ডাকসু নির্বাচন যে কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেনি ছাত্রদল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছর পর হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ প্রতিযোগিতাই করতে পারেনি ছাত্রদল । ডাকসু এবং হলে একটি পদেও জয় পায়নি দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই ছাত্র সংগঠনটি। ছাত্রদল প্রার্থীদের এমন ভরাডুবিতে বিস্মিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। কেন এই অবস্থা? সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ বেশ কয়েকটি কারণে এই ভরাডুবি বলে মনে করছেন অনেকে।

তবে ছাত্রদলের অধিকাংশ নেতাকর্মীদের মতে, ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল সক্রিয় থাকতে পারেনি। আবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রায় সবাই অছাত্র। গত দশ বছরে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে না পারায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের তেমন যোগাযোগ হয়নি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, প্যানেল গঠনে জটিলতা ও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ভোটে অংশ নেয়ায় নির্বাচনে বিপর্যয় হয়েছে।

যদিও ছাত্রদলের নেতারা মনে করছেন, ভোটে অনিয়ম ও কারচুপি না হলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো।

১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল বড় বিজয় পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসুর ২৫টি পদের একটিতেও জয় পায়নি। এমনকি প্রার্থীদের মধ্যে সম্পাদকীয় একটি পদ ছাড়া কেউ হাজারের ওপরে ভোট পাননি। ১২টি সম্পাদকীয় পদের মাত্র একটিতে ছাত্রদলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। ভিপি পদে এই সংগঠনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ২৪৫ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন। জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার ৪৬২ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন। আর এজিএস প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন মাত্র ২৯৪ ভোট।

এ ছাড়া ১৮টি হল সংসদের কোনো পদেও ছাত্রদল জয় পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। হল সংসদগুলোতে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন ৫৪ জন।

ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা জানান, ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর প্রার্থী নিয়ে জটিলতা শুরু হয়। বয়সসীমা বেঁধে দেয়ায় ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় এবং ঢাবি কমিটির কোনো নেতা প্রার্থী হতে পারেননি। ছাত্রদলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য এই পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে মনে করেন সংগঠনটির নেতারা।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হক মানবজমিনকে বলেন, এবারের ডাকসু নির্বাচনকে আমি এখন পর্যন্ত নির্বাচন মনে করি না। এই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। মেয়েদের কয়েকটি হল ছাড়া ছেলেদের কোনো হলে ভোট হয়েছে বলে আমি মনে করি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ ধরনের কলঙ্কময় ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এটা শুধু ছাত্রদল নয়, ছাত্রলীগ বাদ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সব ছাত্র সংগঠনের উপলব্ধি।

এই নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির জন্য সাংগঠনিক কোনো দুর্বলতা দায়ী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি দলেরই কোনো না কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে। আমরা গত ১০ বছর ধরে ক্যাম্পাসে তেমন কোনো সাংগঠনিক কার্যত্রম চালাতে পারিনি। আর ঢাবি ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীদের বয়সের সময়সীমা বেঁধে দেয়ার কারণে কিছুটা সমস্যায় পড়ে ছাত্রদল।

ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেমন নির্বাচন হয়েছে, তা সবাই দেখেছেন। ১০ তারিখ রাতেই ব্যালট পেপারে সিল দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগকে জেতানোর জন্য। সকালে ভোটের আগেই কুয়েত মৈত্রী হল থেকে সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকে ভোটই দিতে পারেননি, সে জায়গায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে অনেকে জয়ী হয়েছেন। তাদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে। কারচুপির মাধ্যমে পুরোপুরি নীলনকশার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি মানবজমিনকে বলেন, আমিতো এই নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির কিছুই দেখছি না। এখানে তো কোনো নির্বাচন হয়নি। রাতের আঁধারে ভোট হয়েছে। এটাতো কোনো নির্বাচন হতে পারে না। যদি ডাকসুতে কোনো সুষ্ঠু ভোট হতো বা নির্বাচনের মতো নির্বাচন হতো তাহলে কিছু বলা যেত। গত ১০ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল অত্যাচারিত ও নির্বাসিত অবস্থায় ছিল। বিভিন্ন হলে ছাত্রদল পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এ্যানি বলেন, এখানে ছাত্রদলের কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতা নেই। নির্বাচনের আগ থেকেই হলে আমাদের যে সকল ছেলেরা ছিল তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের সময় কাউকে হলে ঢুকতে দেয়া হয়নি। কাউকে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। প্রত্যেকে মার খেয়েছে। এরপরেও আমরা প্রার্থী দিয়েছি নিয়মানুযায়ী যাদের ছাত্রত্ব ছিল। আমি আশা করছি সামনের দিকে ছাত্রদল অনেক এগিয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার মানবজমিনকে বলেন, এবারে নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রতিযোগিতায় না থাকার কিছুই দেখছি না।

আমি মনে করি এটা একটা প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে। ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার জন্য এটা একটা পাঁয়তারা করা হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে। ছাত্রদলের অনেককেই নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেয়া হয়নি। অনেক ছাত্র নেতারা আছেন যারা অনার্স করার পর মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেননি। তবে আমরা সকল বাধা বিপত্তি দূরে ঠেলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবো। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের একজন সহ-সভপতি মানবজমিনকে বলেন, যারা ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন তারা ছিলেন অছাত্র ও বয়স্ক নেতা। যারা এবার ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের মধ্যে থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে ছাত্রদলের কমিটিতে শীর্ষ পদে নেয়া হবে- এমন আশঙ্কা থেকে তারা বিরোধিতা করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের একজন সহ-সভাপতি বলেন, সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রার্থীরা প্রচারের সময়ও তেমন পাননি। তারপর আবার প্রচারে সমন্বয়হীনতাও ছিল। হল পর্যায়ের নেতাকে ডাকসুর প্রার্থী করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তারা অপরিচিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ছাত্রদল প্রার্থীদের জয়ী করার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের আন্তরিকতার অভাবও ছিল। কারণ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ হাজারের মতো অনাবাসিক ছাত্র ছিল। তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাদের বাসায় গিয়ে অথবা ফোন করে যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ আগ্রহই দেখাননি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফোনঃ +৪৪-৭৫৩৬-৫৭৪৪৪১
Email: [email protected]
স্বত্বাধিকারী কর্তৃক sheershakhobor.com এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত