ঢাকার যুদ্ধ

Pub: শনিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৮ ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৮ ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

সুহাস চাকমা :
বাংলাদেশে বিপজ্জনক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিবাদে গত ২৯শে জুলাই থেকে চলা ছাত্রদের বিক্ষোভ শেষ হয়েছে। এটা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এক্ষেত্রে সাগ্রহে চিরাচরিত অ্যাকশন শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। অজ্ঞাত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অন্তত ২৯টি মামলা করেছে। অথচ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর হামলাকারী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ জানালেও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রথমে আগ্রাসী ও ধ্বংসাত্মক ছিল। পরে তারা সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের, বিশেষ করে যে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছে তাদের পরিবারকে অর্থের বিনিময়ে কিনে নেয়ার চেষ্টা করে এবং ঢালাওভাবে বিভিন্ন অঙ্গীকার করে। যদিও কেউ তাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করেনি। যখন সরকারের এসব পদক্ষেপ নিষ্ফল হয়ে পড়ে এবং জনগণের সমর্থনে আন্দোলন আরো তীব্র হয়, সরকার আন্দোনকারীদের ওপর আক্রমণ করে। এটা ছিল সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর আক্রমণ। আন্দোলনকারীদের ওপর নিয়মিত লাঠিচার্জ করা হয়, টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়া হয়। এতে শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়। উদ্বেগজনকভাবে, রামদা, লাঠিসোটা ও রডের পাইপ দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। অতীতেও তারা এমনটি করেছে। এসব সরঞ্জাম দিয়ে শিশুদের ওপর যখন হামলা চালানো হচ্ছিল, পুলিশ পাশেই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন পর্যবেক্ষক বলেন, পুরো একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠবে রামদা হাতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দেখে। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে সরকারের সমালোচনা করার পরে বিখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দি অবস্থায় তার ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট দ্বিতীয় দফা তার মেডিকেল পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে।
এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার দায়ে হাজার হাজার তরুণের ওপর যে নৃশংস হামলা ও সহিংসতা চালানো হয়েছে, কোনো কিছুই তা ন্যায্য প্রমাণ করতে পারে না।’ গত ৪ঠা আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়ি বহর অজ্ঞাত গুণ্ডাদের হাতে হামলার শিকার হওয়ার পর সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতি দুর্বল একটি বিবৃতি দিয়েছে। তারা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে কোনো অধিকারের কথা উল্লেখ করে নি। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। আর প্রত্যাশিতভাবে ভারত কিছুই বলেনি।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ও ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারের অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে ওঠার কারণ খুঁজে বের করা কোনো কঠিন বিষয় না। শ’ শ’ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও জোরপূর্বক গুমের কারণে বাংলাদেশে মানবাধিকারের রেকর্ড খুবই খারাপ। ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই বিরোধীদের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু
বাস্তবতা হলো, এই সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন ও দুর্নীতিপ্রবণ শাসন ব্যবস্থা।
বর্তমানে স্বৈরাচারী ভূমিকা আরো জোরদার করতে ও বিরোধীদের ছত্রভঙ্গ করতে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী যুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। সরকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে বিপুল সংখ্যক মামলা দিয়ে রেখেছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রথম আলোর দেয়া হিসাব অনুযায়ী বিএনপির ৪ লাখ ৩ হাজার ৮৭৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে প্রায় ২১ হাজার মামলা করা হয়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে বিএনপি দাবি করে, তাদের প্রায় ১৭ হাজার ৮৮৫ জন নেতা-কর্মী জেলে বন্দি রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও জেলে রয়েছেন। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সহিংসতা হ্রাস পায়। ফলে আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা একচেটিয়া আধিপত্য লাভ করে। তাদের সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে আরো ক্ষমতা ও দায়মুক্তি দেয়া হয়। এই ক্ষমতা সন্ত্রাসবাদ বা মাদকের বিরুদ্ধে প্রয়োগ না করে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ করতে ব্যবহার করা হয়।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে এসব অস্থিতিশীল নীতির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব কমই মনোযোগ দিয়েছে। ভোট দেয়া জনগণের বড় অংশকে বাদ দিয়ে টিকে থাকা যায় না। এসব নীতির চূড়ান্ত পরিণতি হলো বিক্ষোভ। আর বাংলাদেশের বিক্ষোভ হলো সহিংস। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১ লাখ ২৬ হাজার ৩০০ মানুষ। আওয়ামী লীগ সরকার যদি বৈধ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বন্ধ করতে অবৈধ সহিংসতার ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তাহলে অপরিহার্যভাবে আন্দোলন আরো সহিংস হয়ে উঠবে। এবং তাতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম যুক্ত হয়ে পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তা অপরিহার্য মনে হচ্ছে।
এ বছরের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ভারত এসব বিষয় ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। দীর্ঘ মেয়াদে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের এই মেকি আচরণ বন্ধ করা দরকার। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিক্রিয়া খুবই পরিষ্কার। তারা নিজেদের আইনই মেনে চলে না। একই সঙ্গে সহিংসতার বিষয়ে সরকার নাগরিকদের একটি আতঙ্কজনক বার্তা দিয়েছে। সরকার দেশের যুব সমাজকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, সহিংসতাই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান। পরিষ্কারভাবে, বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে না। বরং এমন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে যা সন্ত্রাসবাদের লালন-পালন করে।
(ব্যাংকক পোস্টে প্রকাশিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। লেখক মানবাধিকার সংস্থা এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ও রাইটস অ্যান্ড রিস্ক অ্যানালাইসিস গ্রুপের ডাইরেক্টর)

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1086 বার

আজকে

  • ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ১৩ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 
 
 
 
 
আগষ্ট ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জুলাই   সেপ্টেম্বর »
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com