কে হারলো এ নির্বাচনে?

Pub: শনিবার, জানুয়ারি ৫, ২০১৯ ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, জানুয়ারি ৫, ২০১৯ ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

৩০ ডিসেম্বরের ভোটে আওয়ামী লীগের যতটুকু না বিজয় হয়েছে, তার চেয়ে বড় পরাজয় হয়েছে নৈতিকতার। সেই নৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ অদুর ভবিষ্যতে আর ফিরে কিনা কে জানে? উন্নয়নের পক্ষে জনগণের রায় হয়েছে, এ আওয়াজ সর্বত্র। এটা অনস্বীকার্য, উন্নয়ন অবশ্যই লাগবে। কিন্তু গণতন্ত্রের ঘাটতি বাড়িয়ে উন্নয়নকে টেকসই করা কী সম্ভব?
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে খালেদা জিয়ার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। দলীয় সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন, ‘নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির নির্বাচনের ফলাফল পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছি।’
রবি ঠাকুরের ছোট গল্প ‘জীবিত ও মৃত’র একটি বিখ্যাত উক্তি ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে (আগের বারে) মরে নাই’, তেমন ঐক্যজোট তথা বিএনপিকে আওয়ামী সরকারের সাজানো নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেই প্রমাণ করতে হল, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু ও সুন্দর হতে পারে না। যে আশঙ্কায় বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেতে ভয় পেয়েছিল; কুল কিনারাহীন বিএনপির জন্য এবারকার নির্বাচনে তা আরো ভয়াবহ ‘সুনামি’ হয়ে ফিরে এলো! অর্থাৎ, ‘বিএনপি এবার মরিয়া প্রমাণ করিল ২০১৪ এর নির্বাচনেও মরিত’।
রাজনীতিতে দেশপ্রেমিক লড়াকু সৈনিক দরকার। সুবিধাবাদী কিছু লোকজন নিয়ে রাজনীতি চলে না। ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম ভোট বিপ্লব ও কেন্দ্র পাহারার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেন্দ্র পাহারা তো দুরের কথা ঢাকা শহরের কোনো কেন্দ্রের কাছাকাছি তাদের কোনো সমর্থককেও দেখা যায়নি। নির্বাচন কোনো যেনতেন খেলা নয়। দূরদর্শী কৌশল, অর্থ আর পেশিশক্তির খেলা। রাজনৈতিক চালে জটিল আর কুটিলতা থাকলেও বাহিরে থাকতে হয় নিখুঁত পরিকল্পনা, পরিপক্ব প্রদর্শন, সুনিপুণ আয়োজন। কিছুদিন ভিডিও বার্তা দেয়া ও ঘরের মধ্যে বসে লিখিত ভাষণ দিয়ে রাজনীতি চলে না। রাজনৈতিক চালে এক্ষেত্রে বিএনপি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে এখন গ্যারাকলে।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের আচার-আচরণ দেখে মনে হয়, আওয়ামী লীগের অনুগত সুবোধ বালক ওরা! কেউ বিএনপিকে কোলে বসিয়ে ভোট তাদের মুখে মুখে তুলে দিয়ে দেবে না। পৃথিবীর সব ভাষাতেই যে প্রবাদটি রয়েছে, ‘রোম যখন পুড়ছিলো, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো’। তেমনিভাবে সম্রাট নিরোর মতো বাংলাদেশের মানুষ যখন নিজেদের ভোট দেয়ার স্বাধীনতা হারায় বিএনপি তখনও নিষ্ক্রিয়!
ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের সারা দেশের ভোট পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, ‘স্বৈরাচারী এরশাদের আমলেও এ রকম নির্বাচন হয়নি। বিরোধী দলের এজেন্ট দূরের কথা, ভোটারদেরও কেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এটি দেখতে হবে, ভাবতেও কষ্ট হয়। সারাদেশে ক্ষমতাসীন দল ত্রাস সৃষ্টি করেছে, দেশের মালিকানা হাতছাড়া হয়ে গেছে।’
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন রেকর্ড করে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। এটাও ঠিক যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃতীয়বার জয়ের কারণে দায়িত্বও শতগুণ বেড়ে গেছে। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ তথা প্রধানমন্ত্রীকে এক কঠিন পরীক্ষা, দায়িত্ব এবং চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলো। এ গৌরব, বাহাদুরিকে সু-গৌরবের সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে নির্ভীকতা, সাহসিকতা, অকুতোভয়ের সাথে দেশ পরিচালনা করতে পারলে দেশে শান্তি বিরাজ করার সাথে অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে যাবে। টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা একটি দলের নেতাকর্মীর মধ্যে অহংকার, দাম্ভিকতা, হামবড়াই ভাব আসাটাই স্বাভাবিক। নেতাকর্মীরা জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারেন। অনেকেই মনে করতে পারেন ক্ষমতা মানে সব কিছু আওয়ামী লীগের দখলে থাকবে। এই মানসিকতা যেন কোনভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে। নেতাকর্মীদের উদ্যত আচরণ আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ যেমন অনেক ভালো কাজ করেছে, তেমনি অনেকগুলো বিষয়ে সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে। তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই এই সমালোচনার ইস্যুগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতের অনিয়মগুলো দূর করতে হবে। গুম, খুনের অভিযোগগুলোর ব্যাপারে সহিষ্ণুতার নীতিতে আসতে হবে। আওয়ামী লীগকে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হতে হবে। এমনকি নিজের দলের কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীকে সুশাসনের ব্যাপারে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে এ নিশ্চিয়তা দিতে হবে, অন্তত রাজনৈতিক সহিংসতায় মানুষ মরবে না, আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না। চাকরির পরীক্ষায় দলীয় পরিচয় চলবে না। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া, মহল্লায়, পাতি নেতা, বাতি নেতা, কেন্দ্রীয় নেতা পরিচয়ে দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজি চলবে না। দলীয় সুবিধাভোগী ও মৌ-লোভী নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী ও তার দলকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা বুঝতে দেরি করলে দলের ও দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আর না বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে যখন বুঝে আসবে তখন হয়তো কিছুই করার থাকবে না।
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ থেকে মুক্ত নয়। শুধু বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্ট নয়, গণমাধ্যম এবং সুশীল সমাজ নির্বাচনের স্বচ্ছ্বতা, ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আগামীতেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নির্বাচনের দোষগুলো খুঁজতে থাকবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীকে দেশের চলমান উন্নয়নধারাকে দুর্নীতিমুক্তভাবে এগিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ২৮৮ সিট নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালি হয়নি। সরকার হিসাবে শক্তিশালি হয়েছে মাত্র। আর এতে জিতেছে সরকার, হেরেছে বাংলাদেশ, পরাজিত হয়েছে জনগণ।
নৌকা এবং ধানের শীষের ভোটের পার্থক্য বিশ্বাসযোগ্য কী? ডিজিটাল যুগে মানুষেরতো চোখ, কান খোলা রয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও খাজানা যাদের হাতে ছিলো, পরাজয়ের ভয় কেন তাদের থাকবে? কেন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে ব্যর্থ তারা? সুষ্ঠু ভোট হলে কি এমন ক্ষতি হতো! দেশে আওয়ামী লীগ উন্নয়নমূলক যে কাজ করেছে, এবং এখনও যা অব্যাহত রয়েছে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ১৫০ থেকে ২০০ সিটে বিজয়ী হয়ে, বুক ফুলিয়ে যে গর্ব করতে পারতো এখন ২৮৮ আসন নিয়ে সে গর্ব করতে পারছে কী? বর্তমানের ফলাফলটি আওয়ামীলীগের জন্য গ্লানিকর নয় কী? ১০০ আসন অপজিশনের থাকলে রাজনীতি রাস্তা থেকে সংসদে চলে আসতো। তাতে দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নতির দিকে যেতো এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিজয়ের পিসফুল পসিবিলিটির পথ বের হতো নিশ্চয়ই।
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী দলটির জন্মলগ্ন থেকে ছোট বড় সব অর্জন ৩০শে ডিসেম্বরে আর কি বাকী থাকলো? প্রশ্ন ফাঁসে জিপিএ ৫ পাওয়ায় কী আনন্দ! এই জয়ে কোনো আনন্দ আছে কী? নিজেদের মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে কোনো জয়েই আনন্দ নেই। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বধানকারী দল আওয়ামী লীগ ছিল দেশের মানুষের ভরসাস্থল। অথচ কেন জানি মনে হচ্ছে, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ অন্ধকারের যুগে প্রবেশ করেছে!
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ভারত, নেপাল, সার্ক ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) নির্বাচনী পর্যবেক্ষকেরা। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ভোট শেষ হয়েছে। সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন ও ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের চেয়ে অনেকাংশে ভালো, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা সরকারি দলকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, ভোটারদের নয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলছেন, ‘ভোট নিয়ে তিনি তৃপ্ত-সন্তুষ্ট। ভোটে কোনো অনিয়ম হয়নি। ভোটে তারা লজ্জিত নন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে।’ এছাড়াও ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে’। সিইসির কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, কেন্দ্রে কেন ধানের শীষের কোনো এজেন্ট নেই? জবাবে সিইসি বলেন, ‘তারা (ধানের শীষের এজেন্ট) না এলে তিনি কী করতে পারেন?’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার যদিও বলেছেন, ‘ধানের শীষের এজেন্টরা কেন্দ্রে না আসলে কী করার? তারা কেন্দ্রে কেন আসেননি বা কেন কোনো এজেন্ট নেই, সেটা প্রার্থীর নির্ধারিত এজেন্টরাই বলতে পারবেন।’ দায়িত্বশীল পদে থেকে এই যুক্তি নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার কারা ছাড়া আর কিছু নয়।
শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া সরকার কি পরিমাণ জবাব দিহীতাহীনভাবে চলতে পারে এটা চিন্তা করা যায় না। একক ক্ষমতার বলে সরকারীদল সব কিছু ইচ্ছেমত করে যাবে যেটা গণতান্ত্রিক দেশে মোটেই হওয়া উচিৎ নয়। গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধীদল থাকা দরকার। দুর্বল বিরোধী দল গণতন্ত্রের বিকাশে বড় অন্তরায়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1108 বার