সংবাদমাধ্যমের কালো দিবস আজ : গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসুন

Pub: মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২০ ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

১৬ জুন স্মরণীয় হয়ে আছে সংবাদপত্রের তথা গণমাধ্যমের কালো দিবস হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাকশালের একদলীয় শাসনব্যবস্থার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে দেশের সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়েছিল। শেখ মুজিব তাই বলে দেশকে একেবারে সংবাদপত্রহীন করেননি। ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দ্য বাংলাদেশ টাইমস—এই চারটি দৈনিককে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সরকারের মালিকানায় নেয়ার ফলে এসব দৈনিকে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের গুণকীর্তন ছাড়া অন্য কোনো খবর পাওয়া যেত না। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে বেকার হয়ে পড়েছিলেন সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীরা। জাতি বঞ্চিত হয়েছিল সঠিক সংবাদ জানার মৌলিক অধিকার থেকে। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন নিষিদ্ধ করা হলেও প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার কিন্তু শুরু থেকেই সরকারের সমালোচনা এবং বিরোধী রাজনীতিকে সহিংস পন্থায় দমনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। পাকিস্তানের সামরিক ও স্বৈরশাসকদের কায়দায় সরকারের বিরোধিতাকে রাষ্ট্র ও স্বাধীনতার বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে বিরোধী দলের তো বটেই, গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সরকারের উদ্যোগে দলীয় সন্ত্রাসকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় রক্ষীবাহিনীসহ নানা নামের বাহিনীকে বিরোধী দল দমনের জন্য লেলিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজে পল্টন ময়দানের জনসভায় বিরোধী দলের ওপর ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া’ দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। কর্মীদের বলেছেন ‘সুন্দরী কাঠের লাঠি’ হাতে নিতে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা গেছে, শেখ মুজিবের মাত্র সাড়ে তিন বছরে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৭ হাজার নেতা-কর্মী।

রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সংবাদপত্রের ওপরও মুজিব সরকার প্রচণ্ড দমন অভিযান চালিয়েছিল। সরকার ১৯৬০ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক সরকার প্রবর্তিত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্সই কেবল বহাল রাখেনি, ১৯৭৩ সালে সে কালাকানুনটিকেই ‘মুদ্রণযন্ত্র ও প্রকাশনা অর্ডিন্যান্স’ নামে প্রবর্তন করেছিল। এই অধ্যাদেশের আড়াল নিয়ে সরকার একদিকে সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশনার ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ চাপিয়েছে, অন্যদিকে নিষিদ্ধ করেছে একের পর এক সংবাদপত্রের প্রকাশনা। ১৯৭২ সালেই নিষিদ্ধ হয়েছিল মওলানা ভাসানীর ‘হক-কথা’, সাপ্তাহিক ‘গণশক্তি’, ‘লাল পতাকা’, ‘নয়াযুগ’, মুখপত্র’ ও ‘স্পোকসম্যান’ এবং চট্টগ্রামের দৈনিক ‘দেশবাংলা’। বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুদের মূল দল জাসদের মুখপত্র দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ও নিষিদ্ধ হয়েছিল। কবি আল মাহমুদসহ কয়েকজন সম্পাদককে গ্রেফতার করেছিল সরকার। এ পর্যন্ত এসেও থেমে পড়েনি মুজিব সরকার, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন শেষ পর্যন্ত সব সংবাদপত্রই নিষিদ্ধ করেছিল। উল্লেখ্য, সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে নেয়া এই পদক্ষেপ ছিল শেখ মুজিবের গণতন্ত্রবিরোধী সামগ্রিক নীতি ও কর্মকাণ্ডের অনিবার্য অংশ। সীমাহীন লুণ্ঠন, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, আওয়ামীকরণ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিণতিতে দেশ ভয়ঙ্কর এক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল। ১৯৭৪ সালের সে দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। অমন এক পরিস্থিতিতে দরকার যখন ছিল সব দলকে সঙ্গে নিয়ে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা ও উন্নয়নের জন্য চেষ্টা চালানো, শেখ মুজিব তখন ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ আড়ালে নিজের একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সরকার বিরোধিতাকে সমূলে উত্খাত করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সংশোধনীর আগে পর্যন্ত শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পাস করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতির স্থলে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়, সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে গঠন করা হয় দেশের একমাত্র দল বাকশাল। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে চেয়ারম্যান করে বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ৬ জুন। এরই ধারাবাহিকতায় চারটি ছাড়া সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ হয় ১৬ জুন।

বাকশালের পরিণতি সম্পর্কিত আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে বলা দরকার, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও শেখ মুজিবের পথেই এগিয়ে চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমও। দৈনিক আমার দেশ-এর প্রকাশনা একাধিকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এ সময়েও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার গ্রেফতার করেছে সরকার। তাকে রিমান্ডে নিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদকেও সরকার গ্রেফতার করেছে, রিমান্ডে নিয়েছে। আরও কয়েকজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভিকেও নিষিদ্ধ করেছে সরকার। একযোগে চলছে অ্যাডভাইস বা পরামর্শের আড়ালে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা। অর্থাত্ বর্তমান সরকারও মুজিব সরকারের মতোই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একই কারণে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাকশালের ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা অবশ্য মনে করি, ক্ষমতাসীনদের উচিত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে গণতন্ত্রের বিকাশকেও বাধামুক্ত করা।
লেখকঃ প্রদান সম্পাক শীর্ষ খবর ডটকম।

Hits: 40


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ