লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ

Pub: বৃহস্পতিবার, মার্চ ৮, ২০১৮ ৭:১২ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, মার্চ ৮, ২০১৮ ৭:১২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বিভাগীয় শহর সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা সফরকালে আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতায় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার দলের প্রতীক নৌকায় ভোট চেয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী এসব সভায় গত ৯ বছরে তার সরকারের উন্নয়ন কাজের বর্ণনা দেন এবং বলেন- জনগণের ভোটে তার দল আগামী নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় এলে উন্নয়নের গতি আরও বেগবান হবে। সরকারি খরচে এসব সফরে গিয়ে দলের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভোট চাওয়া কতটা আইনসঙ্গত ও নৈতিক এবং তা নির্বাচনে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির প্রক্রিয়াকে কিভাবে বাধাগ্রস্ত করবে- এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও সুশীল সমাজসহ অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা যায়নি এবং ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকার নির্বাচনে পরাজিত হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকলেও এবং তাদের বিজয় সম্পর্কে কোনো সন্দেহ না থাকলেও আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র ও ভয়ভীতির আশ্রয় গ্রহণ করে বলে অভিযোগ উঠেছিল।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় স্বার্থে পত্রপত্রিকা, রাষ্ট্রীয় রেডিও-টেলিভিশন ও যানবাহনসহ পুরো প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে। কোনো কোনো আসনে বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে ১১টি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না (মওদুদ আহমদ; সাউথ এশিয়া ক্রাইসিস অব ডেভেলপমেন্ট : দ্য কেস অব বাংলাদেশ)। নির্বাচন কমিশন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের ২৯৩টিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করেছিল।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতির স্থলে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দু’জন সামরিক শাসক সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে প্রায় ১৫ বছর দেশ শাসন করেন। বেসামরিক পোশাকে রাজনৈতিক দল গঠন করে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, সেসব নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তারা মাঠ প্রশাসনসহ পুরো প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করেন।

নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। জনগণ সহজেই বুঝতে পারে যে, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে পরিচালিত হচ্ছে নির্বাচন। ফলে এসব নির্বাচনের ফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। নির্বাচনের ফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

রাজনীতিকদের মধ্যে সৃষ্ট পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে প্রবর্তিত হয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও এ সরকার ব্যবস্থা চালুর জন্য ১৯৯৪-৯৬ সময়কালে আন্দোলনকারী ও জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগকারী তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে দাবি মানাতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট এবং জোটের বাইরে ৯টি সমমনা দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। ফলে নির্বাচন অনেকটা একদলীয় রূপ নেয়। একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে আবার সরকার গঠন করলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

তাছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত বিধান প্রবর্তন করে। এতে বলা হয়- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এতে আরও বিধান করা হয়- সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকালে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় জাতীয় সংসদের কম-বেশি ৯০ ভাগ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা (তাদের অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন) ক্ষমতায় থাকবেন এবং তাদের অধিকাংশই দলীয় প্রার্থী হবেন। তাছাড়া কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত বা মনোনীত প্রার্থীরা এসব নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন।

গত বছরের মাঝামাঝি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধি সংসদ ভেঙে দিয়ে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সুপারিশ করেছেন, সরকার তা মেনে না নিলে সংসদের তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনে অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় আওয়ামী লীগের সমর্থন বা মনোনয়নে অনেকটা একচেটিয়াভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রভাবমুক্ত হয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ নিয়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সব বিরোধী দলই উদ্বিগ্ন।

সরকারি খরচে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি খরচে ভোট চাওয়াকে ‘অনৈতিক এবং বেআইনি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে সভা-সমাবেশে তার দলের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভোট চাওয়া কেন অনৈতিক এবং বেআইনি তার কোনো ব্যাখ্যা মওদুদ আহমদ প্রদান করেননি। এদিকে বিএনপি নেতার সমালোচনার জবাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোট চাইছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নৌকায় ভোট চাওয়ার অধিকার তার আছে।

এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে ওবায়দুল কাদেরকে যে বিষয়টি স্মরণে রাখতে হবে তা হল- শেখ হাসিনা দুটি পৃথক সত্তা নন এবং তার প্রধান পরিচয় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষ শেখ হাসিনার কোনো কথাবার্তা ও কাজকর্মকে আওয়ামী লীগের সভাপতির কথাবার্তা ও কাজকর্ম হিসেবে বিচার-বিশ্লেষণ করে না, করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা ও কাজকর্ম হিসেবে।

স্বাধীনতার পর থেকে যে বিষয়টি বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হল- ক্ষমতাসীনদের সরকারি কাজ ও দলীয় কাজের মধ্যে পার্থক্য না করার মানসিকতা। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে আমরা আগেও দেখেছি এবং এখনও দেখছি- ক্ষমতায় থাকা দলের নেতাকর্মীরা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা আদায়ের জন্য কিভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা দলের প্রধান সরকারপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হন। দেশের দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপ্রধানরা তিন দশকের বেশি সময় ধরে দল দুটির নেতৃত্বে রয়েছেন। তারা উভয়ে তিনবার করে প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালে তারা রাষ্ট্রীয় কাজ ও দলীয় কাজের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে চান না। দলীয় কাজে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ভ্রমণে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার পূর্ণ ব্যবহারে কুণ্ঠাবোধ করেন না। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও সংসদীয় সরকারব্যবস্থার অনুসারী আমাদের পাশের দেশ ভারতের কংগ্রেস ও বিজেপিতে দলীয়প্রধান ও সরকারপ্রধান পদে আলাদা আলাদা ব্যক্তিরাই অধিষ্ঠিত হয়ে আসছেন। এতে সরকার ও দলীয় কাজে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা সহজ হয়ে উঠেছে। আমাদের বড় বড় দলগুলো এ থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেননি।

এটা ঠিক, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা তাদের দলের পক্ষে ভোট চাইতে পারবেন কিনা হালনাগাদ সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ সে ব্যাপারে কিছু বলা নেই। তাই পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী সরকারি দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর ব্যাপারে বিএনপির অভিযোগের জবাবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, এ ব্যাপারে এখন তাদের কিছু করণীয় নেই। তবে এখানে যে প্রশ্নটি এসে যায়, তা হল নৈতিকতার।

প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা যখন রাষ্ট্রীয় খরচে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন, তখন দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পাচ্ছে না। সরকারের উচিত হবে কমিশন কর্তৃক নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপিসহ সব বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতা দেয়া। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন নির্বাচনকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে।

নিশ্চিত করতে হবে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত আচরণ বিধিমালা যেন সরকারি দলসহ সব দল পুরোপুরি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে। তা না হলে অতীতে দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মতো আগামী সংসদ নির্বাচনেও সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি সম্ভব হবে না। ফলে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে না।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1145 বার