চায়না কার্ড : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

Pub: Monday, October 12, 2020 11:10 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবু রূশদ
১৯৭২ সালের ২৬ আগস্ট নিউ ইয়র্ক টাইমসে ‘চায়নাস ফার্স্ট ইউ এন ভেটো বারস বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। রবার্ট আলডেনগের ওই প্রতিবেদনে ২৫ আগস্ট জাতিঙ্ঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের বিরুদ্ধে চীন যে ভেটো দিয়েছিল তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, সোভিয়েত রাশিয়া ও ভারতের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণাত্মক মন্তব্য উপস্থাপনের পর বাংলাদেশ যাতে জাতিসঙ্ঘে সদস্য পদ না পায় সে জন্য চীন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেয়। জাতিসঙ্ঘে চীনের প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, ‘সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ দক্ষিণ এশিয়ায় গভীরভাবে হস্তক্ষেপ করেছে যেখানে ভারত তার নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষতা থেকে সরে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সামরিক জোট তৈরি করেছে। চীনা প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, ‘সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের’ মূল উদ্দেশ্য হলো- ভারত ও বাংলাদেশে নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানকে ‘যখন খুশি ইচ্ছামতো’ নাস্তানাবুদ করা। সোভিয়েত ইউনিয়নের এ পদক্ষেপকে চীন ‘মুখে মধু অন্তরে বিষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। হুয়াং হুয়া জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির আবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া দু’টি প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়ন করেনি। ওই দু’টি প্রস্তাবে আহ্বান জানানো হয়, ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান ও ভারতের যেসব সেনা ও বেসামরিক নাগরিক যুদ্ধবন্দী হয়েছে তাদের ফেরত দেয়া হবে নিজ নিজ দেশে এবং বাংলাদেশের মাটি থেকে সব বিদেশী সেনা প্রত্যাহার করা হবে। চীন সাফ জানিয়ে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না ওই দু’টি শর্ত মানা হচ্ছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশী সেনা সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশকে জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। এ ব্যাপারে চীন যে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে তাতে এ-সংক্রান্ত বিতর্কে এ পর্যন্ত নীরব যুক্তরাষ্ট্র ভোট দানে বিরত থাকে; একই সাথে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। মূলত চীনা ভেটোর কারণেই বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে অন্তর্ভুক্ত হতে ব্যর্থ হয়।

সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে সদস্য হতে না পারলে বিশ্ব পরিমণ্ডলে মারাত্মক অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করেই বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতীয় সেনা বাংলাদেশে থাকলে বিশ্ব হয়তো তা সহজভাবে নেবে না। তাই তিনি ১৯৭২ সালের শুরুতেই জোর গলায় ভারতকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তাদের সেনা সরিয়ে নিয়ে যেতে। এ ক্ষেত্রে হয়তো চীন ও মুসলিম দেশগুলোর মনোভাব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। নয়তো ওই-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পেরেছিলেন। তার টাওয়ারিং পার্সোনালিটির কারণেই মূলত বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় তিনি সফল হয়েছিলেন। অবশ্য তার পরও চট্টগ্রাম বন্দর সচল করার উদ্দেশ্যে সোভিয়েত নৌবাহিনীর সদস্যরা রয়ে গিয়েছিল। এতে জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ পেতে এতটা অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না।

কিন্তু ওই বছর আগস্ট মাসে চীন জাতিসঙ্ঘে ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। ভারতের হাতে তখনো ৯০ হাজার সামরিক ও বেসামরিক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক ছিল। চীন জাতিসঙ্ঘে আনুষ্ঠানিক ভেটো দেয়ার বহু আগে থেকেই অবশ্য বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাদের অবস্থানের ব্যাপারে ব্যাপক আপত্তি জানিয়ে আসছিল। চীনের হয়তো ভয় ছিল, বাংলাদেশে ভারতীয় সেনারা পুরোদস্তুর আসন গেড়ে বসবে। অন্য দিকে সোভিয়েত রাশিয়া ভারতের সাথে সামরিক চুক্তির আওতায় পাকিস্তানে আগ্রাসন চালাবে এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসবে। পাকিস্তানের বালুচিস্তানের গোয়াদার এলাকার ওপর সোভিয়েতদের শ্যেনদৃষ্টি ছিল বহু দিনের। ওই সময় চীন ও রাশিয়া ছিল পরস্পরের শত্রু।

ভারতও চীনের কাছে প্রতিপক্ষ। তাই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মিলে চীনকে ঘিরে ফেলে দুর্বল করে দেয়ার আশঙ্কটা তাদের নীতি-নির্ধারকদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভেটো প্রদান করে তাই চীন এক দিকে চাইছিল ভারতকে চাপে রেখে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের দ্রুত ফেরত দেয়ায় বাধ্য করতে, অন্য দিকে বাংলাদেশ চাপে পড়ে যাতে ভারতকে প্রভাবিত করে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধবন্দী ইস্যুসহ যুদ্ধ-পরবর্তী অন্য বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধানের পথে এগিয়ে যায় তা নিশ্চিত করে। চীন কোনোভাবেই চায়নি সোভিয়েত ইউনিয়ন আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তার উপস্থিতি কায়েম করুক। স্নায়ুযুদ্ধের ওই উত্তপ্ত সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে চীনের গৃহীত কৌশলগুলোর সরাসরি সমর্থন না জানালেও পরোক্ষভাবে একই পথে হেঁটেছে।

এ দিকে বাংলাদেশ চীনের অব্যাহত বিরোধিতার মুখে দীর্ঘ দিন জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ পেতে ব্যর্থ হয়। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সদস্যপদ লাভ করে ও ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। ভারত থেকে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী ফেরত যাওয়া পর্যন্ত চীন এই বিরোধিতা ঠিকই বজায় রেখেছিল এবং বন্দীদের সবাই পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার পরই বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তিতে তার বাধা প্রদান বন্ধ করে।

ওই সময়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ওই সম্মেলন শেষে বঙ্গবন্ধুর একটি বাণী পড়ে শোনান, যেখানে বলা হয়- ‘ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ’। মূলত ওই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতে বন্দী সব পাকিস্তানি সেনা ও সিভিলিয়ানরা পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এমনকি। যে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়, তাদেরও ফিরিয়ে দেয় ভারত (তথ্যসূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১১ এপ্রিল ১৯৭৪)। কিন্তু তার পরও চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু লাহোরে ঐতিহাসিক ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন ও মুসলিম বিশ্বের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের সম্পর্ক দৃঢ় করেন। এই সম্মেলনে যোগদানের জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার প্রসঙ্গটিকে চীন কিভাবে নিয়েছিল তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে যে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় সেই পাকিস্তানও কিন্তু ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সফরেও আসেন।

যাই হোক, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। তারই সহযোগী খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। চীন সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ৩১ আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে ওই বছরই ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াকে সরিয়ে নিজেই সেনাপ্রধান হয়ে বসেন ও নিজেকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জাসদের বড় ভূমিকা থাকলেও সিপাহিরা গৃহবন্দিদশা থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে ও তাকে সেনাপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়। শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন পথচলা। উপমহাদেশের কৌশলগত সমীকরণগুলো দ্রুত পাল্টে যায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে যা জানা যায় তাতে দেখা গেছে, ওই সময় বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য আবারো ভারতের অনুকূলে নিয়ে আসার জন্য বড় রকমের চেষ্টা চালান ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু তখন চীনের রেডিও পিকিং ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভয়েস অব আমেরিকা থেকে প্রায়ই একই মেসেজ প্রচার করা হয়। রেডিও পিকিং থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণরূপে ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ চীন মেনে নেবে না।

বলা হয়ে থাকে, মূলত ওই কারণেই ভারত সামরিক অভিযান থেকে পিছিয়ে যায়। মেজর জেনারেল জিয়া নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক না করলেও দেশ পরিচালনা ও গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে তার হাতে। জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেই অতি দ্রুত চীনের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করায় মনোনিবেশ করেন। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত ছিল একই অক্ষের। বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের কৌশলগত অবস্থানও ছিল একই। কিন্তু ওই রকম দু’টি শক্তিশালী দেশের নাকের ডগা দিয়ে জিয়া তাদের তখনকার কমন এনিমি চীনের সাথে প্রত্যক্ষ সামরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানকে (তদানীন্তন লে. কর্নেল) চীনে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক অ্যাটাশে করে পাঠানো হয়। পিকিং পাঠানোর আগে জেনারেল জিয়া মাহবুবকে ডেকে যে ব্রিফিং দিয়েছিলেন তার শেষ কথা ছিল- রিমেম্বার মাহবুব, চীন ইজ আওয়ার ডেসটিনি (লেখকের সাথে জেনারেল মাহবুবের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার)।

১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সামরিক ক্ষমতা বলতে গেলে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু ছিল না। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ছিল রক্ষীবাহিনীর মতো সংগঠন। তখন সব মিলিয়ে এক ডিভিশনের কিছু বেশি সেনা ছিল বাংলাদেশের। ভারী সমরাস্ত্র ছিল নগণ্য। জেনারেল জিয়া চীনের সাথে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপনের পর চীন অতি দ্রুত বাংলাদেশকে সর্ব প্রকার ভারী সমরাস্ত্র সরবরাহ শুরু করে। জিয়ার প্রায় চার বছরের শাসনামলে তাই বাংলাদেশের সেনা সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ ডিভিশনে। এসবের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ট্যাংক, কামান, মর্টার, ট্যাংক বিধ্বংসী রিকয়েললেস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার ঝড়ের গতিতে পাঠায় পিকিং সরকার। সাথে চলতে থাকে পূর্ণ প্রশিক্ষণ। নৌবাহিনীর জন্য তারা পাঠায় মিসাইল বোট, টর্পেডো বোট, সাবমেরিন চেজার, প্যাট্রোল বোট। বিমানবাহিনীর জন্য চীন থেকে নিয়ে আসা হয় এফ-৬ জঙ্গিবিমান, পিটি-৬ প্রশিক্ষণ বিমান প্রভৃতি। সব ক্ষেত্রেই চীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার ও জওয়ানদের প্রশিক্ষণ দেয়। এমনকি তাদের প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থান করে সেনাবাহিনীকে যাবতীয় পর্যায়ে সহযোগিতা করেন। কমান্ডো বাহিনী সংগঠন ও প্যারাট্রুপার প্রশিক্ষণের জন্যও চীনা প্রশিক্ষকরা অনেক কষ্ট সহ্য করে দীর্ঘ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন। সে সময় পদ্মা নদীর পূর্ব পাড়ের তিনটি পদাতিক ডিভিশন প্রায় পুরোটা চীনা অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত হলেও নদীর পশ্চিম পাশের বগুড়া ও যশোরে অবস্থিত দু’টি পদাতিক ডিভিশনের হালকা অস্ত্র যেমন রাইফেল, এলএমজি সরবরাহ করে পাকিস্তান।

জার্মান লাইসেন্সে তৈরি করা জি-৩ রাইফেল বহুদিন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ওই দু’টি ডিভিশনে ব্যবহার করা হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত না চীনা রাইফেল ও আনুষঙ্গিক অস্ত্রাদি সরবরাহ নিশ্চিত হয়। জিয়ার অকাল মৃত্যুর পর এরশাদ যখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখনো চীন তাদের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। চীন সবসময় বলে এসেছে যে, সে কারো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। অন্য দিকে এরশাদ জিয়ার রেখে যাওয়া ডকট্রিন হুবহু অনুসরণ করেন, যাতে চীন হয় বাংলাদেশের প্রধানতম কৌশলগত ও সামরিক অংশীদার। এ জন্য বাংলাদেশকে প্রতিবেশী ভারতের কম সমালোচনা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি। বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি, বিশেষ করে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে ভারত বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে।

১৯৮৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা গবেষক রবি রিখির একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘যুদ্ধে ভারত কেন বারবার হেরেছে’ শিরোনামের ওই লেখায় রবি রিখি ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ভারত যে বাংলাদেশে সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল সেই প্রসঙ্গে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান যখন নিহত হন, তখন ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ঠিক করেছিলেন, তিনি হস্তক্ষেপ করবেন। সেনাবাহিনীর তিনটি ডিভিশনকে সতর্কও করে দেয়া হয়। কিন্তু শেষে সরকার গড়িমসি করল এবং সুযোগ পেরিয়ে গেল। ফলে হলো কী? হ্যাঁ, বাংলাদেশকে আমাদের শিবিরে রাখার সুযোগ আমরা হাতছাড়া করলাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে যুক্তিতে পোল্যান্ড ও আফগানিস্তানে এবং আমেরিকা নিকারাগুয়া ও গ্রানাডায় সেনা নামিয়েছিল, সেই যুক্তিতে ভারতও তখন বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করলে তা অসঙ্গত হতো না।’

ভারতের এ ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মরহুম আবদুস সামাদ ২০০০ সালে এই নিবন্ধের লেখকের সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘ওই সময় এমনও হয়েছে, ভারতীয় আক্রমণের সুনির্দিষ্ট সময় (এইচ আওয়ার) গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পেরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও যুদ্ধপ্রস্তুতি নিতে হয়েছে।’ তিনি আরো উল্লেখ করেছিলেন, জেনারেল জিয়ার অনুরোধে চীন তখন দ্রুত কূটনৈতিক পথে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ না করার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দেয় ভারতকে। মূলত এ কারণেই ভারত পিছিয়ে গিয়েছিল। এসব ঘটনায় স্পষ্টতই বোঝা যায়, চীন বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ওই কঠিন সময়গুলোতে অতি দ্রুত ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এটাও লক্ষণীয়, জেনারেল জিয়ার বিশেষ অনুরোধে চীন তার নিজ নৌবাহিনী থেকে দ্রুত ডিকমিশন করে কয়েকটি মিসাইল ও টর্পেডো বোট বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে হস্তান্তর করেছে। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রধানতম সামরিক মিত্র পাকিস্তানও বাংলাদেশের পরে ওই ধরনের নৌযান তাদের বহরে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়।

(বাকি অংশ আগামীকাল)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 81 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ