বিশ্বকাপ, তুরস্কের নির্বাচন এবং দেশে গণতন্ত্রের দুর্দশা

Pub: বৃহস্পতিবার, জুন ২৮, ২০১৮ ২:০৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জুন ২৮, ২০১৮ ২:০৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোহাম্মদ আবদুল গফুর :
পত্রিকার পাতা উল্টালেই উত্তেজনা। তা হবেই বা না কেন? এক সাথে এতগুলো বড় ঘটনা ঘটে চলেছে। প্রথমত বিশ্বকাপ। এটা নিয়ে তো সারা বিশ্বজুড়েই উত্তেজনা। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। কোথায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, অথচ আমাদের দেশে এ দু দল নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছে।
এরপর তুরস্কে চলছিল নির্বাচন। একই সাথে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। এক সময় তুরস্কের নাম উঠলেই মনের কোনে ভেসে উঠতো নব্য তুরস্কের জন্মদাতা মোস্তফা কামাল পাশার কথা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁকে নিয়ে রচনা করেছেন অমর পদাবলী :
ঐ খেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই
অশূরপুরে সুর উঠেছে জোরছে সামাল সামাল তাই
কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই
কামাল পাশা আগ্রাসী গ্রীসকে হারিয়ে সেদিন মুসলিম বিশ্বের
হিরো হয়ে উঠে ছিলেন। কিন্তু তারপর এক সময় মুসলমানদের বিষদৃষ্টিতে পড়ে যান তুরস্ককে ‘আধুনিক’ করার অভিযানে আরবীতে আজান দেয়া বন্ধ করাসহ বেশ কিছু অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠলে। তুরস্ককে আধুনিক (ইউরোপীয়) বানাতে গিয়ে তিনি নিজের অজান্তিতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনে আঘাত দিয়ে বসেন। এরপর শুরু হয় কামাল পাশার বিরোধী চিন্তাধারার উন্নয়ন। প্রথমে অনেকটা সংগোপনে। পরে প্রকাশ্যে প্রবলভাবে। বর্তমানে যারা তুরস্ক শাসন করছেন তারা কামালের চিন্তাধারার শুধু বিরোধীই নয়, পরপর দু’বার জনগণের অবাধ ভোটে বিজয়ী হয়ে এরদোগান ও তাঁর দল সারা মুসলিম বিশ্বের নজর কেড়েছে।
বিশ্বকাপ ও তুরস্কের নির্বাচনের পর এবার বাংলাদেশের কথা। বাংলাদেশ কাগজে-কলমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে এদেশে খুব কমই গণতন্ত্রের মর্মবাণী গুরুত্ব লাভ করে। এবং এ দু:খজনক অবস্থার সূচনা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আমল থেকেই, যখন গণতন্ত্রের মর্মবাণীকে পদদলিত করে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে শুধু একটি মাত্র সরকারী দল বাকী রেখে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়।
পরবর্তীকালে কিছু দু:খজনক ঘটনার মধ্যদিয়ে বহু দলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও এক পর্যায়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বসেন তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন সারা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে সেই সামরিক ক্যুর প্রতি সমর্থন দিয়ে বসেন দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এই অকল্পনীয় ঘটনার মুলে যে বাস্তবতা কাজ করে থাকতে পারে তা এই যে, ঐ নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে ছিল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। এর অর্থ দাঁড়ায় নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রধান প্রতিপক্ষের চাইতে একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাতকারী জেনারেলের শাসন শেখ হাসিনার কাছে অধিক সমর্থনযোগ্য মনে হয়েছিল। বলা বাহুল্য এটা শেখ হাসিনার গণতন্ত্র প্রীতির কোন প্রমাণ বহন করে না।
সংবাদপত্র পাঠক মহল জানেন, এরপর শুরু হয় জেনারেল এরশাদের সুদীর্ঘ স্বৈরশাসন। পাশাপাশি শুরু হয় বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের এরশাদবিরোধী আন্দোলন। আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে বেশ কিছু দিন এসব আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকলেও পরে এক পর্যায়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। কিন্তু ততদিনে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবাগতা বেগম খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে একমত হয়। নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ কর্তৃত্বাধীনে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে উভয় দল এ প্রশ্নেও একমত হয় যে, এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সুপ্রীম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে।
যেমনটা আশা করা গিয়েছিল, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়। দেশের সব চাইতে সুসংগঠিত ও প্রাচীনতম দল হিসাবে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে এ বিশ্বাস ছিল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার। নির্বাচন চলাকালে এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপচারিতা কালে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি সকল জেলার খবর নিয়েছি। নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন, ভোটে হেরে গিয়ে কেউ যেন আবার এর মধ্যে ‘কারচুপি’ আবিষ্কার না করে।
ভোট গণনা শেষে যখন জানা গেল আওয়ামী লীগ নয়, নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি, শেখ হাসিনা অবলীলাক্রমে বলে ফেললেন, নির্বাচনে সু² কারচুপি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কেউ তাঁর এই বক্তব্যের গুরুত্ব না দেয়ায় স্বাভাবিক নিয়ম মোতাবেক বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নতুন সরকার গঠন করলেন এবং শেখ হাসিনা হলেন সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী। খালেদা জিয়ার প্রধান মন্ত্রীত্বের মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচনের প্রশ্ন উঠলে প্রধানত বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সকল জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে সংবিধান সংশোধন করা হয়।
বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থাই যে গণতন্ত্রের নিরিখে সঠিক তা প্রমাণিত হয়। এই ব্যবস্থার অধীনে দেশে বেশ কতগুলো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে পালাক্রমে দেশের দুই প্রধান দল জয়ী হয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ লাভ করে। পরে এক পর্যায়ে কতিপয় রাজনীতিকের অতিরিক্ত ক্ষমতা ক্ষুধা এই সুন্দর ব্যবস্থাটিকে পচিয়ে ফেলে। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার শাসনকালে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের পরিবর্তে নির্বাচিত সরকারী দলের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। দুই প্রধান দলের অন্যতম বিএনপি এই ঘোষণাকে অতীতে দুই দলের মধ্যেকার সমঝোতার লংঘন অভিযোগ এনে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয়।
দেশের দুই প্রধান দলের একটি (বিএনপি) নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিলে সে নির্বাচন বাস্তবে পরিণত হয়ে পড়ে একটি নির্বাচনী প্রহসনে। বিরোধী দল তো দূরের কথা, সরকারী দলের অনেক নেতাকর্মীও ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার গরজ অনুভব করেননি। কারণ তারা জানতেন তারা না গেলেও দলের পক্ষ থেকে তাদের ভোটদানের ব্যবস্থা ঠিকই করা হবে। বাস্তবে হয়ও সেটাই। বিরোধী দলের অনুপস্থিতির সুযোগে আওয়ামী লীগের অল্পসংখ্যক নেতাকর্মী বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আওয়ামী দলীয় প্রার্থীদের ব্যালটপত্রে ইচ্ছামত সীল মেরে তাদের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ গ্রহণ করেন। এভাবে সরকারী দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রদত্ত ভোট অকল্পনীয়ভাবে বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ লাভ করেন সরকারী দলের স্বল্প সংখ্যক নেতাকর্মী যদিও ভোট দানের নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র ছিল প্রায় ফাঁকা, জনশূণ্য। পরদিন পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জনগণের কাছে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়ে পড়ে। একারণে ৫ জানুয়ারীর এই ভোটকে জনগণ নাম দেয় ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’। বর্তমানে দেশ চালাচ্ছে যারা, তারা এই ভোটারবিহীন নির্বাচনের ‘নির্বাচিত’ সরকার।
ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনার সুযোগ লাভ করলে সরকারী নেতাদের লজ্জিত বোধ করার কথা। কিন্তু বর্তমান সরকারের নেতৃবৃন্দের সেরকম বোধও আছে বলে মনে হয় না। বিরোধী দলের বর্জিত নির্বাচনে তারা বরং খুশী। জাতীয় সংসদে বক্তৃতা দান কালে যে বক্তব্য দেন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাতে তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় এক হিসাবে ভালই হয়েছে। সংসদে তাদের আবোল-তাবোল সমালোচনা শুনতে হচ্ছে না। অর্থাৎ সংসদে যেসব বিরোধী দলীয় সদস্য জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে বক্তব্য দেন, তাদের বক্তব্যকে তিনি আবোল-তাবোল সমালোচনা বলে মনে করেন। অথচ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের বক্তব্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অংশ। এটাকে যারা আবোল-তাবোল সমালোচনা বলে মনে করেন, তারা যে গণতন্ত্রে আদৌ বিশ্বাস করেন না, সে কথা নতুন করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
এওতো গেল যেসব আসনে নির্বাচনী মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে সে সবের কথা। জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের অধিকাংশ ১৫৩ আসনে তো কোন ভোটাই হয়নি। কারণ সেসব আসনে শাসক দলের প্রার্থী ছাড়া কোন প্রার্থীই ছিলনা। সেসব আসনে শাসকদলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়ে এদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায় যোগ করেন।
অথচ এমনটা সত্য নয় যে, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রে বা নির্বাচনে উৎসাহী নয়। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র ও অবাধ নির্বাচনে এতটাই উৎসাহী যে, সাধারণত নির্বাচনের দিন সকল কাজ ফেলে রেখে ভোরে প্রথম সুযোগেই ভোটের লাইনে দাঁড়াতে তারা অভ্যস্ত। তাছাড়া ইতিহাস প্রমাণ করে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান ইস্যুতে, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে, ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রশ্নে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তারা এদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পূর্বে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের স্বাধীন মতামত প্রদান করে এদেশের ইতিহাসের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বর্তমানে এসব দৃষ্টান্ত হারানো অতীতে পরিণত হয়েছে। কারণ যারা দেশ চালাচ্ছেন তারা চান না দেশ চালানোর প্রশ্নে জনগণ তাদের স্বাধীন মতামত দিয়ে তাদের ভুল সংশোধন করুক। দেশে সম্প্রতি কয়েকটি সির্টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে জনগণের স্বাধীন মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর সামান্যতম আন্তরিক প্রচেষ্টাও তারা চালাননি। খুলনা সির্টি নির্বাচন সম্পর্কে সরকারী সূত্রেই জানা গেছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। অথচ এই বছরের শেষ দিকেই দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা। সরকারের বর্তমান মনোভাব অব্যাহত থাকলে সাধারণ নির্বাচনও কতটা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1190 বার