fbpx
 

মাদক কারবারির ডাইরি এবং জিরো টলারেন্স

Pub: Saturday, July 27, 2019 1:55 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৈমূর আলম খন্দকার :
খুন, গুম, রাহাজানি, ক্রসফায়ার, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণপিটুনিতে হত্যা, গুজব, শিশুহত্যা, বিচার চলার সময় এজলাসে খুন প্রভৃতি অপরাধ যখন পাল্লা দিয়ে দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার চেয়ে অধিক মাত্রায় চক্রবৃদ্ধি সুদের মতো দেশে মাদক বিস্তার লাভ করেছে। বস্তিবাসী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিবারেও মাদক অনুপ্রবেশ করেছে। অতিমাত্রায় ‘লাভজনক’ বিধায় বিত্তশালীরা বা তাদের পরিবারের সন্তানেরাও মাদক কারবারে জড়িত হয়ে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণা দিয়েছেন। র‌্যাব, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত মাদক কারবারিদের ফায়ার করছে অথচ প্রচার করা হয় যে, ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তবে কথা হলো, দেশবাসী মাদকমুক্ত একটি সমাজ দেখতে চায়। এদিকে, সরকার জোর গলায়ই সুশাসনের কথা বলছে। মিডিয়ার ভাষ্যমতে, মাদকের অভিযোগেই সাবেক সংসদ সদস্য বদিকে (কক্সবাজার) আবার মনোনয়ন প্রদান থেকে বাদ দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলেও একই আসনে বদির স্ত্রীকে নমিনেশন দিয়ে সরকার সুশাসনকে নগ্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আগে থেকেই মাদক কারবার বিস্তার লাভের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক স্থানে মাদক কারবারি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হাতেনাতে ধরা পড়ে জেলহাজতে রয়েছে। এমনকি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছেন। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অনেক স্থানে মাসোয়ারা পায় বলেই মাদক কারবার কমছে না; বরং জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ তখনই ‘জিরো’ হয়ে যায় যখন ‘সরিষার মধ্যে ভূত’ থাকে।

১৭ জুলাই পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ‘নারায়ণগঞ্জ শহরের চাঁদমারী এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি বিপ্লব (৩১) ডিবির সাথে গোলাগুলিতে পড়ে নিহত হয়েছে। সে জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। তাকে ধরিয়ে দিতে জেলাপুলিশের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৬ জুলাই মঙ্গলবার শেষরাত ৩টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে চাঁদমারী এলাকায় ওই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর সেখান থেকে বিপ্লবের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় আটক ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ ময়না খাতুনের কাছ থেকে একটি নোটবুক উদ্ধার করা হয়, যাতে একাধিক স্থানে বিপ্লবের নামের উল্লেখ ছিল। একটি ছেঁড়া নোটবুকের কয়েকটি পাতায় লেখা বাংলা নামের বানানে ভুল ছিল। তবে টাকার অঙ্কে কোনো ভুল ছিল না। ওই নোটবুকে লেখা ছিল ‘আবগারি’ পুলিশ ছয় হাজার টাকা, টিপু পাঁচ হাজার টাকা, ফাঁড়ি পুলিশ তিন হাজার ৩০০ টাকা, ফাঁড়ি কালাম দুই হাজার টাকা, টহলের দারোগা এক হাজার টাকা, কামরুলের ফরমা (অর্থাৎ সোর্স) ৫০০ টাকা, বিপ্লব পাঁচ হাজার টাকা, টহল পুলিশ ৫০০, করিম পুলিশ ২০০, সাইফুল পুলিশ ১০০, সাংবাদিক ২০০ টাকা, বিপ্লব এক হাজার টাকা, আক্তার দুই হাজার টাকাসহ বেশ কয়েকজনের নাম ও পরিমাণ। একই নামের তালিকার পাশে বসানো টাকার সংখ্যা ঠিক থাকলেও ঠিক ছিল না দিন তারিখ। তবে একই নামের তালিকা ছিল বিভিন্ন মাসের হিসাবে যাদের প্রতি মাসেই মাদক বিক্রি বাবদ কমিশন বা বখরা দেয়া হতো।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রায়ই বলা হয়ে আসছিল, ‘আদালত জামিন দেয় বলেই দেশকে মাদক মুক্ত করা যাচ্ছে না।’ দৃশ্যত আদালত মাদক মামলায় কঠিন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন। তবে দুই বছরেও যদি মামলার বিচার শুরু না হয়, কোন আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে রাখা যাবে?
সম্প্রতি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে একটি সংবাদ প্রদর্শিত হয়েছে যে, ময়মনসিংহ এলাকায় মাদক দিয়ে ফাঁসানোর সময় হাতেনাতে এক ষড়যন্ত্রকারী ধরা পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক দিয়ে অনেক জায়গায় নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে টাকা আদায়ের অনেক খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার প্রকাশ পেয়েছে, যারা পুলিশের সোর্স তারাই পুলিশের প্রটেকশনে মাদক কারবার করে, যার একটি বড় অংশ পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকের পকেটে যায়। মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে একই মামলায় নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ১০ জন পুলিশ আটক রয়েছে; যে মামলা থেকে ওসি কামরুলকে বাদ দেয়ায় হাইকোর্ট অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

সরকারপ্রধান মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু যাদের দিয়ে ভূত তাড়াবেন সেখানেই যদি ভূত থাকে তবে জিরো টলারেন্স সফল হবে কিভাবে? একজন ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’র ডাইরির পাতা থেকে যে সব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে তার সূত্র ধরেই যদি এগোনো যায়, দেখা যাবে যে, মাদকের চালান ছাড়াও রুট লেভেল কারবার থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকেই মাসোয়ারা পেয়ে থাকে। ডাইরির পাতায় মাসোয়ারা দেয়ার তালিকা মাসে মাসে লেখা হয়েছে, তারই একটি ছবি পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে। ফলে এ সূত্র ধরে অগ্রসর হলে মাদক নেটওয়ার্কের অনেক তথ্য সরকারের ভাণ্ডারে জমা হতে পারে। ডাইরির পাতার ছবি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তা জব্দ করেছেন কিনা, জানা যায়নি। ক্রসফায়ারে নিহত মাদক কারবারি মরে গিয়ে বেঁচে গেছে, কিন্তু ডাইরির পাতায় যে স্বাক্ষর রয়ে গেছে, মাদক কারবার রোধে তা সহায়ক হতে পারে, যদি সরকারের সংশ্লিষ্ট এজেন্সি অবিলম্বে তৎপর হয়।

ডাইরির মাসোয়ারার যে তালিকা, সে অনুযায়ী মাসোয়ারা গ্রহীতাদের বিষয়টি যাচাই হওয়া আবশ্যক। ডাইরির ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাসোয়ারা দিয়েই মাদক কারবার পরিচালিত হতো। মাদক কারবারি বিপ্লবকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য যে পুলিশ ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, সে পুলিশকে মাসিক ভাতা দিয়েই (ডাইরির ভাষ্যমতে) মাদক কারবার নির্বিঘেœ পরিচালিত হতো এবং একেই বলে ‘বেড়ায় ক্ষেত খায়’।

ভুল বানান সম্মলিত ডাইরির ভাষ্য একজন টোকাই মাদক কারবারির। তবে সত্যই যদি এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের সদিচ্ছা সরকারের থাকে, তবে মাদক নেটওয়ার্কের চিত্র পরিষ্কার হওয়ার জন্য ডাইরির হিসাবটি একটা মাইলফলক হতে পারে। পুলিশ যদি নিজেদের বাঁচানোর জন্য ডাইরিটির গুরুত্ব না দেয়, তবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভবিষ্যতে নাও পাওয়া যেতে পারে। কারণ ডাইরিটি প্রকাশ পাওয়ায় অন্য মাদক কারবারিরা নিশ্চয় লিখিতভাবে আর কোনো মাসোয়ারা দেবে না।
সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রক অধিদফতর রয়েছে। এর কার্যক্রম অতি ধীরগতিসম্পন্ন। তাদের জনবল নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক কারবারি গ্রেফতার করা ছাড়াও মাদকের রুট খুঁজে বের করা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ রুট বন্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো সফলতা দৃশ্যমান নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক চুক্তিভিত্তিক খুন এবং মাদক কারবারে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, একটি পক্ষের অর্থের বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে মাদক ধরিয়ে দিয়ে মাদক মামলায় চালান দেয়া হয়েছে। এটা যেন কারো কারো Right of Prerogative। এসব কারণেও মাদক নিয়ন্ত্রণে বাহিনীগুলো জনগণের আস্থার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যেকোনো পদ্ধতিতে দেশ মাদকমুক্ত হতে হবে, এটাই জাতির একান্ত প্রত্যাশা।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
চেয়ারম্যান, গণতন্ত্র ও বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি আইনজীবী অন্দোলন
[email protected]


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ