দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি কতটা অসুস্থ?

Pub: রবিবার, মার্চ ৩১, ২০১৯ ৪:০১ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, মার্চ ৩১, ২০১৯ ৪:০১ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আফসান চৌধুরী:

বাংলাদেশে রাজনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যে দেশটিকে একসময় অতিমাত্রায় রাজনৈতিক মনে করা হতো, সেখানে পরিস্থিতি ভীষণ বদলে গেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্র সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে গেছে এবং ভোটাররা খুব কমই ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মন্তব্য করেছেন যে, জনগণ যদি ভোটকে অবজ্ঞা করা অব্যাহত রাখে, তাহলে এর প্রয়োজনটা কমতে কমতে হয়তো শেষ হয়ে যাবে। সমস্যা হলো অনেকে যেমনটা ভেবেছিলেন যে, জনগণ এটাকে মিস করবে, সেটা তারা করছে না।

রাজনৈতিক ইস্যুর ব্যাপারে জনগণের ধারণা আর অ্যাক্টিভিস্টদের ধারণার মধ্যে ফারাক রয়েছে। অ্যাক্টিভিস্টরা রাজনীতিকে দেখেন সামাজিক ও রাজনৈতিক সেবার উর্ধ্বে যেখানে অর্থনীতির একটা সংযোগ রয়েছে, আর জনগণ চায় সামাজিক পণ্য আর সেবা। এই কিছুটা ভিন্ন মতের অর্থ হলো দুই পক্ষের উদ্দেশ্যের মধ্যেও তফাৎ রয়েছে।

বাংলাদেশের এই অবস্থাটা অবশ্য আলাদা কিছু নয়। সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এর মধ্যে ভারতও রয়েছে, যে ভারতকে অনেকেই উত্তর-ঔপনিবেশিক সরকারের মডেল এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার জননী হিসেবে বিবেচনা করতো।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং গুনগত মানের অবনতি

বাংলাদেশে রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় বৈচিত্রের সুযোগ কম। অন্যদিকে, ভারতের চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান বৈচিত্রকে দক্ষতার সাথে রক্ষা করা। পুরো দেশ জুড়েই তাদের এ বৈচিত্র রয়েছে, যেটা কার্যত অনেকটা কমনওয়েলথের মতো কাজ করে। এটা শুধু বৈচিত্র বা পার্থক্যের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক প্রাধান্যের তালিকাটা এখানে এতটাই আলাদা আলাদা যে, এখানে সবার জন্য সাম্যের যোগান দেয়াটা বাধাগ্রস্ত হয়। কেন্দ্রীয় একটি আকাঙ্ক্ষা এবং বহুজাতির বাস্তবতার মধ্যে যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ছিল, সেটা এখনও বজায় রয়েছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলো যেখানে ভারতের অর্থ কি – সেটা নিয়ে সঙ্ঘাতে লিপ্ত, সেখানে এই সঙ্ঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আসলে দরিদ্ররা, যাদের দুর্ভোগের পাল্লাটা অন্যান্য শ্রেণীর চেয়ে বেশি।

হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভারতে সবসময়ই ছিল এবং বিজেপির কারণে এটা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। কারণ এখানকার বিবদমান শক্তিগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নিজেদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ঔপনিবেশিক আমল থেকে যে দলটির কার্যক্রম চলে আসছে। এই দলটিকে এক সময় উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক শক্তি মনে করা হতো, যাদের মধ্যে পশ্চিমা বামপন্থী উদারনীতি বর্তমান রয়েছে। কিন্তু তারা শাসন ব্যবস্থায় ওয়েস্টমিনিস্টারের আদলে উত্তর-ঔপনিবেশিক সিস্টেম থেকে আধুনিকতাবাদকে কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এবং যেহেতু এই সিস্টেমে একটা বিচ্ছিন্ন অভিজাতবর্গ তৈরি হয়েছে এবং বাকিরা আলাদা হয়ে গেছে, তাই এই সিস্টেমটা কাজ করেনি। হিন্দুত্ববাদের মধ্যেও অন্যদের বর্জনের প্রবণতা রয়েছে কিন্তু তাদের শেকড়গুলোর সত্যিকারের অস্তিত্ব রয়েছে।

এক ভারতের ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি

সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার ভারত রাষ্ট্র এখন হিন্দুত্ববাদের ব্যাপারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা শুধু একটা স্ববিরোধী বৈপরিত্যই নয়, বরং আকাঙ্ক্ষার সাথে সামাজিক বাস্তবতার একটা সঙ্ঘাত চলছে এখানে। পশ্চিম বঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এর একটি ভাল উদাহরণ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে সরকার চালাচ্ছেন। তাকে বিজেপির গেরুয়া প্রতীকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি কংগ্রেসের প্রশিক্ষিত প্রতীকের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। এক সময় এই কংগ্রেস ছেড়েই নিজের দল গড়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে কংগ্রেস এখনও গান্ধী পরিবারের পারিবারিক নেতাদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

ভারতের রাজনীতি জোট, গ্রুপ আর গুচ্ছ দিয়ে ভর্তি, যেটা এক বিবেচনায় খানিকটা স্বাস্থ্যকর। কিন্তু আধুনিক ভারত এককভাবে কি চায় এটা স্পষ্ট করে বলাটা কঠিন, যেমনটা তারা রাজনৈতিক বহুত্ববাদের ব্যাপারে চেয়েছে। এটা কিছু অস্বস্তিকর যে একমাত্র যে ইস্যুটি পুরো ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে সেটা হলো পাকিস্তানের ব্যাপারে একটা অভিন্ন অপছন্দ। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিটা মিত্রের চেয়ে বেশি শত্রু-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

ওয়েস্টমিনিস্টারের রুগ্ন আকাঙ্ক্ষাগুলো

বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অগ্রগতির উদাহরণ এবং দুই দেশ তাদের জন্মকালীন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য একটা বড় ইস্যু ছিল এবং ওয়েস্টমিনিস্টার মডেলের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা ছিল এখানে, পাকিস্তানের অধীনে যে আকাঙ্ক্ষাটা ছিল স্বপ্নের মতো। সামরিক শাসন, ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য ছিল যথেষ্ট।

বাংলাদেশে যদিও পাকিস্তানের মতো উচ্চমাত্রায় রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রটা সঙ্কুচিত হয়নি। তবে নির্বাচন এবং খোদ রাজনীতির মানটা ঠিক আদর্শ জায়গাতে নেই বাংলাদেশের। কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্রের ব্যাপারে জনগণের অনীহা যেভাবে বাড়ছে তার অর্থ হলো যেখানে একসময় আশা ছিল, সেটা আর নেই। এর ফল হলো সেবা দান এবং অর্থনৈতিক অর্জনের জায়গায় আশা অনেক বেড়ে গেছে, যেটা পূরণ করতে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

যে দেশটি সাম্য ও বিভিন্ন জাত, বিশ্বাস, বর্ণ বা ভাষার ভিত্তিতে গঠিত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অর্জন করেছিল সেই ভারতও রাষ্ট্র হিসেবে পিছিয়ে পড়েছে। এরপরও ১৯৪৭ সালে ভারত যে সাম্যের নীতির উপর দাঁড়িয়েছিল, সম্ভবত সেটা এখন আর নেই। ভারতে দারিদ্র-বৈভবের যে পার্থক্য সেটার সাথে বাংলাদেশের চিত্রের পার্থক্যটা অনেক। কার্যত, বাংলাদেশ দরিদ্রদের অনেক ভালো সেবা দিতে পেরেছে।

এক বিবেচনায় পাকিস্তান নিরাপদ কারণ তারা কখনও সাম্য বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি বরং সবসময় সেনাবাহিনী এবং তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে, ঠিক জন্মের সময় দেশটি যেমন ছিল।

দক্ষিণ এশিয়া কি চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে?

দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশই জনগণের অংশগ্রহণ, সমতা এবং বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধার জায়গাতে নেই। এ কারণে জনগণের দাবি-দাওয়া বেড়ে গেছে এবং যে সব জায়গায় এই পার্থক্যটা বেশি, সেখানে চাপটা পড়ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর। দক্ষিণ এশিয়ার অভিজাত শ্রেণী সবার জন্য উপযুক্ত সমতার একটা অর্থনীতি উপহার দিতে পারবে কি-না, সেই প্রশ্নটা এখনও কম-বেশি রয়েই গেছে।

এ অঞ্চলের বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চীনের যে হিসেবী ক্ষুধা, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যে অসহায়ত্ব, সেটা কোন কল্পিত ভয় নয়, বরং বাস্তবতা এখানে অবশ্যম্ভাবী। চীন যেহেতু একই সাথে দক্ষ ও সংগঠিত, দক্ষিণ এশিয়ার হোচট খাওয়াটা তাই জারিই থাকবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ