ছাত্রলীগে বিদ্রোহ: যা বলছেন পদবঞ্চিতরা

Pub: মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৯ ১১:১৯ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৯ ১১:১৯ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্মেলনের প্রায় একবছর পর ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (১৩ মে) কমিটি ঘোষণার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পদবঞ্চিতরা। এসময় ঢাবিতে সংগঠনের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নারীকর্মীসহ আহত হন ১০ জন। দুইগ্রুপের এই সংঘর্ষের পর থেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে চরম দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে। হাতাহাতি সংঘর্ষের পাশাপাশি সোশাল মিডিয়ায় চলতে থাকে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি। সব মিলিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠনটি।

তারা দাবি করেন, সোমবার (১৩ মে) ঘোষিত ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বিতর্কিত অনেকে পদ পেয়েছেন। ঘোষিত এই কমিটিতে অছাত্র, ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মী, বিবাহিত, নতুন (আগে কোনও পদে ছিল না) ও বিতর্কিতদের স্থান দেওয়া হয়েছে। তার একদিন পর কয়েকজনের নামও প্রকাশ করেন তারা।

জানা গেছে, পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে অধিকাংশই আগের কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের অনুসারী। ছাত্রলীগের গত সম্মেলন হতে দেরি হওয়ায় সোহাগ-জাকিরের প্রতি কিছু নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারা সম্মেলন দেওয়ার দাবি করলে তাদের ওপর সোহাগ-জাকিরের অনুসারীরা তখন কয়েক দফা হামলা চালিয়েছিলেন।

মধুতে হামলার শিকার যারা

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা, ছাত্রলীগের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক ও ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদার, গত কমিটির প্রচার সম্পাদক সাঈফ বাবু, ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক তানভীর ভুঁইয়া শাকিল, ডাকসুর সদস্য ও কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভীন, সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক ও রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বিএম লিপি আক্তার হামলার শিকার হন। চেয়ারের আঘাতে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশার মাথা ফেটে যায়।

যাদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ

ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর অনুসারীরাই হামলা চালিয়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, ঘোষিত কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরানের নেতৃত্বেই এই হামলা হয়েছে। তবে হামলা করার কথা ইমরান অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত থাকলেও তিনি হামলায় অংশ নেননি। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।

হামলার শিকার ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বিএম লিপি আক্তার বলেন, আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে মূলত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে। তাদের অনুসারী সদ্য পদপ্রাপ্ত যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান আল ইমরানের নেতৃত্বে একাত্তর হলের ফাহিম হাসান, অমর একুশে হলের অনু আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

হামলার বিষয়ে বিজয় একাত্তর হল সংসদের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ফাহিম হাসান ও অমর একুশে হলের অনুর মোবাইলে একাধিকার ফোন দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি।

যেভাবে বিরোধের সূচনা

গত কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সায়েম খান সেই সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন জাকির-সোহাগের বিলাসী জীবন, টাকার ভাগাভাগি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এরপর এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

এ ঘটনার পরপরই গোলাম রাব্বানী ও সায়েম খানেরা সোহাগ-জাকিরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে সম্মেলন দেওয়ার দাবি জানান।

অবশেষে ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ ২৯তম সম্মেলন হয়। তবে সম্মেলনের প্রায় আড়াই মাস পর ছাত্রলীগ নতুন নেতৃত্ব পায়। শোভন-রাব্বানীর হাতে নেতৃত্ব তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পদে পেয়েও আন্দোলনে তারা

ঘোষিত কমিটিতে পদ পেয়েও সন্তুষ্ট নন বেশ কয়েকজন। তারা পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলন করে হামলার শিকার হয়েছেন। ‘কাঙ্ক্ষিত’ পদ না পেয়ে আন্দোলনে নেমেছেন ছাত্রলীগের উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার, উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ফরিদা পারভীন এবং উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিএম লিপি আক্তার।

মধুর ক্যান্টিনে মারধরে আহত ছাত্রলীগের ‘পদবঞ্চিত’ কয়েকজন ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

ছাত্রলীগের ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি বাতিল করে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন কমিটি গঠনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন পদ না পাওয়া নেতাকর্মীরা। এই দাবি না মানা হলে অনশন, বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানান তারা। মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন তারা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন পদবঞ্চিত এই নেতাকর্মীরা।

পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের ভাষ্য

পদবঞ্চিত হওয়া গত কমিটির প্রচার সম্পাদক সাঈফ বাবু বলেন, যারা সোহাগ-জাকিরের সঙ্গে রাজনীতি করেছে, তাদের কেউ এই কমিটিতে কোনও পদ পায়নি। অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে ‘মাইনাস’ করা হয়েছে। আবার এমনও আছে যারা মাঠে ছিল না; এখন দেখছি কমিটিতে বড় পদ পেয়েছে।

শোভন-রাব্বানী স্বজনপ্রীতি করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাঈফ বাবু বলেন, মাদারিপুর জেলার অনেক নেতাকর্মী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ছাত্রলীগের সভাপতি শোভনের ভাইকে এ কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে। এটা কোনও আদর্শ কমিটিতে হতে পারে না। আমরা এই কমিটি মানি না, আপার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে আমরা অনুরোধ জানাবো এই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হোক।

তবে মঙ্গলবার দুপুর ৩টার দিকে শোভন ও রাব্বানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানে শোভন বিবাহিতদের কমিটিতে স্থান দেওয়ার অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তা সত্ত্বেও তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কমিটি করে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন, কিছু দিন পর কমিটি বর্ধিত করে যোগ্যদের নিয়ে আসা হবে।

আর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজিম উদ্দীন বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ৩০১ সদস্যের একটি তালিকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়েছেন৷ তারা আবার সেটি প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছেন৷ প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাচাই করার পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন৷ এখানে বিতর্কিত কমিটি হওয়ার কোনও সুযোগ নেই৷

তিনি বলেন, ছাত্রলীগ একটি বৃহৎ সংগঠন৷ সে অনুযায়ী পদের সংখ্যাও কম৷ তাই সবাইকে পদ দেওয়া যায়নি৷ যারা যোগ্য, ত্যাগী তাদের পদ দেওয়া হয়েছে৷ আপার সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে চলা উচিত।

বিতর্কিতদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সংঘর্ষের ঘটনার দুইদিন পর শোভন-রাব্বানীকে গণভবনে তলব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় তিনি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া বিতর্কিতদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করার নির্দেশ দেন।

অভিযুক্ত বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা ও মাদক মামলার আসামিদেরকে চিহ্নিত করে তাদের পদ বিলুপ্তির আওতায় এনে ত্যাগীদেরকে পদায়নের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।

এবিষয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি বলেন, নেত্রীর নির্দেশই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত। ছাত্রলীগকে বিতর্কমুক্ত করতে কাজ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে সোমবার (২০ মে) পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদবঞ্চিত হয়ে আন্দোলন করে বহিষ্কার হওয়া সংগঠনটির বিগত কমিটির সদস্য জারিন দিয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

সম্মেলনের ১ বছর পর ঘোষিত সংগঠনের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৯৯ জনের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ জানায় পদবঞ্চিতরা। বিতর্কিতদের মধ্যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়েছিল ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণে বুধবার রাতে ২৪ ঘণ্টার সময় নিয়েছিল তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি সংগঠনটি। এর ফলে পদবঞ্চিত নেতারা তদন্ত কমিটির উপর আস্থা রাখতে পারছেন না । তদন্তের কাজ শেষ করার কথা বলা হলেও বঞ্চিতরা বলছেন তাদের সঙ্গে কমিটির কেউ কোন কথা বলেনি। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমান বলছেন অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। প্রয়োজনে আবার তদন্ত করা হবে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহ- সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, তদন্ত কাজ শেষ। যাদের সঙ্গে মূলত কথা বলা দরকার, আমরা কিন্তু সবার সঙ্গে কথা বলেছি।’

এদিকে, ঢাবি’র রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বিএম লিপি আক্তার বলেন, ২৪ ঘন্টা সময় নেয়ার পর অনেক সময় চলে গেছে। তদন্ত কমিটি আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো যোগাযোগ করেনি এবং অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে, তাদের সঙ্গেও কথা বলেনি।’

ঢাবি’র কুয়েত-মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভীন বলেন, যেদিন হামলা হয়, সেদিন আমি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি নির্যাতনের সম্মুখীনও হয়েছি। কিন্তু আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।

তদন্ত কমিটি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রভাবিত দাবি করে বলা হচ্ছে পুর্ণগঠনেও তাদের আস্থা নেই।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ