মাকড়সার জালে বড় পোকারা কতটা আটকায়?

Pub: রবিবার, মার্চ ১১, ২০১৮ ৪:৩৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, মার্চ ১১, ২০১৮ ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আলমগীর স্বপন:
ধরা যাক তিনি ‘ক’ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধান। একদিন সেই রাষ্ট্রপতি গেছেন এক গাড়ি প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা রাষ্ট্রপ্রধানকে পেয়ে খুবই উৎফুল্ল। তিনি রাষ্ট্রপতিকে একটি দামি গাড়ি উপহার দিতে চাইলেন। রাষ্ট্রপতি বিব্রত হয়ে বললেন, ‘না না আমি বিনা পয়সায় কিছু নিতে পারি না। এতে দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়।’ উদ্যোক্তা নাছোড়বান্দা। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব রেখে বললেন, ‘তাহলে গাড়ির দাম বাবদ আমাকে শুধু দশ টাকা বিনিময় মূল্য দিলেই হবে।’

রাষ্ট্রপতি উদ্যোক্তার দিকে তাকালেন। এরপর মিষ্টি হেসে বললেন, ‘গ্রেট আইডিয়া। তাহলে আমাকে পাঁচটি গাড়ি দিন।’ এই বলে রাষ্ট্রপতি সেই উদ্যোক্তার দিকে পঞ্চাশ টাকার নোট এগিয়ে দিলেন।

ওই পরিস্থিতিতে সেই উদ্যোক্তার কী অবস্থা হবে? মালুম করা যাক এরপর তিনি কী ভাবতে পারেন। এক্ষেত্রে দুটি দিক ভাবা যায়। হয় সেই উদ্যোক্তা সেদিনই দিব্বি কাটবেন, যেচে ধরা খাওয়ার এমন আবেদন আর কাউকে কখনও করবেন না। আর যদি ধুরন্ধর হয়ে থাকেন, তাহলে এতে নিশ্চয়ই তিনি হতাশ হবেন না। পাঁচ গাড়ির ক্ষতি সুদে আসলে পাঁচশ’ গুণ আদায় করে নেবেন রাষ্ট্রপতিকে দেয়া উপহারের লাইসেন্স ভাঙিয়ে। এমন ধুরন্ধররাই তো এখন দুনিয়াব্যাপী ক্ষমতার আশপাশে থাকেন। একদিকের ক্ষতি আরেক দিক থেকে সুদে আসলে পুষিয়ে নেন।

এই তো এক-দেড় বছর আগের কথা। অভিশংসনে ক্ষমতাচ্যুত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি পার্ক জিউন হাইয়ের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে চেয়েছিলেন স্যামসাংয়ের প্রধান নির্বাহী। এর মাধ্যম ছিলেন পার্কের বিশ্বস্ত সহযোগী চোই সুন সিল। কিন্তু এ খবর চাপা থাকেনি। পার্কের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল তিনি তার বন্ধু চোই সুনকে অবৈধভাবে ক্ষমতার নেপথ্যে থেকে দুর্নীতির সুযোগ করে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে চোই সুন অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদানের নামে ৬৫.৫ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেন। এর মধ্যে স্যামসাং ও হুন্দাইয়ের মতো কোম্পানিও ছিল। ওই অর্থ সন্দেহভাজন একটি ফাউন্ডেশনের নামে নেয়া হয়। পরে তিনি সেখান থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হন। সেই লাভের ভাগ গদিচ্যুত রাষ্ট্রপতি কতটা পেয়েছেন বা বিপুল অনুদান দিয়ে স্যামসাং ও হুন্দাই সরকারের কাছ থেকে কোনো ব্যবসায়িক সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছিলেন কিনা তার বিচার অবশ্য এখন চলছে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালতে।

সব দেশেই দুর্নীতি হয়, বিচারও হয়। কিন্তু এতে সাবেক বা বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যে ছাড় পান না এর বড় উদাহরণ দুর্নীতির দায়ে ক্ষমতাচ্যুত পার্ক জিউন। আর তরতাজা উদাহরণের কথা বললে যেতে হবে আরেক দক্ষিণে। দক্ষিণ আফ্রিকায়। দেশটির সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি জ্যাকব জুমার বিরুদ্ধে তার নিজ দলের ভেতর থেকেই উঠেছিল ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। প্রথমে অস্বীকার করলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। গত ১৫ ফেব্র“য়ারি ছাড়তে হয়েছে রাষ্ট্রপতির পদ। অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে চাপের মুখে আছেন ইসরাইলের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। ২ মার্চ দুর্নীতির মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইসরাইলের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বেনজেক তাদের খবরের ওয়েবসাইটে নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রীর ব্যাপক কভারেজ দিয়েছে। এর বিনিময়ে টেলিকম প্রতিষ্ঠানটি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা নিয়েছে। এর সবকিছু করেছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।

সরকারপ্রধানদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে চলে আসে ইংল্যান্ডে পলাতক থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার নামও। সেনাশাসিত দেশটির আদালত দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইংলাককে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। চালে ভর্তুকি দিয়ে রাষ্ট্রের শতকোটি ডলার ক্ষতি করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

ওপরের চার দুর্নীতির ঘটনা চার দেশের। এর তিনটি ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানদের দুর্নীতি নিয়ে। আর অন্য অভিযোগটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে দু’জন সরকারপ্রধানকে দুর্নীতির দায় নিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। আরেকজন বিচারের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু সাবেক কিংবা বর্তমান যাই হোক, বাংলাদেশে সরকারপ্রধানদের দুর্নীতির তদন্ত-বিচার খুবই কঠিন কাজ। ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে তো বলা যায় অসম্ভব। এখানে ক্ষমতাসীন দূরের কথা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিচার নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। চলছে পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক বাহাস। ৮ ফেব্র“য়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় তার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। রায়ের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অর্থ আত্মসাৎ করেননি। কেউ কেউ বলছেন, তার সম্মতিতে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে মাত্র। একে আমানতের খেয়ানত বলা যায়, দুর্নীতি নয়। অর্থাৎ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ টাকার হেরফের হয়েছে শুধু, টাকা আত্মসাৎ হয়নি। তবে আদালত মনে করেছেন, দুদক আইন অনুযায়ী এটি দুর্নীতি। তাই পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে।

খালেদা জিয়ার মামলার রায় যেদিন হয়েছে এর মাত্র তিন দিন আগে পত্রিকার একটি খবরে নতুন করে চোখ ছানাবড়া হয়েছে অনেকের। ব্যাংকিং আইনের তোয়াক্কা না করে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই রাষ্ট্রীয় জনতা ব্যাংক এক ব্যক্তির কোম্পানিকে দিয়েছে ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা ঋণ, যেখানে আইন আছে ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ দেয়া যাবে না একক গ্রাহককে। এ নিয়ম অনুযায়ী জনতা ব্যাংক থেকে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পাওয়ার কথা ছিল না এননট্যাক্স গ্র“পের মালিকের। অথচ পেয়েছেন এর ৭ গুণ, ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের কর্তা-পরিচালকরা কি আইনের বই গুলে খেয়েছিলেন। নাকি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে গিয়ে তারা চোখ-কান বন্ধ রেখেছিলেন?

পত্রিকার খবর অনুযায়ী এ ঋণের গ্রহীতা এক সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরি করতেন। তিনি ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিশ্চয়ই হাওয়ার ওপর পেয়ে যাননি। এজন্য তাকে প্রভাবশালীদের ধরতে হয়েছে। ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন এমন একজন সিবিএ নেতার গ্রামের বাড়িতে মসজিদ নির্মাণে দুই-আড়াই কোটি টাকা অনুদান দেয়ার কথা স্বীকারও করেছে দু’পক্ষ। যদিও অভিযোগ ১০০ কোটি টাকার মতো অনুদান দেয়ার। এছাড়া ঋণগ্রহীতার সঙ্গে একজন মন্ত্রী, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যাংক কর্মকর্তাদের খাতিরের খবরও বেরিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন, এই যে অনিয়মের অভিযোগ তা কতটা সঠিক? এর তদন্ত, বিচার কি হবে? খালেদা জিয়ার রায়ের পর এমন প্রশ্ন জোরেশোরেই উঠেছে।

প্রশ্ন কি শুধু জনতা ব্যাংকের এ অনিয়ম নিয়ে? সাধারণ মানুষ আশা করে বেসিক ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত দ্রুত শেষ করবে দুদক। যদিও এ নিয়ে শুরু থেকেই খটকা ছিল। কারণ মামলার দুই বছরে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে আলোচিত বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনেনি দুদক। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর শেষ পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এখনও চার্জশিট দেয়ার নামগন্ধ নেই। শোনা যাচ্ছে তাকে আরও নাকি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দুদক চেয়ারম্যান ২৫ ফেব্র“য়ারি বলেছেন, আত্মসাৎ হওয়া টাকা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত চার্জশিট দেয়া হবে না। তাহলে এ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কি চলবেই? এ প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে? খালেদা জিয়ার রায়ের পর এ প্রশ্ন করার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রশ্ন আছে হলমার্ক দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও। ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয় সোনালী ব্যাংক থেকে। এ অভিযোগে হলমার্কের মালিক, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন কারাগারে আছে। কিন্তু চার্জ গঠনেই কেটে গেছে অনেক সময়। ডেসটিনির চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার ক্ষেত্রেও নাকি একই পরিস্থিতি। আর শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা উধাওয়ের ঘটনা যে ঘটেছিল, তা কি সত্যিই ঘটেছিল- এ ঘটনার তদন্তে যাদের প্রাথমিকভাবে নাম এসেছিল তাদের মধ্যে রাঘববোয়ালরা আইনের আওতায় আসেনি কেন? পানামা, অফশোর ও প্যারাডাইস পেপারে বিভিন্ন সময়ে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অথচ দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আছে। অন্যদিকে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সরকার সাধুবাদ পাচ্ছে। কিন্তু অনেক প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাজার রায়ের পর এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়ের প্রায় এক মাস হয়েছে। তাই এসব প্রশ্নের জবাব জানতে চাওয়ার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

দুর্নীতির বিচারের ক্ষেত্রে যদি রাজনীতি প্রাধান্য পায় সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয় না। খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়ে রাজনীতি নেই, সেই বিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে হলে সরকারকে সহায়ক হতে হবে সব দুর্নীতির বিচারে। দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, বিচার প্রক্রিয়াকে রাখতে হবে প্রভাব ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

ইতিহাসবিদ উইলি ডুরান্ট বলেছেন, ‘আইন হল মাকড়সার জালের মতো, যা ছোট ছোট পতঙ্গদের আটকাতে পারে, কিন্তু বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।’ বিএনপি চেয়ারপারসন বড় পোকা হিসেবে ঠেকেছেন অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায়। কিন্তু সরকার যদি তাদের আমলে ওঠা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ডুরান্টের কথাকে অনেকে ঘুরিয়ে বলতে পারেন, ‘আইন হল মাকড়সার জালের মতো, যা বিরোধী পোকাদের আটকাতে পারে, কিন্তু ক্ষমতাসীন বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।’

আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক

almswapn45@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1180 বার