জাবি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ৪০০ কোটি টাকার দরপত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগ

Pub: মঙ্গলবার, মে ২৮, ২০১৯ ৭:৫৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, মে ২৮, ২০১৯ ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে হতে যাওয়া ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে’র প্রথম ধাপের ৬টি হল নির্মাণের লক্ষে ৪০০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই দরপত্র আহ্বানে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ গত ২৬ মে শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দরপত্রের সিডিউল ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীর মালিকানাধীন ‘ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’।  বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বরাবর লিখিতভাবে এই অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের একটি কপি ব্রেকিংনিউজের হাতে রয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ২৩ মে প্রি-টেন্ডার মিটিংয়ে অংশগ্রহণপূর্বক সিডিউল কিনে ফেরার সময় ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে ২০-৩০ জন যুবক তাদের কাছ থেকে সিডিউল জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। ফলে তাদের পক্ষে দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র (ইজিবি) আহ্বান করার অনুরোধ জানানো হয় অভিযোগপত্রে।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে প্রকল্প পরিচালকের অনুমতি নিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে সিডিউল কিনেন কোম্পানির একজন প্রতিনিধি। তিনি সিডিউল কিনে বের হলে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকের অনুসারী বেশ কিছু নেতাকর্মী তাদের কাছে সিডিউল দিয়ে দিতে বলেন। 

তারা বলেন, বিশ্বাস বিল্ডার্সসহ অনেকে আমাদের কাছে সিডিউল জমা দিয়ে গেছে। আপনিও দিয়ে দেন। কালকে আমরা একটা সমঝোতা করে আপনাদের মধ্যেই ছয়জনকে ছয়টা কাজের ব্যবস্থা করে দিব। প্রায় ১ ঘণ্টা বাগবিতন্ডার পর কোম্পানীর প্রতিনিধি ছাত্রলীগের কাছে ঐ সিডিউল দিয়ে দেন। 

যোগাযোগ করা হলে ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশনের একজন পরিচালক বলেন, আমাদের কাছে থেকে জাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সিডিউল ছিনতাই করেছে। কোম্পানীর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আছে আমরা লিখিত অভিযোগ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। প্রশাসন ম্যানুয়েল টেন্ডারের ব্যবস্থা করেছে কিন্তু আমাদের কোন নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। আমরা অনিয়ম রোধে পুনরায় ইজিবি টেন্ডার আহবান করার দাবি জানিয়েছি।

এই পরিচালক আরো বলেন, এখানে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দরা জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার আছেন। তাই আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও অভিযোগ করেছি।

এদিকে জানা যায়,  বিশ্বাস বিল্ডার্স,মাজেদ এন্ড সন্স, বঙ্গ বিল্ডার্সসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরুপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বাস বিল্ডার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম প্রকাশ করে কিছুই বলতে চাইনি। তবে তারা এই টেন্ডারে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানান।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি হলেরএই প্রকল্পে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ভঙ্গ করা হয়েছে বলে জানা যায়। ১লা  মে দেওয়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রথম ১৫ দিন ব্যাংকে কোন সিডিউল পাওয়া যায়নি। এছাড়া দরপত্র সিডিউল ক্রয় করার আগে প্রকল্প পরিচালকের অনুমতির শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা আইনবহির্ভূত। এছাড়া একটি মাত্র স্থান থেকে দরপত্র বিক্রি ও পাশাপাশি দুটি কক্ষে দরপত্র গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোন ব্যাংক/অফিস থেকে দরপত্র সিডিউল বিক্রি বা দরপত্র গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পাশাপাশি সিডিউল ক্রয় করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়। তাছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬টি লটের মধ্যে একটি লটের দরপত্রে অংশ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বরও চাওয়া হয়েছে। 

যোগাযোগ করা হলে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, সবাই তো সিডিউল কিনছে। সবাই সিডিউল পাচ্ছেও। ছাত্রলীগ কেন বাধা দিবে। তারা কেন অভিযোগ করেছে আমার জানা নাই। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য ছাত্রলীগ সোচ্চার আছে।

‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, আজ পর্যন্ত ২৫ টি সিডিউল কেনা হয়েছে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা আমি শুনেছি। তবে প্রকল্প পরিচালক বরাবর কোন অভিযোগ আসেনি।

ভিসিবিরোধী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক খবির উদ্দীন বলেন, কাজের  স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ই-টেন্ডার করা উচিত। সরকার তো  ই-টেন্ডারে সমস্ত কাজ করছে। প্রশাসনই ম্যানুয়েল টেন্ডার আহবান করে এই ধরনের অনিয়মের সুযোগ রেখে দিছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নুরূল আলম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘প্রকল্প নিয়ে আমি ওয়াকিবহাল নই। এটা ট্রেজারের সঙ্গে কথা বললে ভাল হয়।’ 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক শেখ মোঃ মনজুরুল হক ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আমি এই ধরনের কোনও অভিযোগ পাইনি। প্রতিনিধির কাছে অভিযোগপত্রের কপি থাকার কথা বললে বলেন, আমার হাতে অসার পর আমি মন্তব্য করবো। অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দেখে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে রয়েছেন। তাই তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে সিডিউল কেনার ব্যাংক কার্যালয়ে ছাত্রলীগ শোডাইন দিয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদক গ্রুপের পাশাপাশি বিদ্রোহী গ্রুপ ও সাবেক নেতাদের একটা গ্রুপও তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানের জন্য সিডিউল কিনেছে। গত সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জাবি ভিসির সাথে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জাবির নেতৃবৃন্দকে ডাকেনি। এরপর থেকে কেন্দ্রের সঙ্গে জাবি ছাত্রলীগের বনিবনা না হওয়ার একটা গুঞ্জনও উঠেছে। 

প্রসঙ্গত, এই অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি হল (৩টি ছাত্র হল, ৩টি ছাত্রীহল) নির্মাণ করা হবে। ১০০০ শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি হল হবে দশতলা বিশিষ্ট। প্রতিটি হলের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। ছাত্রদের ৩টি হল নির্মাণ করা হবে রবীন্দ্রনাথ হল সংলগ্ন সুইজারল্যান্ড নামক পয়েন্টে আর মেয়েদের হল নির্মাণ করা হবে টারজান পয়েন্ট এলাকায়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে প্রস্তাবনা মূল্যায়ন কমিটি, প্রকল্প মূল্যায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের জন্য দুইটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করা হয়েছে। এদিকে আজ দরপত্র জমা দেওয়ার শেষদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ঘনিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র সিডিউল কিনেছে। এছাড়া এক মন্ত্রীর আত্মীয় ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা দরপত্র কিনেছে বলে জানা গেছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ