যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টারে মসজিদে মুসল্লিদের ওপর ফের হামলা

Pub: সোমবার, জুন ২৯, ২০২০ ৩:০৪ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বায়তুল মামুর মসজিদে কমিটির কতিপয় সদস্য কর্তৃক আবারও নিরীহ মুসল্লিদের ওপর হামলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। 

স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে তিন বছর মেয়াদি নতুন কমিটি গঠন করার সময় মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে ‘শয়তান’ বলাকে কেন্দ্র করে কমিটির সদস্য ও মুসল্লিদের মাঝে হট্টগোল ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। একই মসজিদে এর আগেও কয়েক দফা অপ্রীতিকর ঘটনাসহ কোষাধ্যক্ষের হাতে মসজিদের ইমাম লাঞ্ছিত হবার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম বাংলা প্রেস এ খবর জানিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লিরা জানান, মসজিদের নতুন কমিটি গঠনের করার জন্য গত শুক্রবার সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়। বাদ আছর সভা শুরু হলে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশিক রহমান শান্তিপূর্ণভাবেই সভা পরিচালনা করছিলেন। মাগরিব নামাজের পূর্ব পর্যন্ত কোনও প্রকার সমস্যা দেখা যায়নি। বাদ মাগরিব আবারও সভা কার্য শুরু হয়। মুসল্লিদের পক্ষ থেকে চাঁদা ভিত্তিক মসজিদের সদস্য ভোটারের মেয়াদ ৩ বছর থেকে ১ বছর করে সংবিধানের কিছু নিয়মকানুন পরিবর্তনের দাবি উঠে। এ প্রস্তাবটির পক্ষে উপস্থিত মুসল্লিদের শতকরা ৯৫ ভাগ মুসল্লি তাদের সমর্থন দিলেও কমিটির কোষাধ্যক্ষ পদধারী তারেক আম্বিয়া ও তার ভাই তৌফিফুল আম্বিয়ার সমর্থক ও নিকটাত্মীয়রা উক্ত প্রস্তাবটির বিপক্ষে অবস্থান নেন। 

ওই সাধারণ সভায় সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান বহির্ভূত কাযর্ক্রমের ওপর মুসল্লিগণ বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। মুসল্লিগণের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারায় তারেক আম্বিয়ার ঈশারায় তার চাচাত ভাই মইনুল, এনাম, নাজমুল প্রশ্নকারীদের অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে নাজেহাল করে তোলেন। 

মইনুল ইসলাম এক পর্যায়ে মুস্ললিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এখানে অনেক শয়তানও আছে। তার কথা অন্য সদস্য/ মুসল্লি হারুন আহমেদের কানে গেলে তিনি পাল্টা জবাব দেন। উপয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। মারমুখি হয়ে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা চলে উভয় পক্ষে। — এক পর্যায়ে প্রচুর হট্টগোল শুরু হয়। হামলা ও হট্টগোলের  সময় মসজিদে বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোশিয়েশন অব কানেকটিকাট (বাক) এর বেশ কিছু কর্মকর্তাদের দেখা গেছে। ইতোপূর্বে মসজিদ কমিটির সাধারন সভায় বেশ কয়েকবার বাক-এর এসব কর্মকর্তাদেরকে হট্টগোল করার জন্য কেবা-কারা ভাড়া করে এনেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।’

মসজিদ কমিটির সদস্য/মুসল্লি হারুন আহমেদ ও সরকার মামুন জানান, কমিটির কোষাধ্যক্ষ তারেক আম্বিয়া ও তৌফিফুল আম্বিয়া’র তাদের চাচাত ভাই মইনুল,নাজমুল ও এনাম উক্ত শান্তিপূর্ণ সভায় বিশৃংখলার সৃষ্টি করেন এবং বাংলা সিনেমার খল নায়কদের মতো দুই দফা মুসল্লিদের উপর আক্রমণ করেন। এতে মুসল্লিগন খিপ্ত হয়ে ওঠেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তারেক-টিপু তাদের লাঠিয়াল চাচাত ভাইদেরকে মসজিদ থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। কমিটির সাধারন সম্পাদক আশিক রহমান হট্টগোল থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে অন্যান্যদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কমিটি গঠনের এ সভা ভুন্ডুল হলেও অধিকাংশ মুসল্লিদের অনুপস্থিতিতেই জোরপুর্বক এবং অবৈধভাবে আগামী ৩ বছরের জন্য নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশিক রহমানের কাছে শুক্রবারের উক্ত ঘটনার বর্ণনা জানতে চাওয়া হলে তিনি অপ্রীতিকর ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, উক্ত ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী। কারণ পদাধিকার বলে তিনি উক্ত সভাটি পরিচালনা করছিলেন। সভার কার্য চলাকালীন সময় দুই গ্রুপের লোকজনই উপস্থিত ছিলেন। একসময় মইনুল ইসলাম নামের এক মুসল্লি/সদস্য বলে ওঠেন, এখানে অনেক শয়তানও আছে। এর পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে সদস্য/ মুসল্লি হারুন আহমেদ বলেন শয়তান তোমাদের মধ্যেও রয়েছে। 

এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হট্টগোল শুরু হয় এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।মারমুখি হয়ে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা চলে উভয় পক্ষে। এক পর্যায়ে প্রচুর হট্টগোল শুরু হয়। তবে তিনি হট্টগোল থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন বলে নিজেকেই দায়ী মনে করছেন।  

আশিক রহমান আরও জানান, আগামী তিন বছরের জন্য নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুধুমাত্র নতুন ২জন সদস্যের বদলে নতুন ২ জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে। এরা হলেন হাবিবুর রহমান ও নাসিমুল করিম বাবু। আর বাকি সব সদস্যই আগের কমিটির। তারা পূর্বের স্ব স্ব পদেই আছেন। তবে এবারে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে থাকতে একাবারেই রাজি ছিলেন না। অনেকেরই জোর আপত্তির ফলে তিনি পুনঃরায় স্বপদেই বহাল রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে  সমাজে বসবাস করতে গেলে টুকটাক অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে। এর আগেও মসজিদে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো কমিটির কোষাধ্যক্ষ কর্তৃক সাবেক ইমাম জুবায়ের আহমেদকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা। এ ঘটনা শোনার পর তিনি চোখের পানিকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কেঁদেছেন। সাবেক ইমামের কাছে কোষাধ্যক্ষ তারেক আম্বিয়ার কয়েক দফা ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে উক্ত ঘটনাটির পরিসমাপ্তি ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গত শুক্রবারের ঘটনা প্রসঙ্গে মসজিদ কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, শুক্রবার কমিটির সভা চলাকালে তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। এটা ছোটখাট ঘটনা। সংবিধানের কিছু নিয়ম-কানুন পরিবর্তনের দাবি উঠলে দুই গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়েছে। তেমন কিছু না। নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মসজিদ কমিটির অন্যতম সদস্য মারুফ হোসেন বলেন, সংবিধানের ৪নং অনুচ্ছেদের ‘এ’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে সমস্ত মুসল্লিগণ সুদ,জুয়া,মদসহ হারাম পণ্য বেচাকেনার ব্যবসা সাথে জড়িত তারা কখনই ইমামতি, কমিটির সদস্যপদ কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং ট্রাস্টি বোর্ডে থাকার যোগ্যতা রাখে না। কিন্তু সংবিধানের এ ধারার নিয়ম উপেক্ষা করে আগামী ৩ বছর এর জন্য আবারও জোরপূবর্ক একটি অবৈধ কমিটি গঠন করেন। সুদের ব্যবসায় জড়িত তারেক আম্বিয়া যে গত ১৫ বছর ধরে ক্যাশিয়ার পদে বহাল রয়েছে। তিনি যে কোন কিছুর বিনিময়ে এই পদে থাকতে চায়। এ কমিটি সম্পূর্ণ রূপে মসজিদের সংবিধান এবং কোরআন হাদিস বহির্ভূত অবৈধ কমিটি বলে সাধারন মুসল্লিগণ মনে করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।  

মারুফ আরো উল্লেখ করেন, মসজিদের সুচনালগ্নে এশিয়ান গ্রোসারির বেসমেন্ট থেকে প্রথম শুরু হয় ধর্মীয় নানা কার্যক্রম। এ সময় হারুন আহমেদ,জাহেদ চৌধুরী লিটন,দরুদ মিয়া, শরিফুল ইসলাম হেলাল, নজরুল ইসলাম সাদেক এবং সাবেক ইমাম আনোয়ার হোসেনসহ অনেকেই মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ম্যানচেস্টারের অরেঞ্জ হলের এক অনুষ্ঠানে এশিয়ান গ্রোসারির সাবেক মালিক শরিফুল ইসলাম হেলালের মা প্রথম ১০০ ডলার দান করে মসজিদ প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন। মসজিদ প্রতিষ্ঠার পরে বর্তমান কমিটির লোকজন বিভিন্ন সুকৌশলে প্রতিষ্ঠালগ্নের কর্মকর্তাদের কমিটি থেকে বাদ দেন এবং বিভিন্ন শরিয়ত বিরোধী কার্যকলাপের কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় কমিটির পদ ছেড়ে দেন।

বতর্মান কমিটির নিকট সংবিধানের কিছু অনৈসলামিক এবং অসংলগ্ন বিষয় সংশোধনের জন্য গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ সভায় লিখিত ভাবে ৮৩ জনের স্বাক্ষরিত একটি আবেদন দাখিল করা হয়। 

উল্লেখ্য, গত বছর ১২ অক্টোবর মসজিদ কমিটির বর্তমান কোষাধ্যক্ষ তারেক আম্বিয়া সাবেক পেশ ইমাম জোবায়ের আহমেদকে অকারণে লাঞ্ছিত করেন। উক্ত ঘটনাটি কানেকটিকাটসহ উত্তর আমেরিকায় ব্যাপকভাবে প্রচার হলে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ মুসলমান কমিউনিটিতে প্রচুর সাড়া পড়ে। অনেকেই এ ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করেন।

২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে বায়তুল মামুর মসজিদের পেশ ইমাম ও মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা জোবায়ের আহমেদ প্রতি সপ্তাহের ন্যায় মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস করাচ্ছিলেন। মাদ্রাসার নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে আসার কথা থাকলেও প্রায় ১৫/২০ মিনিট বিলম্বে নিজ সন্তানকে নিয়ে আসেন মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ তারেক আম্বিয়া। তিনি দরজার কড়া নাড়তে থাকেন। ভেতর ক্লাস চলছিল তাই কড়ার শব্দ বুঝতে পারেননি ইমাম জোবায়ের আহমেদ। দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় ইমামের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তারেক আম্বিয়া। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকেন ইমামকে। ইমাম তাকে ভদ্রভাবে কথার বলার অনুরোধ করলে তিনি আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, এক পর্যায়ে তারেক ইমামকে পশুর সঙ্গে তুলনা করেন। এর কারণে ইমাম জোবায়ের আহমেদ চরম লাঞ্ছিতবোধ করেন। মনকষ্ট নিয়ে নিজ বাসায় ফিরে যান ইমাম। ওইদিন থেকে তিনি আর মসজিদে আসেননি। পরে অন্য আরেকজন ইমামকে নিয়োগ দেয়া হয়।

মসজিদ কমিটির বর্তমান কোষাধ্যক্ষ তারেক আম্বিয়ার ভাই তৌফিফুল আম্বিয়া টিপু তার একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমেও ম্যানচেস্টার প্রবাসী বাংলাদেশি মুসল্লিদেরকে ‘শয়তান’ বলে গালাগালি করেন। নিচে তার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

Hits: 38


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ