ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে আলী রীয়াজের নিবন্ধ ঢাকায় ন্যায় বিচারের খোঁজে

Pub: বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণদের সপ্তাহব্যাপী নজিরবিহীন বিক্ষোভ শেষ হয়েছে। প্রতিবাদী তরুণ ও সাংবাদিকদের ওপর আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থা ও সরকার দলীয় কর্মীদের সহিংসতা একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে সফল হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করেছে। আপাতদৃষ্টিতে আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের সমালোচনা করার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত ২০ শিক্ষার্থী এখন বিচারের অপেক্ষায় জেলে বন্দি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনকে সমর্থন দেয়ার কারণে শ’ শ’ তরুণ টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, তারা গুজব ছড়িয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে: এরপর কি?

২৯শে জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে কলেজ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে পরিণত হয়। যা দেশজুড়ে হাজার হাজার তরুণকে রাস্তায় নামিয়েছে। মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি, স্কুল বন্ধ ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের রাস্তা থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানানো ও ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেয়া সহ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পরও ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে।

সুশৃঙ্খল আন্দোলন, তরুণদের দৃঢ় মনোভাব, জনসমর্থনের মাত্রা ও নিরাপদ সড়কের দাবি ব্যাপক হয়ে শাসন ও জবাবদিহিতার দাবিতে রূপ নেয়া দেখে সরকার ও শাসক দল দ্রুত তাদের মত বদলিয়ে চিরাচরিত কৌশল অনুসারে আন্দোলনে অনুপ্রবেশের জন্য বিরোধীদলকে দোষারোপ ও বল প্রয়োগ করতে শুরু করে। আন্দোলনের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ও জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে আসে, তখন অনেকের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক হয় যে, এটা রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তরুণদের তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ কিনা। নির্বাচনের বছরে এমন আন্দোলনে পরিষ্কারভাবেই সরকারি দল অস্বস্তিতে ছিল।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামের একটি ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা আন্দোলনকারী ও সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করেছে। ৫ই জুলাই পুলিশ ও হেলমেট পরা তথাকথিত ছাত্রলীগ সমর্থকদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং চারজন নারী আন্দোলন-বিরোধীদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ভাইরাল হয়ে যাওয়া এই গুজবে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পায়।

সরকার ও এর সমর্থকরা অভিযোগ তুলেছে যে, বিরোধী দল বিএনপি ও এর মিত্র জামায়াতে ইসলামী দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ গুজব ছড়িয়েছে। তারা পার্শ্ববর্তী আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা চালানোর জন্য শিক্ষার্থীদের প্ররোচিত করার জন্য এমনটি করেছে। কিন্তু বিএনপি ও এর মিত্ররা আন্দোলনের সঙ্গে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া, বিশেষ করে ছাত্রলীগের কর্মী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মোতায়েন করার বিষয়টি নতুন না।

২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে গত বছরগুলোতে, পুলিশ ও শাসক দলের কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এপ্রিল থেকে চলা কোটা সংস্কারের দাবিতে তরুণদের আন্দোলন একই আচরণের সম্মুখীন হয়েছে। অরাজনৈতিক এই আন্দোলনের কয়েকজন নেতা বর্তমানে ৫৭ ধারায় আইসিটি আইনে জেলে রয়েছেন।
এর মধ্যেই ৫ই আগস্ট আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরস্কারজয়ী আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে সাদা পোশাকের কিছু মানুষ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তোলা হয়, তার বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা ধ্বংস করা হয়, তাতে ধারণকৃত ফুটেজও জব্দ করা হয়। পরেরদিন তাকে খালি পায়ে আদালতে তোলা হয়। এ সময় তাকে অসুস্থ দেখা গেছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আদালতে যাওয়ার সময় তিনি অভিযোগ করেন যে, পুলিশ কাস্টডিতে তাকে আঘাত করা হয়েছে এবং আইনি সহায়তা নেয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।

তাকে ৫৭ ধারায় আইসিটি আইনে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী যে কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার জন্য সরকারকে অনুমতি দিয়েছে। আদালত তার জামিন আবেদন বাতিল করে দেন এবং তাকে রিমান্ডের জন্য পুলিশ কাস্টডিতে পাঠানো হয়।

মূলত, শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার ও পুলিশের কাছে তিনি যে আচরণের শিকার হয়েছেন, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। গত বছরগুলোতে অনেকেই এ রকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এটা দেশের প্রশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলোর ক্ষমতা হ্রাস ও ভিন্নমত চুপ করানোর প্রতি সরকারের ঝোঁক, বিচারিক ও বিচার বহির্ভূত ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে বিরোধী দল ধ্বংসকরণ, গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করা এবং বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও জোরপূর্বক গুম দেখেও না দেখার ভান করা দেশের প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীরা যখনই রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে, ক্ষমতাসীন দল ধরে নিয়েছে তারা আন্দোলন দমন করতে সক্ষম হয়েছে। এই আন্দোলনের পেছনে জনরোষের কারণ না খুঁজে তারা গুজব রটনাকারীদের গ্রেপ্তারে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে। কিন্তু আন্দোলনের সময় পুলিশের সামনে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের উপরে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ছাত্রলীগের কোনো সদস্য জড়িত আছে কিনা তার প্রমাণ দিতে হবে। যদিও প্রচুর প্রতিবেদন ও ভিডিওফুটেজ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরাই এ হামলার সঙ্গে জড়িত, তাও তিনি এ দাবি করছেন।

কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যবিহীন একটি সামাজিক আন্দোলনকে যেভাবে কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছে তাতে সহজেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে দুই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। গত কয়েক বছরের আচরণ থেকে বোঝা যায়, সরকার আরো কঠোরভাবে ক্ষমতা আগলে রাখার চেষ্টা করবে। তখন সরকার, এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, গণমাধ্যমের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং সহিংসতা উস্কে দেয়ার কারণ দেখিয়ে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করবে। পাশাপাশি সকল আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে শহিদুল আলমকে আটকে রাখবে ও আটক ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকার দেশের জনগণের কাছে স্পষ্ট একটা বার্তা প্রদান করবে যে, কোনো ধরনের ভিন্নমত পোষণ সহ্য করা হবে না। এটা হয়তো সরকারকে সাময়িকভাবে লাভবান করবে। কিন্তু ভবিষ্যতে তরুণদের তীব্র বিরোধী মনোভাবের কারণে এ ধরনের রাজনীতির দাম পরিষোধ করতে হবে।

আর দ্বিতীয়ত: যেটা হতে পারে, সরকার হয়তো বুঝতে পারবে এই আন্দোলনটি বিরোধী দলের কোনো চক্রান্ত নয় বরং এটি দীর্ঘকালীন জন অসন্তোষের ফল। এতে সরকার তার দমনমূলক আচরণ থেকে সরে আসবে। এতে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা, ভিন্নমত পোষণ, বাক স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্র্ণ সমাবেশের রাস্তা খুলে যাবে। এখন শাসকদল আওয়ামী লীগ কোন রাস্তাটা বেছে নেবে- সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে তাদের উপরে।

(ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ। লেখক যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্মেন্ট বিভাগের শিক্ষক)।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1129 বার