কোটা বাতিল: ব্যথা সারাতে মাথা কাটা

Pub: শনিবার, মে ১২, ২০১৮ ৭:৫৮ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, মে ১২, ২০১৮ ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রোকেয়া লিটা : সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকুরিতে নিয়োগে কোটা তুলে দেয়ার কথা শুনে মনে হলো, মাথা ব্যথা সারাতে গিয়ে মাথা কেটে ফেলার কথাই ভাবা হচ্ছে।

সরকারি চাকুরিতে এই কোটা তুলে দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নারীরা। অনেকেই হয়তো বলবেন, নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা বলে নারীরা আবার সরকারি চাকুরিতে কোটা চায় কেন ?

হ্যাঁ, আমরা নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা বলি বলেই সরকারি চাকুরিতে কোটা চাই। কারণ, প্রকৃতি পুরুষকে নারীর সমান হতে দেয়নি, জন্মগত ভাবেই নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি দায়-দায়িত্ব এবং যোগ্যতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। কাজেই, সেই যোগ্যতার কথা ভেবেই চাকুরিতে নারীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং নারীর জন্য কোটা রাখতে হবে।

আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে একটা মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই শুরু হয় বিয়ের জন্য তাড়াহুড়া। আর ওদিকে ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই পরিবার থেকে আসে রোজগার করার চাপ।

দেখা যায়, অনার্স পাশ করার পরপরই বেশিভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় আর ওদিকে ছেলেরা কোনো না কোনো চাকুরিতে ঢুকে যায়। এরপর শুরু হয় বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া।

যে সময়টায় একটা ছেলে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি আমলা হওয়ার প্রস্তুতি নেয়, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের বেশিভাগ মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে রান্না বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির মন জুগিয়ে সংসার সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কেউ কেউ এরই মধ্যে গর্ভধারণও করছে। আর একবার সন্তানের মা হলেই হলো, বিসিএসের প্রস্তুতি বা চাকুরি সবকিছুকে ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সন্তানের লালনপালন।

এই দায়িত্ব এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার নয়, মা হওয়ার পরে নবজাতকের পেছনে ২৪ ঘন্টা ব্যয় করতে হয় একজন নারীকে। ঠিক এখানেই পুরুষ নারীর তুলনায় অযোগ্য।

ওই যে বলেছিলাম শুরুতে, প্রকৃতি পুরুষকে নারীর সমান হতে দেয়নি, পুরুষ সন্তানকে নিজের গর্ভে ধারণ করতে পারে না। হ্যাঁ, নবজাতকের পেছনে বাবাকেও অনেক শ্রম দিতে হয়, কিন্তু মা ছাড়া যে চলবে না।

আমি মা হওয়ার পরে দেখেছি, আমার বর বাচ্চার গোসল করানো, তেল মাখানো, ন্যাপি বদলে দেয়া থেকে শুরু করে প্রায় সবই করে, কিছু ক্ষুধা লাগলেই সে বাচ্চাকে আমার কাছে আনতে বাধ্য হয়, তার আফসোস সে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না! কারণ, প্রকৃতি পুরুষের শরীরে নবজাতকের জন্য খাবার তৈরি হওয়ার ক্ষমতা দেয়নি।

ঠিক এই অবস্থানে এসে একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে একই পাল্লায় মাপবেন কী করে? দুজনের যোগ্যতা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায় কী হলো? এই একটি যোগ্যতার কারণে নারী অসামান্য একজন মানবী হয়ে উঠলেও, বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের সমান সময় ব্যয় করতে পারছে না।

ফলে, বিসিএস পরীক্ষায় এদের কেউ কেউ হয়তো পিছিয়ে যাচ্ছে, এটাই স্বাভাবিক। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে, এই মেয়েগুলো মেধাবী নয়। তারা অবশ্যই মেধাবী, কেননা পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে দেখুন ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাশের হার বেশি।

সাংসারিক, পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণেই হয়তো চাকুরির পরীক্ষায় মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে। তাদেরকে পেছনে রেখে সত্যিকারের মেধা অন্বেষণ আদৌ কি সম্ভব? তবে, এই বৃত্তের বাইরেও নারীর আরও একটি রূপ আছে।

সরকারী চাকুরীতে অগ্রাধিকার এবং তাদের জন্য কোটা রাখার দাবীতে অনেক নারী সোচ্চার।
যেমন, যারা পরিবার, সংসার, সন্তান সামলানোর মধ্যে নেই, তারা ঠিকই পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিতে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে, এমনকি মেয়েদের জন্য কোটাকে তারা এক ধরণের অপমানও মনে করছে। কিন্তু, আমরা নিশ্চয়ই পরিবারবিহীন কোনো সমাজ চাই না, চাই কি?

এবার আসুন দেখি, বিসিএস পরীক্ষায় কোটা তুলে দিলে মেয়েরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আমার খুব কাছের চারজন বান্ধবী বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকুরি পেয়েছে। এদের তিনজনই অনার্স শেষ করার পরপরই বিয়ের পিড়িতে বসেছে এবং এর বছর দু-এক পরেই তারা মা হয়েছে। এত দায়-দায়িত্ব মাথায় নিয়েও কষ্ট করে তারা বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। নারী কোটা তাদের সেই প্রস্তুতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং আজ তারা সরকারি আমলা।

আমার চতুর্থ বান্ধবীটি মাস ছয়েক হলো বিয়ে করেছে, সন্তান ধারণ আরও পরের কথা। অথচ, বয়স কিন্তু থেমে নেই, ৩৫ এর পরে মেয়েদের সন্তান ধারণ নিয়ে নানা রকম ঝক্কি-ঝামেলার কথা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। কোটা তুলে দিলে, আমার একজন মাত্র বান্ধবীই হয়তো বিসিএস পরীক্ষায় টিকে থাকতো, বাকি তিনজনই হয়তো ঝরে পড়তো।

এবার আসুন বেসরকারি চাকুরির কথা ভাবি।

বিসিএস পরীক্ষায় তথাকথিত মেধার লড়াইয়ে হেরে গিয়ে যে মেয়েগুলো সরকারি চাকুরি পাবে না, তারা কোথায় যাবে? নিশ্চয়ই তারা বেসরকারি চাকুরির কথা ভাববে।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে মেয়েরা আসলে কতটা স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারে? কয়টা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঠিক মতো, মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়? কয়টা প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে দুইদিন ছুটি দেয়? মা হওয়ার সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইতে গেলেই অনেক মেয়েকে চাকুরি খোয়াতে হয়।

রাষ্ট্র যেহেতু বেসরকারি খাতে মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়টি তদারক করতে পারছে না। অতএব রাষ্ট্রকেই মেয়েদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিতে হবে। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে নারীকে বেকার রেখে কখনই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তাছাড়া, সমঅধিকার বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? একজন লম্বা এবং একজন খাটো মানুষকে একই সময়ে একটি উঁচু দেয়াল টপকে পার হতে দেয়া নিশ্চয়ই সমঅধিকার নয়। সমঅধিকার হলো, খাটো মানুষটিকে একটা মই দিয়ে সাহায্য করা যেন সে লম্বা মানুষটির সমান হতে পারে এবং তারপর একসাথে দেয়াল টপকাতে পারে।

বিসিএস পরীক্ষায় নারীর জন্য কোটা তেমনই একটি মই যার মাধ্যমে নারী সরকারি চাকুরিতে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করে বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে পুরুষের সাথে সমান তালে নিজেদের যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে। আশা করি, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকুরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী কোটা তুলে দেয়ার আগে সরকার দ্বিতীয়বার ভাববে।লেখক-সাংবাদিক, সিঙ্গাপুর


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1154 বার