জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

Pub: শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৯ ২:৫০ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৯ ২:৫০ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অধ্যক্ষ মোঃ নাজমুল হুদা :
মানবসভ্যতা বিকাশের সর্বোচ্চ সোপান রাষ্ট্র। মানবসভ্যতা বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে পরিবার প্রথা ও গোত্রীয় প্রথার সিঁড়ি বেয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তায় পরিবারপ্রধানের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তেমনি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সমাজপতিদের দায়িত্বও কম নয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাধিক।

জনগণ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হলেও চাষাবাদ, শিল্পকারখানা, ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন প্রকার কর দিয়ে রাষ্ট্রকে সর্বাত্মক সহায়তা করে থাকে। মূলত জনগণপ্রদত্ত ট্যাক্সের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সে কারণে নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তার গুরুদায়িত্ব মূলত সরকারের। ফলে নাগরিকদের সর্বাত্মকভাবে রক্ষা করার দায়িত্বও সরকারের।

রাজধানী শহর ঢাকা জনবসতির দিক দিয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শহরগুলো মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। ঢাকা পৃথিবীর সর্বাধিক দূষিত শহরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রাচীন ও আধুনিকতার মিশেলে ঢাকা নগরী প্রায় পাঁচশত বছরের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যমণ্ডিত আমাদের এ গর্বের নগরীকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা ক্রমাগত বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি।

মোগল আমলে গড়ে উঠা পুরান ঢাকা সে যুগের যানবাহন চলাচলের আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল। তখনকার দিনে মানুষ বাহন হিসেবে ব্যক্তিগত ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, পালকি ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিশেষ ক্ষেত্রে হাতি ব্যবহার করা হতো। এ সব বাহনের চলাচলের জন্য প্রশস্ত সড়কের প্রয়োজন ছিল না। এ কারণে পুরান ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক সরু ও অপ্রশস্ত।

সময়ের আবর্তে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় আধুনিক যানবাহন আবিষ্কার হয়েছে। এই যানবাহন চলাচলের জন্য প্রশস্ত সড়কের বিকল্প নেই। বিশেষত পুরান ঢাকা ছোট কলকারখানায় ভরপুর। সেখানে বিভিন্ন রাসায়নিকের সংমিশ্রণে রঙ ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরি হয়ে থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী পণ্য হিসেবে এগুলোর চাহিদা ব্যাপক। এ কারণে ব্যবসায়িক লাভের আশায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন এলাকায় এ সব কারখানা গড়ে তুলেছে।

আমরা জানি, রাষ্ট্র জনগণের সর্বোচ্চ অভিভাবক। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো তার অধীনস্থ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও জানমালের সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, রোগাক্রান্ত ব্যক্তি সহজে শল্যচিকিৎসার আশ্রয় গ্রহণ করতে চান না। অথচ পরিবারের অভিভাবকেরা তার চিকিৎসার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করার সাধ্যমতো চেষ্টা করে থাকেন।

তেমনি কিছু ব্যক্তির সম্পদ ও সম্পত্তির ক্ষতি হলেও সরকারের কর্তব্য হচ্ছে, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুরান ঢাকার সব অবৈধ স্থাপনা দূরীভূত করা। অপ্রশস্ত সড়কগুলো প্রশস্ত করে যানবাহন চলাচলের উপযুক্ত করা; রাসায়নিক কারখানা অন্যত্র স্থানান্তর করা; রাসায়নিক পণ্যের মজুদ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলা; বিশেষত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার; সব বৃহৎ ভবনে আপৎকালীন গমনাগমনের জন্য একাধিক সিঁড়ির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

আধুনিক বিশ্বে অগ্নিনির্বাপক গাড়ির পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টারের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশে স্বল্পসংখ্যক অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টার আছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব বৃহৎ নগরী যথাÑ চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে অগ্নিনির্বাপক সংস্থায় হেলিকপ্টার সংযোজন করা উচিত। ঘনজনবসতি নাগরিক সুবিধার অন্যতম অন্তরায়।

ঢাকা শহরের জনবসতির ঘনত্ব কমানোর জন্য একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। রফতানিমুখী গার্মেন্ট শিল্পগুলো খুলনা ও চট্টগ্রামে স্থানান্তর করলে ঢাকা শহরের জনবসতি বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
মানুষের দেহের রক্তকে তার মুখমণ্ডলে সঞ্চিত করলে সে ব্যক্তিকে সুস্থ বলা যায় না। মানব দেহের সর্বত্র রক্তের সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকলেই সুস্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঢাকা শহর বাংলাদেশের মুখ। ঢাকা শহরের চেহারা দেখে পৃথিবীর সচেতন নাগরিকেরা বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা করে থাকেন। সে কারণে আমরা ঢাকা শহরকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। মূলত এ প্রক্রিয়ায় আমরা ঢাকা শহরকে অসুস্থ ও বসবাসের অযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলছি। বাংলাদেশে বর্তমানে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যার বেশির ভাগই ঢাকা শহরে অবস্থিত।

জনবহুল ঢাকা শহরে বর্তমানে পড়ালেখার পরিবেশ বিঘ্নিত। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, আবাসন সঙ্কটসহ নানাবিধ সমস্যায় ঢাকা শহর জর্জরিত। পড়ালেখার জন্য নিরিবিলি পরিবেশ আবশ্যক। আমরা জানি, কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার সুবিধার্থে শান্তি নিকেতনের নিরিবিলি পরিবেশে বৃক্ষ শোভিত স্থানে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

যে বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে ভাড়া বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে লেখাপড়ার মানের অবনতি ঘটাচ্ছি। বিষয়টি সরকারের বিশেষ বিবেচনায় এনে এ সব বিশ্ববিদ্যালয়কে জেলা শহরগুলোতে স্থানান্তর করে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখার ব্যবস্থা করতে পারে। ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ কমতে পারে।

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বাংলাদেশে ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার তালিকা প্রলম্বিত হচ্ছে। মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা শহরের অনেক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার বিবরণ আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে জানতে পারছি। ঢাকা শহরের বসতির ঘনত্ব হ্রাস করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার হার বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। মূলত জনগণের অভিভাবক হিসেবে অগ্নিকাণ্ড ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিষয়টি মানবতা ও জননিরাপত্তার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1039 বার