চলাফেরা করেন। রাজধানীর শাহবাগ, মগবাজার ও গুলশান, বনানীতে স্থাপিত পুলিশের সিসিটিভি ফুটেজ (১ নভেম্বর) পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জে গড়ে উঠছে আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠানে ৫০০ থেকে ১০০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও মাসে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এসপি হারুন। ওই চাঁদা না দেয়ায় তিনি আম্বার গ্রুপের কর্ণধারকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে আম্বার গ্রুপের কর্মকর্তা জানান।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ