শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহতের ঘোষণা ছাত্রলীগের

Pub: বুধবার, জুলাই ২৪, ২০১৯ ১২:১৮ অপরাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, জুলাই ২৪, ২০১৯ ১২:১৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লাঞ্ছিত ডাকসু ভিপি নূর * শিক্ষার্থীদের ঝুলানো তালা ভাঙল ছাত্রলীগ * বিক্ষোভে অচল ঢাবি, ডাকসুর আহ্বান প্রত্যাখ্যান

ঢাবি প্রতিনিধি:
সাত কলেজের অধিবুক্তি বাতিল দাবিতে ঢাবি ভিসি কার্যালয়ের গেটে শিক্ষার্থীদের দেয়া তালা মঙ্গলবার ভেঙে দিচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা, ছবি: যুগান্তর
রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অচল হয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)।

মঙ্গলবার পঞ্চম দিনের মতো আন্দোলনে উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। বন্ধ আছে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এদিন ক্লাসে ফেরার জন্য ডাকসুর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে সাত কলেজ সমস্যা সমাধানের দাবিতে ছাত্রলীগ প্রশাসনিক ভবনে বিক্ষোভকারীদের ঝুলিয়ে দেয়া তালা ভেঙে প্রশাসনকে স্মারকলিপি দেয়।

এর আগে হামলা করে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনের ওপর। হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করতে গেলে লাঞ্ছিত করা হয় ভিপি নূরুল হক নূরকে। আজ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে যেতে বাধা দিলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার হুশিয়ারি দেয় ছাত্রলীগ। এ অবস্থায় ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আজও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

মঙ্গলবার বিকালে চীনের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এবং ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ছয় দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

সাত কলেজ সমস্যার বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হল ছাত্ররা। তাদের স্বার্থ আমাদের স্বার্থ। শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিত চিন্তা করে আমরা অগ্রসর হব। সবার আগে দেখতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ।

তিনি বলেন, যেহেতু কলেজগুলো সরকারি, তাই বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি সম্মানজনক সমাধান আমরা বের করব। আশা করছি, অতি শীঘ্র সাত কলেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুরে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের অনুপস্থিতিতে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদের কাছে স্মারকলিপি দেয় ছাত্রলীগ।

এ সময় তারা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে প্রশাসনিক ভবনে আন্দোলনকারীদের দেয়া তালা ভেঙে ফেলে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে সংগঠনটি।

এ সময় সেখানে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু সেই লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে। তবে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা অধিভুক্ত সাত কলেজের পক্ষে। তাদের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে।

কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে একটি মহল তাদের বিশেষ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীকাল বুধবার থেকে আপনারা ক্লাসে যাবেন। যারা বাধা দেবে তাদের দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে।

এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আগস্ট মাসের মধ্যেই ডাকসু ও ছাত্রলীগের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন।

এদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতারা প্রশাসনিক ভবনে গেলে সেখানে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সেখানে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন উপস্থিত হয়ে কথা বলতে এগিয়ে যান।

এ সময় তাকে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলার বিষয়ে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক বলেন, শিক্ষার্থীরা গত কয়েকদিন ধরে ‘লাগাও তালা, বাঁচাও ঢাবি’ কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

ছাত্রলীগ স্মারকলিপি দিতে গেলে প্রশাসনিক ভবনে আমি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেখতে যাই। সেখানে ছাত্রলীগের রাব্বানী ভাই, শোভন ও সাদ্দাম ভাইরা ছিলেন। তারা স্মারকলিপি দেয়ার জন্য ভেতরে যায়।

তখন আমরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখান থেকে চলে আসার সময় জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহসম্পাদক রাব্বির নেতৃত্বে আমাকে মারধর করা হয়। আখতার বলেন, তারা আমাদের মারবে, আমি ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার জন্য আমার ওপর হামলা করার অথরিটি তাদের কে দিল।

এদিকে স্মারকলিপি প্রদানকালে ছাত্রলীগের নেতারা প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদের কাছে সাত কলেজ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার ত্বরিত ও স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন।

এ সময় ডাকসুকে ব্যবহার করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ অবলম্বন করায় ভিপি নূরুল হক নূর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে ডাকসুতে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানান জিএস ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

তিনি বলেন, ডাকসু থেকে আহ্বান জানানোর পরও যারা আন্দোলনে উসকানি দিয়েছে বিশেষ করে ডাকসুর একজন সম্পাদক সরাসরি জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাকসুর রুমে ব্যবহার করে গত তিন দিনে তারা তালা ও শিকল ব্যবহার করেছিল।

এ দু’জনের (ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাকসু থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার জন্য আমরা সভাপতি বরাবর স্মারকলিপি দেব।

স্মারকলিপির বিষয়ে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। সরকারের উচ্চপর্যায়ে আমরা কথা বলেছি। সেখানে ইতিবাচক ভূমিকা দেখিয়েছেন তারা। আমরা দ্রুত বিষয়টির সমাধান করার চেষ্টা করব।

অন্যদিকে আখতার হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ এনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। ডাকসু ভিপি নূরুল হক নূরের নেতৃত্বে মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্ট প্রদিক্ষণ করে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এসে শেষ হয়।

এ সময় আখতারের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও সুষ্ঠু বিচার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এরপর অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করতে এলে ছাত্রলীগের কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মীরা তা পণ্ড করে দেয়। বিক্ষোভকারীদের ঘিরে রেখে লাঞ্ছিত করে।

ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে ডাকসু ভিপিকে উদ্দেশ করে বিভিন্ন রকমের গালাগাল দিতে থাকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ বিষয়ে ডাকসুর ভিপি নূরুল হক নূর সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেক হামলা হয়েছে কিন্তু তার কোনো বিচার আমরা পাইনি।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আমি যখন শুনতে এসেছি তখন আপনারা দেখেছেন ডাকসুর জিএসের উপস্থিতিতে আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে।

ছাত্রলীগ নানা ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারণে তারা তাদের এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে। আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার বিচার চেয়েও কোনো বিচার পাইনি।

এদিকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হুমকি থাকলেও আজও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মুখপাত্র শাকিল মিয়া বলেন, আন্দোলনে সমর্থন জানানোর কারণে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না।

আগামীকালও আমাদের আন্দোলন চলবে। আন্দোলনে কোনো বাধা এলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তা প্রতিহত করা হবে। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ বলেন, আখতারের ওপর হামলার বিচারসহ অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে সকালে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনে তালা দেয়া হবে।

এরপর বেলা ১১টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। এর ফলে এসব কলেজে ভর্তি পরীক্ষা, পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজগুলো হল : ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ