আইনের শাসন বনাম প্রশাসনের একাধিপত্য

Pub: সোমবার, এপ্রিল ২৯, ২০১৯ ১:১৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, এপ্রিল ২৯, ২০১৯ ১:১৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৈমূর আলম খন্দকার :
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার প্রবণতা অনেক বেশি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে। কারণ, ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে কর্মচারীরা অর্থাৎ আমলারা সমুদয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের রাস্তা অনেক প্রশস্ত থাকে। কেননা ব্যক্তিশাসনে জবাবদিহিতার পথ দিনে দিনে সরু হতে থাকে বিধায় আমলা-কর্মচারীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে যা খুশি তাই করতে পারে। শুধুমাত্র উপরস্ত কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই তাদের পথে অন্য কোনো কাঁটা থাকে না। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত থানার বড় কর্তার নিকট নালিশ করে উপহাসের পাত্র হয়েছে। তিনি নিজেকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখার দায়িত্বের পরিবর্তে ভিডিও চিত্র ভাইরাল করে নূসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাকে ত্বরান্বিত করেছেন।
বিচার প্রক্রিয়া, বিচারকের স্বাধীনতা প্রভৃতি নিয়ে প্রতিনিয়তই অনেক কথা আওড়ানো হচ্ছে। বিচারকগণ সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে মামলার রায় প্রদান করেন একথাও বিচারপ্রার্থীগণ বিশ্বাস করে। বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি নিয়ে কথা বলার পূর্বে বিচারপতি এস. কে. সিনহার বিদায় বেলাটি পর্যালোচনা করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আজ কোথায়, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
ফেনী জেলাধীন সোনাগাজী উপজেলার ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নূসরাত জাহান রাফির প্রতি ওসি কর্তৃক যে উপহাস করা হয়েছে তা বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটি চিত্র মাত্র। নির্যাতিত বিচার প্রার্থীদের প্রতি এমনি ধরনের উপহাস প্রতিনিয়ত করা হয়। মিডিয়ার কারণে কোনটি প্রকাশ পায়, কোনটি প্রকাশ পায় না। মাদক ব্যবসায়ীদের সরকার পুলিশ দ্বারা ক্রসফায়ার করে। পুলিশের একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু তাদের (পুলিশ) ক্রসফায়ার করা হচ্ছে না (মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি কোনো কারণেই বিন্দুমাত্র সমর্থন তো দূরের কথা ন্যূনতম সহানুভূতি থাকাও পাপ হবে। শুধুমাত্র রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরার জন্য এ উপমা দেয়া হলো)।
সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের পুলিশ পিটানোর অনেক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দল পুলিশকে পিটালে তারা (পুলিশ) ব্যবস্থা নেয় না, বরং খুশি হয় বলে মনে হচ্ছে। এমনি একটি সংবাদ সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশ পেয়েছে, যার শিরোনাম ‘ওরা আ.লীগের, বিএনপি হইলে ব্যবস্থা নিতে পারতাম: আড়াইহাজার ওসি।’ পাঠকের সুবিদার্থে সংবাদটি তুলে ধরা হলো, ‘পুলিশ পিটিয়েছে আড়াইহাজার গোপালদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুজয় কুমার সাহা ও তার কর্মীরা। ১৭/৪/২০১৯ দুপুরের দিকে গোপালদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ঢুকে ৩ (তিন) পুলিশকে পিটিয়ে আহত করে তারা। তবে, এ ঘটনায় পুলিশ বেধড়ক মার খেলেও আড়াইহাজার থানা পুলিশের অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) মো. আক্তার হোসেন মোটেও ব্যথিত নন, বরং তিনি পক্ষ অবলম্বন করেছেন হামলাকারী ছাত্রলীগের পক্ষে। একই সাথে তিনি পুলিশ পেটানো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজের লোক বলেই মন্তব্য করেন। একই সাথে এ সক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।’
পুলিশ একটি দীর্ঘদিনের পুরাতন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সকল আইন তাদের দ্বারা কার্যকর হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন পুলিশ বিভাগ থেকে ডেপুটেশনে অনেক জনবল এনেছে দুর্নীতির মামলা তদন্ত করার জন্য। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগই সবচেয়ে বেশি। সব সরকারই পুলিশকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান সরকার একেবারেই পুলিশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কারণ, একতরফা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য পুলিশই ছিল সবচেয়ে বড় নিয়ামক শক্তি। এর পরিসম্পত্তি করতে চাইলেও করা যায় না। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি সকলই এখন আমলানির্ভর। জনপ্রতিনিধিদেরও পুলিশ এখন বুড়ো আঙ্গুল দেখায়। যুক্তি সংগত কারণ রয়েছে। পুলিশ জানে, জনপ্রতিনিধি পুলিশ বানিয়েছে এবং এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় জনপ্রতিনিধিদের হেকমতে কুলাবে না। ফলে জনগণের স্বার্থে যারা সোচ্চার হওয়ার কথা তারাও আমলা ও পুলিশের নিকট জিম্মি। আমলা ও পুলিশের শক্তি এমনিভাবে প্রকাশ পেয়েছে যার নিকট গোটা সমাজ ব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে। ট্রেডিশনালি আমলা ও পুলিশের পোস্টিং প্রমোশন রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়, যার প্রকোপ এখন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকুরির মেয়াদ শেষ হলেও অতি অনুগত আমলাদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে নিয়মিত প্রমোশনের দরজা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যাদের আত্মীয়-স্বজন সরকারি দল করে না, যোগ্যতা থাকা স্বত্তে¡ও ভালো পোস্টিং এবং প্রমোশনের ফিট লিস্টে তাদের নাম উঠে না।
দীর্ঘদিন পরে হলেও বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার সংবাদ জাতির জন্য একটি সুখবর। সর্বোচ্চ বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ না হলে সম্পদশালীদের স্বার্থরক্ষার এ ভবনটি ভাঙ্গা সম্ভব হতো না। অর্থশালীরা মনে করে অর্থের মাধ্যমে সকলকেই বশীভূত করা যায়। কিন্তু বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার সংবাদ ঐ ধরনের মানসিকতার উপর একটি চপেটাঘাত। বিশাল দ্বৈত্যকার বিজিএমইএ ভবনটি অবৈধ পন্থায় কীভাবে হাতিরঝিল এলাকায় গড়ে উঠলো তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা আবশ্যক। তাতে জনগণ জানতে পারতো উপর তলার লোকদের হাত কতটুকু লম্বা(!)। উপর তলার লোকদের খাই খাই স্বভাবের কারণে গোটা দেশের ৬৫%-৭০% সম্পদ তাদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গরিব দিন দিন আরো নিঃস্ব হচ্ছে। ব্যাংকলুটেরা ও ভ‚মিদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা অর্থনীতি। ব্যাংকের অর্থ তারাই ভিন্ন ভিন্ন নামে আত্মসাৎ করছে যারা পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য। কৃষকদের নিকট থেকে জমি ক্রয় না করেই ড্রেজার দিয়ে ভরাট করে ফেলছে ফসলী জমি। অথচ ফসলী জমি যত্রতত্র ব্যবহার না করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৮ক মোতাবেক পরিবেশকে সুরক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। অথচ সরকার বা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো প্রকার অনুমতি ব্যতীত ভ‚মিদস্যুরা ঢাকার আশে পাশে বিশেষ করে রাজউকের পূর্বাচল এলাকায় (রূপগঞ্জ উপজেলা) সংলগ্ন খাল, বিল, পুকুর, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান প্রভৃতি ড্রেজার পাইপ সংযোগ করে বালু দ্বারা ভরাট করে ফেলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসন এগুলি দেখেও দেখছে না। কারণ আবাসন প্রকল্প করার জন্য ন্যায্যমূল্য দিয়ে কৃষকের জমি ক্রয় করার প্রয়োজন হয় না, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ক্রয় করলেই হয়।
বিচার বিভাগের সংস্কার বিচার প্রার্থী গণমানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রশাসন-আমলাদের অযাচিত কার্যকলাপ অনুভব করেও প্রতিকার করে না বা করতে পারে না। তারাও মনমানসিকতার দিক থেকে কোথায় অবস্থান করার কথা তাও উপলব্ধি করা দরকার। বিচারপতি এস. কে. সিনহার উত্থান ও পতনের বিষয়টি পর্যালোচনা করলেও সব কিছু বুঝে নেয়া যায়। সম্প্রতি শিশু ও মহিলাদের জবানবন্দী মহিলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা লিপিবদ্ধ করার সুপ্রিমকোর্টের আদেশ প্রদান নিশ্চয় বিচার বিভাগের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, এ ধরনের পদক্ষেপ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি বিচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রসিকিউশন তথা পুলিশ, র‌্যাব, দুদক প্রভৃতির উপর একক নির্ভরশীলতা ন্যায় বিচারের অন্তরায় বিধায় এ নির্ভরশীলতা থেকে বের হওয়ার উদ্যেগ বিচার বিভাগ থেকে নেয়া উচিৎ বলে জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট ও আইনজীবী


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1064 বার