উন্নয়নের রোলমডেল এবং তারুণ্যের মরণযাত্রা

Pub: বুধবার, মে ১৫, ২০১৯ ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, মে ১৫, ২০১৯ ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জামালউদ্দিন বারী :
মুক্তবাজার অর্থনীতি ও জনবহুল উন্নয়শীল রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান মানদন্ড হচ্ছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। গত একদশক ধরে সরকার এবং সরকারদলীয় রাজনীতিকরা অনবরত উন্নয়নের বুলি কপচালেও এসব ক্ষেত্রে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে দেশ। দেশের তরুণ সমাজ ক্রমশ আরো হতাশ হয়ে নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অথবা মাদকাসক্তি ও অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ না থাকায় তারা একদিকে সক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতেও অনীহ হয়ে পড়েছে। যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার মূল শক্তি ও সম্পদ হচ্ছে দেশের যুব সমাজ। শিক্ষিত মেধাবী যুবকরা সমাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখালেই জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তীতা, এবং জাতীয় ঐক্য ও সহাবস্থানের সুষ্ঠু পরিবেশ থাকতে হবে। আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এমন পরিবেশ নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের তরুণ সমাজ ক্রমেই রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়ছে। দেশের যুব সমাজ শুধু দেশের রাজনীতি সম্পর্কেই অনাগ্রহী হচ্ছে না, বহু সংখ্যক শিক্ষিত-অশিক্ষিত তরুণরা যেনতেন প্রকারে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে বৈধ-অবৈধ নানা রকম ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতারা জাতিকে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাবে, এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগাবে, এটাই প্রত্যাশিত। নানামুখী সংকট ও প্রতিবন্ধকতা সত্বেও আমাদের সরকার এবং সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতারা যে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছেন, জাতির এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, তা সে অর্থে ইতিবাচকই বলতে হবে। তবে অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। আমাদের জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে বৈষম্য, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা ও আত্মাঘাতী প্রবণতা তৈরী হয়েছে তা দূর করে আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ না নিলে ও শুধু পরিসংখ্যানগত জিডিপি ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি দিয়ে জাতিকে উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, গুম-খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, অপঘাত মুত্যু ও যুব সমাজের দেশ ছাড়ার প্রবণতা ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি আরেকটির সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। রাজনৈতিক সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা থাকলে অন্য সব সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা এমনিতেই কমে আসতে পারে। প্রকৃত সমস্যা আড়াল করে উন্নয়নের গলাবাজি দিয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে দেশকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

নির্বাচন যেমনই হোক, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম অবক্ষয়ের মধ্যেও বাংলাদেশে এখন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম নেই। এক দশকের বেশী সময় ধরে দেশে পরপর তিন দফায় একই রাজনৈতিক জোট নির্বিঘ্নে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকার কারনে দেশে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন হতে পারত তা আদৌ হয়েছে কি না তা এখন বিতর্কিত বিষয়। তবে এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই দেশের দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশের স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও এসব শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে একটি যুগোপুযোগী শিক্ষানীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ কোনো সরকারই গ্রহণ করেনি। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ভাল-মন্দ, ভুলভ্রান্তির বিচারে না গেলেও সে অর্থে সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। শিক্ষার জাতীয় লক্ষ্য একটি মৌলিক বিষয়। এই জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ ও সঠিকভাবে বাস্তবায়নের উপরই জাতির প্রকৃত উন্নন-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। শিক্ষানীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রায় এক দশক পর তার সাফল্য-ব্যর্থতা ও ভুলভ্রান্তি যাচাই বা মূল্যায়ণ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে বুঝা যাচ্ছে, আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় জাতীয় শিক্ষানীতির কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, ব্যক্তি তার ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখবে। তবে গত এক দশকের মূল্যায়ণে বলা যায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা তরুণদের বড় অংশই তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। শিক্ষাব্যবস্থা যেন শিক্ষিত বেকার তৈরীর কারখানায় পরিনত হয়েছে। সার্টিফিকেটধারী উচ্চ শিক্ষিত তরুনদের বড় অংশকেই তার পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা বা পরনির্ভরশীলতা যেন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থার জন্য কতটা শিক্ষা ব্যবস্থা আর কতটা সরকারের সদিচ্ছা ও দক্ষতা দায়ী তাও যথাযথ মূল্যায়ণের দাবী রাখে। সরকারী চাকুরীতে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার বদলে সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলীয়করণ, নিয়োগবাণিজ্য, কোটাপ্রথা ইত্যাদি কারণে প্রশাসনিক কর্মকান্ডে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়না। একদিকে সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে লাখ লাখ পদ খালি থাকলেও একেকটি পদের বিপরীতে শত শত চাকুরী প্রার্থীর হুমড়ি খেয়ে পড়া অবস্থা থেকেই আঁচ করা যায়, দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের অবস্থা কতটা প্রকট। সিভিল সার্ভিসের ২ হাজার শুন্য পদের জন্য ৪-৫লাখ উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর অস্বাভাবিক প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই তা আঁচ করা যায়। প্রথমত শিক্ষাজীবনেই নানা রকম অনৈতিক বাণিজ্য, মুনাফাবাজি ও অনৈতিক প্রতিযোগীতার সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তথাকধিত নামিদামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি বাণিজ্য, অস্বাভাবিক টিউশন ফি, সেশন ফি, কোচিং বাণিজ্য, নোটবই-গাইডবই, শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনী ইত্যাকার সব খরচের বোঝা পেরিয়ে একেকজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের পর সরকারী বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের চাকুরী সোনার হরিণের মত দুস্প্রাপ্য হয়ে উঠে তখন তাদের মধ্যে হতাশা ভর করে। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া জীবন বেছে নেয়। কেউ বেকারত্বের অভিশাপ ঘুচাতে ও পারিবারিক স্বপ্ন পুরণ করতে যেনতেন প্রকারে অবৈধ উপায়ে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিমাসে হাজার হাজার শ্রমিক ফেরত আসছে। বিশেষত: গৃহশ্রমিক হিসেবে কর্মরত নারী শ্রমিকরা অমানবিক নিগ্রহের শিকার হয়ে দেশে ফেরার যে সব কাহিনী শোনা যায় তা জাতি হিসেবে আমাদের আত্মমর্যাদার উপর বড় ধরনের আঘাত।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংকট সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশগুলোর নাগরিকরা প্রাণে বাঁচতে পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও ফিলিস্তিনের মানুষ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, বৈধপথে ইউরোপে আশ্রয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যারা অবৈধ উপায়ে বিপদসঙ্কুল সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের জন্য পাড়ি জমাচ্ছে তাদের এক উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এখানকার সম্ভাবনাময় তরুণরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশত্যাগ করছে কেন? এই প্রশ্নের মধ্যেই বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে। দৃশ্যত বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকলেও প্রিয় স্বদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন লালন করে বড় হওয়া তরুনরা পিতা-মাতা ও স্বজনদের ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর এই বাস্তবতা কোনো উন্নয়নের মোড়কে ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। ভ’মধ্যসাগরে অবৈধ অভিবাসি বোঝাই নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে একেকটি মর্মন্তুদ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, সেখানে ভিকটিমের তালিকায় যুদ্ধ কবলিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশী নাগরিকদের নাম উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার পাওয়া এসব ঘটনার পর বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়। এ সপ্তাহে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইতালীতে পাড়ি জমানো একটি নৌকা তিউনিসিয়া উপকুলে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সমুদ্রে ডুবে যাওয়াঅভিবাসন প্রত্যাশি অর্ধশতাধিক মানুষের মধ্যে অন্তত ৩৭জন বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন। অন্তত ১৫জন বাংলাদেশী যুবক জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। যাদের মুখচ্ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ভ’মধ্য সাগরে নৌকাডুবির পর ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া সিলেটের বিল্লাল হোসেন তিউনিসিয়ার জর্জিসে রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয় কেন্দ্রে ভয়াল সমুদ্রের অভিজ্ঞতার বর্ননা দিয়েছেন। আধুনিক ফ্যাশন সচেতন তরুন বিল্লালের ছবি এএফপির সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।যে তরুণদের উন্নয়নশীল বাংলাদেশে উন্নত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবার ও দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ণ করার কথা, সে সব তরুণদের অনেকেই কিছুতেই যেন দেশে থাকতে চাইছে না। বাংলাদেশী তরুনদের ভাগ্য বিপর্যয়ের এমন কাতর বর্ননা এবারই প্রথম নয়। গত এক দশক ধরে প্রায় প্রতি বছরই ভ’মধ্যসাগরে এমন বিপজ্জনক যাত্রায় মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে। গত বছর স্পেনের উপকুলে চারশতাধিক অবৈধ অভিবাসির মধ্যে লিবিয়া, তিউনিসিয়া,সিরিয়া, ইয়েমেন ও নাইজেরিয়ার নাগরিকদের পাশে বাংলাদেশী নাগরিকদের সংবাদও উঠে এসেছিল। এর আগে সম্ভবত ২০১৬ সালে, ইউরোপের একটি স্থল সীমান্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসন প্রত্যাশী কয়েকশ মানুষের একটি কনভয় নিরাপত্তা রক্ষিরা আটকে দিয়েছিল। সে সময় বেশকিছু বাংলাদেশী তরুন বুকে প্লাকার্ড সাঁটিয়ে তাদেরকে দেশে প্রত্যাবাসনের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।একটি প্লার্কাডে লেখা ছিল, আমাদের দেশে ফেরত পাঠানোর চেয়ে বুকে গুলি কর। এই ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা এই মরণযাত্রার সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ খতিয়ে দেখে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল তা হয়নি বলেই অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভাগ্যান্বেষণে জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করা এসব তরুনের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান এবং সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে হবে। উন্নত জীবনের আশায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দেশ ত্যাগের এই বাস্তবতা বদলানোর দায় আমাদের সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধকবলিত, খরা-দুর্ভিক্ষপীড়িত বা ভেনেজুয়েলার মত অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত দেশ নয়। আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশকে বিশ্বের জন্য উন্নয়নের রোল মডেল বলে দাবী করছেন। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন(আইওএম) বিশ্বের অবৈধ অভিবাসনের তালিকার বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ৮ নম্বরে অবস্থান করছে। যে দেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হওয়ার দাবী রাখে, সে দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুন অবৈধ অভিবাসি হওয়ার অপরাধে বিশ্বের নানা দেশের জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে ! মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর এই বাস্তবতা বাংলাদেশ সম্পর্কে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এশিয়া-আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিকরাও ইউরোপ আমেরিকায় অভিবাসি হওয়ার জন্য লাইন দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের তরুণরা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিদ্ধস্ত লিবিয়া, সিরিয়ার মত দেশেও অবৈধ অভিবাসি হতে পিছপা হচ্ছে না। গত মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানা যায়, দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে বেশকিছু অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসি নিরাপত্তারক্ষিদের হাতে আটক হয়েছে। ভানুয়াতু ডেইলি পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এসব বাংলাদেশী তরুনরা নিজেদের দাসত্বের শিকার অভিবাসি শ্রমিক বলে দাবী করেছে। ন্যায় বিচার এবং চাকুরী দিয়ে তাদের পরিবারকে রক্ষার আবেদন করেছেন তাদের হাতে ধরা প্লাকার্ডে। বিশ্বের যেখানে অবৈধ অভিবাসন সংকট সেখানেই বাংলাদেশীদের নাম উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে। একবিংশ শতকের উন্নয়নশীল বাংলাদেশের সামনে এটি একটি বড় ধরনের ইমেজ সংকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। যে দেশের তরুণরা ব্যাপক হারে দেশ ছাড়তে চায়, দেশে বেকার থাকার চেয়ে বিদেশে শ্রমদাস হওয়াকেই শ্রেয় মনে করে, সে দেশের উন্নয়নের ঢোল ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দাবী বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দেশের ধনীরা বিনিয়োগের পুুঁজি বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। শিক্ষার জন্য সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা জমি-জিরাত বিক্রি করে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, সে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গুম-খুন ধর্ষণ, সামাজিক অবক্ষয়, নিরাপত্তাহীনতা, লুটপাট, দেশত্যাগ ও টাকা পাচারের চলমান বাস্তবতার শিকড় আমাদের গণতন্ত্রহীনতা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের গভীরে প্রোথিত আছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কার এবং শিক্ষাব্যবস্থার সময়োপযোগী পরিবর্তন ছাড়া এ থেকে মুক্তির আর কোনো পথ নেই। এ প্রসঙ্গে, আমাদের সরকার এবং রাজনৈতিক পক্ষকে ক্ষীন দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে বৃহত্তর জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সুদূর ভবিষ্যতের লক্ষ্যাভিসারী সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1141 বার