জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের আসনগুলোর মধ্যে পাঁচটি সংসদীয় এলাকায় চমক দেখানোর অপেক্ষায় বিএনপির ৫ প্রার্থী। তাদের মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তিন হেভিওয়েট নেতা ও দুজন তরুণ রয়েছেন। ভোটারদের মুখে মুখে তাদের নির্বাচনি দৌড়ে এগিয়ে থাকার গল্প শোনা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম-১০ (খুলশি-পাহাড়তলী) আসনে তরুণ নেতা সাঈদ আল নোমান প্রচারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চারবারের এমপি। এই আসন থেকে জয়ী হয়ে একবার মন্ত্রী ছিলেন। সে হিসেবে ভোটের মাঠে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ ভারি। তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একজন। এবারও এই আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নিয়াজ মোহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জয়ী হলে এবং বিএনপি সরকার গঠন করলে চট্টগ্রামের উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবেন। এই বাস্তবতায় কেবল বিএনপি কর্মী-সমর্থকরাই নয়, এলাকার সাধারণ ভোটাররা জনপ্রতিনিধি হিসেবে ধানের শীষের প্রার্থীকেই বেছে নেবেন। কেবল জয় নয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বড় ব্যবধানে জয়লাভ করবেন—এমন প্রত্যাশা আমাদের।’
এই আসনে খসরুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিউল আলম। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ছিলেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি (বর্তমানে কারাবন্দি) এম এ লতিফ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশ জামায়াত প্রার্থীর বাক্সে যেতে পারে বলে আশা করছেন শফিউল আলমের অনুসারীরা।
শফিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দর-কাস্টমসসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে ৫ আগস্টের পর বিএনপির লোকজন ব্যাপক চাঁদাবাজি করেছে। এ কারণে বিএনপি প্রার্থীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সাধারণ ভোটাররা। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে সেটি প্রমাণিত হবে।’
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপি প্রার্থী লায়ন আসলাম চৌধুরী টানা দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় জেলে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি জেল থেকে বের হন। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে সরকারের রোষানলে পড়ে এই ব্যবসায়ী হাজার কোটি টাকার ব্যবসাও হারিয়েছেন। হয়েছেন ঋণখেলাপি। নির্বাচন কমিশন তাকে টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছেন। রকি বড়ুয়া নামে এক ভোটার বলেন, লায়ন আসলাম চৌধুরী যেভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে সাধারণ ভোটাররা তার প্রতিদান দেবেন বলে আশা করছি। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অপেক্ষাকৃত তরুণ আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী। তারও ক্লিন ইমেজ রয়েছে। তবে আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে তার পেরে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী এনামুল হক এনামও একজন কারা-নির্যাতিত নেতা। স্থানীয়রা বলছেন, ২০১৮ সালে নির্বাচন করতে গিয়ে তিনি নিজে যেমন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন, তেমনি তার দুই কর্মীও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। একাধিকবার জেলে গেছেন। শত নির্যাতন সত্ত্বেও হাল না ছাড়া এবং নেতা-কর্মীদের আগলে রাখা এই নেতার কষ্টের ঋণ শোধ করার এখনই সময় বলে মনে করেন তার অনুসারী এবং সাধারণ ভোটাররা। এনামের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব শফিকুল ইসলাম চেয়ারম্যান যুগান্তরকে বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতবেন—এই প্রত্যাশা আছে আমাদের। ভোটাররা মুখিয়ে আছেন ভোট দিতে।’
এই আসনে ১১ দলীয় ঐক্যজোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম (দাঁড়িপাল্লা) এবং বৃহত্তর সুন্নি জোট সমর্থিত বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু (মোমবাতি) কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার প্রত্যাশায় রয়েছেন। প্রচার-প্রচারণায়ও দুই প্রার্থীর বিপুল জনসমর্থন দেখা গেছে। মোমবাতি প্রার্থীর মিডিয়া সেলের প্রধান মুহাম্মদ কমরুদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির মধ্যে গ্রুপিং চরমে। মনোনয়নবঞ্চিত এবং তাদের অনুসারীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সেই সুযোগটিও কাজে লাগাতে চান মোমবাতির প্রার্থী। ধানের শীষের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবেন তাদের প্রার্থী। কারণ মোমবাতির প্রার্থী এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৭০ হাজার ভোট পেয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে মোমবাতির প্রার্থীকেই বেছে নেবেন এলাকার ভোটাররা।’
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে চমক দেখাতে চান বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলাল বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকার পতনের পর এ পর্যন্ত হাটহাজারীতে ছিলেন। বিএনপির উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এস এম ফজলুল হক এবং বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাও এই আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে হেলাল মনোনয়ন পাওয়ার পর তার পক্ষে ভোট চাইছেন এই দুই নেতা। এ কারণে ভোটের মাঠ পুরোপুরিই তার অনুকূলে। বিএনপি নেতা আসিফ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, হাটহাজারী সদরে হেলালের সর্বশেষ নির্বাচনি জনসভায় মানুষের যে উপস্থিতি ছিল, তা অকল্পনীয়। এই জনসভা প্রমাণ করে ভোটাররা হেলালকে সংসদে পাঠাতে মুখিয়ে আছেন।
এই আসনে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিশের নাসির উদ্দিন মুনির (রিকশা) ও বৃহত্তর সুন্নি জোট মনোনীত প্রার্থী ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন। তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, এই আসনে মীর হেলালের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং প্রতীক দুটোই কম পরিচিত এলাকাবাসীর কাছে। তাই সুষ্ঠু ভোট হলে এই আসনে মীর হেলালের জয় সময়ের ব্যাপার।
চট্টগ্রাম-১০ (খুলশি-পাহাড়তলী) আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান তুর্য। তিনি অক্সফোর্ড থেকে পাস করা একজন তরুণ। তার বিপরীতে আছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী। আবদুল্লাহ আল নোমানের পরিচিতি এবং উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র ও মার্জিত তরুণ হিসেবে সাঈদ আল নোমান প্রচার-প্রচারণায় সাড়া জাগিয়েছেন। তার বিপরীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন শামসুজ্জামান হেলালী। এলাকার সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শেষ হাসি হাসতে পারেন সাঈদ আল নোমান তুর্য।












