ইলেকট্রনিং ভোটিং মেশিন নয়, ফলাফল কারচুপির মেশিন চালু করতে চাচ্ছে হুদা!

Pub: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ ৪:১০ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ ৪:১১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামসুল আলম

বাংলাদেশে যেটা চালু করতে চায় ইলেকশন কমিশন, সেটা কেবল বাটন টিপে ভোট কারচুপির মেশিন। এতে প্রতি ক্যান্ডিডেটের জন্য একটা বাটন থাকে। কেউ বাটন চেপে দিলে ভোট কাউন্ট হয়ে গেলো। কিন্তু প্রোগ্রাম বদলে দিলেই যে মার্কাতেই ভোট দেয়া হোক, সবভোট নৌকায় কাউন্ট দেখানো সম্ভব। কাজেই এটি ভোটের মেশিন নয়, বরং ভোট ডাকাতির মেশিন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে যে ইলেকট্রনিং ভোটিং মেশিন ব্যবহার হয়, তাতে ভোট দিতে হলে প্রথমে ব্যালট পেপারে কলম বা পেন্সিল দিয়ে বৃত্ত পূরণ করতে হয়। সেই ব্যালট পেপার মেশিনে স্কেন করে ভোট কাউন্ট করা হয়। পরে ফলাফল প্রকাশ কা হয়। এর ফলে মেশিনের পাশাপাশি প্রতিটি ভোটারের জন্য একটি করে কাগজের ব্যালটও থাকে। এই পদ্ধতিতে জাল জালিয়াতি কম হয়। এ পদ্ধতিতে আগের রাতে সিল পেটানো বা ভোটকেন্দ্র দখল করে সিল মেরে ভোটকাটা কঠিন। যদিও বাইরে থেকে সিস্টেমে ঢুকে এই মেশিনের ফলাফলও বদলে দেয়ার ঝুকি থাকে। তদুপরি আমেরিকান সিস্টেমটা তুলনামূলক নিরাপদ।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দু’মাস আগে গত সপ্তাহে হঠাৎ হুদা কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় (একজন কমিশনারের লিখিত আপত্তির পরও) সামনের নির্বাচনে ইলেকটনি ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে। অথচ এই মেশিন ব্যবহারের কোনো অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নাই, এমনকি এটা কি মেশিন, কোন্ সফটঅয়্যার, নিরাপদ কিনা- তাও নিশ্চিত নয়। এহেন অবস্খায় বর্তমান সরকারী দলগুলি ছাড়া সকল বিরোধী দলের চরম বিরোধিতার মুখে পড়েছে ইভিএম পরিকল্পনা। অন্যদিকে সরকার প্রধানের ইচ্ছাতেই হঠাৎ এই ইভিএম চালু করা হয়েছে এমন খবর পত্রিকার পাতায় দৃশ্যমান। তার মানে এটা পরিষ্কার যে, বর্তমান সরকারী দল ভোটের ফলাফল জালিয়াতি করে ভোটে জেতার লক্ষেই এই ইভিএম নামিয়েছে।

ভারতের ইকোনোমিক টাইমস পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের প্রায় দু’শটি দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশে (ভারত, ভুটান, ব্রাজিল ও ভেনিজেুয়েলা) জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বের ১১টি দেশে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা চালিয়েছে, এবং তাতে ইভিএম মেশিনের ভোট গ্রহন ও ফলাফল প্রকাশে ভয়াবহ রকমের কারচুপি, জাল জালিয়াতি, হ্যাকিং, ও ফলাফল বদলে দেয়ার প্রমান মিলেছে। ফলে এসব দেশে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর কয়েকটি উদাহরন:

১) যুক্তরাষ্ট্রে কিছু রাজ্যে ইভিএম মেশিন ব্যবহার করলেও বড় রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া সহ অধিকাংশ রাজ্যে এটির ব্যবহার অবৈধ ও নিষিদ্ধ। সেখানকার পত্রিকার খবর- “it wouldn’t take much more than ten dollars’ worth of parts from any RadioShack store to steal and manipulate votes. It’s called a man-in-the-middle attack and the computer program that logs the results on electronic voting machines isn’t even compromised. “It’s a classic attack on security devices,” Roger Johnston tells Popular Science. “You implant a microprocessor or some other electronic device into the voting machine, and that lets you control the voting and turn cheating on and off. We’re basically interfering with transmitting the voter’s intent.”

২) আয়ারল্যান্ডে ইভিএম ব্যবহারের উপর পরীক্ষা নীরিক্ষা চালিয়ে ৫১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে অবশেষে এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৩) জার্মানীর সুপ্রিম কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক এবং জনস্বার্ধবিরোধী হওয়ায় অবৈধ ঘোষণা করেছে।

৪) পরীক্ষামূলক ব্যবহার করে ইভিএমে ফলাফল বদলানোর উপসর্গের কারনে ইতালি এবং প্যারগুয়ে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

৫) হলান্ডে নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে পরীক্ষায় ফলাফলে স্বচ্ছতার অভাবে এটি নিষিদ্ধ করেছে ডাচ কাউন্সিল।

৬) যুক্তরাজ্যে ইভিএম নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা করেছে।

৭) সুইজারল্যান্ড, রুমানিয়া, স্পেন সহ কিছু দেশে প্রবাসী ভোট গ্রহনের ক্ষেত্রে পাইলট প্রকল্পে ইভিএম ব্যবহার করা হলেও ইন্টারনেট সিকিউরিটির সমস্যার কারণে তা বাতিল করা হয়।

৮) নরওয়েতে ভোটারের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার অভিযোগে ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

৯) ভারতের ইভিএম জালিয়াতি করে বিজেপি জিতেছে এমন অভিযোগে ব্যালট পেপারে ভোট নেয়ার জন্য দেশজুড়ে দাবী তুলেছে বিরোধী দলগুলো। ভারতীয় পার্লামেন্টে উন্মুক্ত প্রেজেন্টেশেন করে দেখানো হয়েছে কেমন করে ইভিএম দিয়ে ফল পাল্টানো হয়। বিবিসি’র এক রিপোর্টে জানা গেছে, ভারতে মোবাইল মেসেজ দিয়ে হ্যাক করে কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল বদলে দেয়া হয়েছে। এর আগে ভারতের গুজরাটে ইলেক্ট্রনিক ভোটিংয়ে এক কেন্দ্রে ৪৪ জন ভোটার ভোট দিলেও মেশিন কাউন্ট করে ১১১, এক প্রার্থীকে ভোট দিলে আরেকজনের ঘরে জমা হয়, ভোট দেয়ার সময় ল্যাপটপে দেখা যায় কাকে ভোট দেয়া হচ্ছে, এমনকি ব্লুটুথের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় ইভিএম।

১০) বতসোয়ানায় ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ভারত থেকে আনা ইভিএম মেশিন অনিয়মের কারনে বাতি করে ব্যালট পদ্ধতি চালু করতে মামলা করা হয়েছে।

১১) প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামতের প্রেক্ষিতে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যতই আধুনিক হোক না কেনো, ইভিএম মেশিনে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকবেই। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এতে একজন ভোটারের একাধিক ভোট দেয়ার সুযোগ থাকে, অর্থাৎ চুরির অফুরন্ত সুযোগ আছে, এবং ব্যবহারকারীরা চাইলে ফলাফল বদলে দিতে পারেন।

১২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতীয় ও বাংলাদেশী আইটি বিশেষজ্ঞের মতে:
– ইভিএম দিয়ে সহজেই ভোট কারচুপি (ম্যানুপুলেট) করা সম্ভব।
– ইভিএম সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এতে গোপনীয়তা বলতে কিছু থাকে না৷ ভোটারের নাম পরিচিতি এবং কাকে ভোট দিলেন, তা জানার সুযোগ থাকে।
– ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট প্রিজাইডিং অফিসারের হাতে থাকায় তিনি চাইলেই তার পছন্দের প্রার্থীর জন্য ভোট ম্যানিপুলেট করতে পারবেন৷
– ইভিএম-এ ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো পেপারস বা ডকুমেন্ট থাকে না৷ফলে কোনো কারণে যদি মেশিনটি ফেল করে তাহলে সব ডাটা মুছে যাবে৷সেক্ষেত্রে কাস্ট হওয়া ভোট পুনরায় গ্রহণ করা অথবা গণনা সম্ভব নয়৷

১৩) ইভিএম নিয়ে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে ইন্ডিয়া টুডে, তাতে বলা হয়েছে:
– ইভিএম মেশিন বাইরে থেকে হ্যাক করা যায়, এবং ফলাফল বদলে ফেলা সম্ভব।
– চাইলে এক মুহুর্তের মধ্যে ভোটের ফল বদলে দেয়া যায়। একজনের ভোট অন্য জন্যকে দিয়ে পরাজিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা সম্ভব।
– ইভিএম মেশিনের রেকর্ড থেকে কে কাজে ভোট দিয়েছে তা জাো সম্ভব। ফলে ভোটারদের নিরাপত্তা ঝুকি বিদ্যমান।
– মেশিন ব্যবহারকারীরা চাইলে ইচ্ছেমত ফল বদলে দিতে পারেন।
– সফটঅয়্যার বদল বা কন্ট্রোল করে চাইলে নির্বাচন উল্টাপাল্টা করে বা বানচাল করে দিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

১৪) ইভিএম নিয়ে এত বিতর্কের মুখে গতবছর ভেনিজেুয়েলায় এই মেশিন ব্যবহার করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাতে দেখা গেছে, প্রহসনমূলক কারচুপিময় নির্বাচনের জন্য সারা বিশ্ব থেকে নিন্দা ও ধিক্কার ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউনিয়ন ইউনিয়ন, টাইমস, সিএনএন, ইকোনেমিস্ট নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে। ভেনিজুয়েলাতে ইভিএমের প্রযুক্তিগত বিষয়টির দায়িত্বে ছিলো স্মার্টম্যাটিক নামে একটি বৃটিশ কোম্পানী। ভোট শেষে তারা জানায়, একজনের ভোট আরেকজনের ফল হিসাবে দেখানো ঘটনা ঘটেছে, ইভিএমের তথ্য বদলে দিয়ে লাখ লাখ ভোট বাড়ানো হয়েছে। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি ছিল লোক দেখানো, এবং ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। স্মার্টমেটিক চেষ্টা করেও কারচুপি রোধ করতে পারেনি। কেননা সার্ভার ও ইন্টারনেট সিকিউরিটি ছিল স্বৈরাচারী সরকারের নিয়ন্ত্রণে।

১৫) শুধু ভেনিজুয়েলা বা ভারত থেকেই নয়, সারা বিশ্ব থেকেই ইভিএম মেশিনের ব্যবহার নিয়ে অনিয়ম ও কারচুপির খবর আসছে। এঅবস্থার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইলেকশন ডিফেন্স কোয়ালিশন ইভিএম মেশিন ব্যবহারের ৭টি অনিয়ম খুঁজে পেয়েছেন
ক. ইভিএম মেশিন নির্বাচনের আগে টেস্টিংয়ে ঠিক থাকলেও নির্বাচনের দিন দেখা যায় কারচুপি করে পূর্বনির্ধারিত ফলাফল প্রকাশ করছে!
খ. ভোটের দিন কিছু মেশিন খারাপ হয়ে যায়। ফলে ভোটরদের ভোগান্তি হয়।
গ. ভোট দেয়ার সময় ভোটার দেখতে পান সঠিক যায়গায় ভোট যাচ্ছে, কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা যায় সেটি অন্যত্র চলে গেছে!
ঘ. ভোটারদের ব্যালটের হিসাব ইচ্ছা করে ভুল করা হয়।
ঙ. সত্যিকারের যা ভোট পড়েছে, ফলাফলে তা বেড়ে যায় বা কমে যায়।
চ. কারচুপি করে ফল পরিবর্তনের কারনে ভোটারদের পছন্দের প্রার্থীর পরাজয় ঘটে!
ছ. বিতর্ক সৃষ্টির ফলে নতুন করে আবার ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

অনিয়ম ও কারচুপির কারনে সারা বিশ্ব থেকে যখন প্রায় উঠে গেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন- ইভিএম, তখন বাংলাদেশের জনগেনের ভোটের ফল জালিয়াতি করে বর্তমান বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিজয়ী ঘোষণা করতে কোনো প্রকার পূর্বপ্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐক্যমত চাড়াই তাড়াহুড়া করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দু’মাস আগে ইভিএম পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব করেছে নুরুল হুদার দলবাজ ইসি! এক্ষেত্রে আরেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আপত্তি দিয়ে তাদের এই ভোট চুরির ধান্দাটা জনগনের কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন দেশের সকল বিরোধী দল থেকে ইভিএম চালুর চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। উল্লেখ্য, এর আগেও ২০১১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদের মুখে ইভিএম চালুর উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল।

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, শীর্ষ খবর ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1117 বার