ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়

Pub: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভোট হয়ে গেছে প্রায় একমাস। কেমন ভোট হয়েছে তা দেশবাসী জানে। কাউকে নতুন করে কিছু বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই। যে দেশবাসী ভোট ডাকাতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী তাদের সামনে যতই ভাষণ দিয়ে সাফাই গাওয়া হোক যে, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ভোট হয়েছে তারা তা কখনো বিশ^াস করবে না। এরই মধ্যে যথারীতি নয়া এমপিদের শপথ হয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে এবং ৩০ জানুয়ারি নবগঠিত একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে। আগামী ৫ বছর ক্ষমতা পরিচালনার পুনরায় মালিকানা লাভ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী আছেন। ১০ বছর পূর্ণ করার পর তিনি আরো ৫ বছরের জন্য ক্ষমতা পেয়েছেন।
৩০ ডিসেম্বর সম্পন্ন নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা। নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ যেভাবে ভোট দিয়েছে, সেভাবেই ফল এসেছে। নতুন করে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। সিইসি বলেন, মূলত পুরো জাতি ৩০ ডিসেম্বর ভোট উৎসবের মাধ্যমে নতুন একটি সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের ২৯৯ আসনে ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ভোট চলাকালে সহিংসতা ও অনিয়মের কারণে ১৬টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। তিনটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ করায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ফল চূড়ান্ত করা যায়নি। বাকি ২৯৮টি আসনের ফলাফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ২৫৯টি আসনে। এছাড়া জাতীয় পার্টি ২০টি, বিএনপি পাঁচ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে। এর বাইরে গণফোরাম, বিকল্পধারা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) দুটি করে আসনে জয় পেয়েছে। একটি করে আসন পেয়েছে তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টি (জেপি)। তিনটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনের দিন আমি নিজের ভোট নিজে দিয়েছি। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিও দেখেছি। তাতে নৌকায় ভোট দিয়েছেন এমন লোক খুব কম পেয়েছি। প্রতিপক্ষের তথা ধানের শীষের কোনো এজেন্ট দেখিনাই। ইভিএম-এ প্রথম ভোট। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, যেহেতু ভোট কারচুপির এই ডিজিটাল বড়িটা জাতিকে নির্বাচন কমিশন গেলাতে চায় সেহেতু এই পরীক্ষামূলক ৬টি আসনে হয়তো কোনো অনিয়ম হবে না। কিন্তু পরে জানলাম আগের রাতে যেভাবে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতাসীনরা অর্ধেক ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরেছে ইভিএমএও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এটা কী করে সম্ভব হলো? এ যুগে কোনো খবরই গোপন থাকে না। তাই যেটা জানা গেল তা হলো, পূর্বরাতে একটি করে বিশেষ কোড ব্যবহার করে ইভিএম কেন্দ্রগুলোতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট নৌকা প্রতীকে দিয়ে রাখা হয়েছে। আর দিনের বেলায় জাতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুন্দর ভোটের মহড়া দেখানো হয়েছে।
আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখার ব্যাপারটা যে সারাদেশে সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে তা আর গোপন নেই। তারপরেও ভরসা পায়নি। তাই ভোটের দিনও সারাদেশে কেন্দ্র দখল করে সিল মেরে কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতা ডাকাতি করে দখল করে নেয়া হয়েছে। আর ভোটের আগে যেভাবে পাইকারি হারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়েছে তাও দেশবাসী জানে। ভোটের মাঠে যাতে প্রতিপক্ষের কেউ থাকতে না পারে তার পূর্বপরিকল্পনা নিয়েই কাজ করেছে মাঠপ্রশাসন। তাতে অংশীদার হয়েছে নির্বাচন কমিশন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে আড়াই শতাংশেরও কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি পরিহাসের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসন দখল করে একটি নতুন সরকার গঠন করেছিল। ঐ সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাসকদল ও তার জোটের প্রার্থীরা এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে জনগণের প্রতিরোধের মুখে এবং তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরীক দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করেছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক কোনো সংস্থাই বলতে গেলে এতে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি, একমাত্র ফেমা এবং আওয়ামী লীগের বশংবদ দু’একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া। ঐ নির্বাচনে সরকার ও তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে ভয়ভীতি এবং প্রলোভন দেখিয়েও ভোটারদের কাছে টানতে পারেনি। অনির্বাচিত এই সংসদ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তার তৃতীয় মাত্রার অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন। বিনা বাধায় তিনি এই সংসদ ও তার থেকে সৃষ্ট সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেন।
এর আগে ২০০৮, ২০০১, ১৯৯৬(৭ম) এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচন হয়েছিল নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে। সেসব নির্বাচনেও কিছু অভিযোগ উঠেছিল। তবে তা ছিল মাইনর। দেশে বিদেশে এই নির্বাচনগুলো প্রশংসা অর্জন করেছিল। যেসব দেশে গণতন্ত্র এবং ভোটব্যবস্থা উন্নত নয় তারা আমাদের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে মডেল হিসেবে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ২০১০ সালে আওয়ামীলীগ সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সে ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় সংবিধান সংশোধন করে। তার পরই হলো ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচন। অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে যে এদেশে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ হয়না তা আবারো প্রমাণ হলো।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে কার্যত আওয়ামীলীগ ছাড়া কোনো প্রতিদ্ব›দ্বী দলই ছিল না। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচিত করেছিল। ১৯৮২ সালে নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রক্ষমতা ডাকাতি করে নিয়েছিল এরশাদ। তারপর ১৯৮৬ সালে ভোট ডাকাতি আর ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। তারপর থেকে দেশে সর্বসম্মতভাবেই এসেছিল তত্তাবধায়ক সরকার। এটা ছিল গণতন্ত্রের নবযাত্রা। কিন্তু তা বাতিল করার কারণে কার্যত আমাদের জনগণের আর ভোটাধিকার নেই। ভোট দিয়ে জনগণ এখন আর তাদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় আনতে পারছে না।
পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ডাকাতির ভোটে আওয়ামীলীগ ও তার শরিকরা যতই আত্মতৃপ্তি পাক তাতে দলটির লাভ হয়নি। এই দলটি স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু জনগণের উপর দলটি কেন আস্থা হারিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল? সুষ্ঠু ভোট হলে এক টার্ম যদি দল ক্ষমতায় আসতে না পারতো তাহলে তার এমন কী ক্ষতি হতো? এতে দলের সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়েছে বলেই মনে করছে বোদ্ধা মহল। তাছাড়াও স্বাভাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে অস্বাভাবিক ব্যবস্থাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে সেই আশঙ্কাও মাথায় রাখতে হবে।
ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল যে হবে না সেটা আর এখন কারো বুঝতে অসুবিধা নেই। মূলত ভোট ব্যবস্থার প্রতিই মানুষের আর কোনো আস্থা নেই। অনেকের আশঙ্কা যে, এই টার্ম অর্থাৎ আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারলে ক্ষমতাসীনরা হয়তো বিএনপি তথা প্রধান বিরোধী দলকেই শেষ করে দেবে। ৫ বছর পরে হয়তো কোনো প্রতিদ্ব›দ্বী দলই থাকবে না। আবার ফাঁকামাঠে গোল হবে। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদী একদলীয় শাসন কায়েম হতে বোধহয় আর বাকি নেই।
প্রশ্ন হলো, তারপর কী? কোনো স্বৈরশাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনই স্থায়ী হয়নি। এটা প্রকৃতিরই নিয়ম। ক্ষমতার পালাবদল অবশ্যম্ভাবী। এই সরল সত্য সরকারও মনে রাখলে ক্ষমতাসীনরাই উপকৃত হবেন। তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করবেন না, এটাই কাম্য।
লেখক: সাংবাদিক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ