নীল ছোবল

Pub: বুধবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮ ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮ ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ম, তানজুম :
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬৬ লাখেরও বেশি মানুষ ইয়াবাসক্ত । এরা প্রত্যেকে দিনে ২টি করে ইয়াবা সেবন করে, যার গড় মূল্য কমপক্ষে ৪০০ টাকা । সেই হিসাবে দিনে ২৬৪ কোটি এবং বছরে ১০০ হাজার কোটি টাকা ইয়াবার পিছনে ব্যয় হচ্ছে- যার সিংহভাগ চলে যাচ্ছে ইয়াবার উৎসভূমি মিয়ানমারে । এখানে ফেন্সিডিল, বিভিন্ন ট্যাবলেট, হিরোইন, প্যথেডিন সহ ইঞ্জেকশান, কোকেন, আফিম, চরস, গাঁজা, এলকোহল আসক্তদের সংখ্যা ও ব্যয় যোগ করা হয়নি ।

বর্তমান পৃথিবীতে যত জটিল ও মারাত্মক সমস্যা রয়েছে. তন্মধ্যে মাদক দ্রব্য ও মাদকাসক্তি সবার শীর্ষে, যা যুদ্ধবিগ্রহের চেয়েও ওভয়ংকর । চাইলেও যুদ্ধ বিগ্রহের মাধ্যমে কোন জাতিকে নির্মূল করা অসম্ভব; যা কিনা মাদকতার মাধ্যমে সম্ভব ও সহজ কাজ । এ মুহুর্তে আমাদের দেশ মাদক ক্যান্সারে ধুঁকছে । ইয়বা ও ফেন্সিডিলে ভাসছে রাজধানী থেকে অজপাড়াগাঁ, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ।

মাদক কি ?

বিশ্বস্বাস্হ্য সংস্হা (WHO) এর মতে, “নেশা বা মাদকাসক্তি এমন মানসিক বা শারিরীক প্রতিক্রিয়া, যা জীবিত প্রাণী ও মাদকের মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় । এ প্রতিক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলো হলো, মাদকদ্রব্যটি কমবেশী নিয়মিত গ্রহণের দুর্দমনীয় ইচ্ছা, মাদকদ্রব্য সৃষ্টির ফল বা প্রতিক্রিয়া পাবার তীব্র আকাঙ্খা অথবা মাদকদ্রব্য না থাকার অস্বস্তি এড়ানোর প্রচেষ্টা ।”

স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি জ্যামিতিক হারে ইয়াবা ও ফেন্সিডিলে আসক্তের সংখ্যা বেড়েছে, রাষ্ট্র এ বিষয়ে উদাসীন ছিলো । রাষ্ট্র যন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়া এগুলোর মহামারী আকারে বিস্তার লাভ অসম্ভব । সমঝোতার বাইরে থাকা পাচারকারীদের কখনো কখনো মাদকদ্রব্যসহ গ্রেফতার করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এগুলো ছিলো লোক দেখানো । অপরদিকে লেনদেনের লাইন ঠিক রাখা পাচারকারীরা পোষাকধারীদের প্রহরায় নির্বিঘ্নে বছরের পর বছর মাদক পাচার করে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে এখন সমাজপতি, ভি,আই,পি, সি.আই.পি, এম.পি এমনকি মন্ত্রীও বনে গেছেন ।

দুর্ণীতির মামলায় আদালত কর্তৃক তের বছরের কারাদন্ডপ্রাপ্ত একজনতো আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো মন্ত্রীগিরি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তারই ‘দ’ ও ‘র’ আদ্যাক্ষরের দুই পুত্রের ইয়াবা কারখানা ও ব্যবসায়ের কাহিনীতো সবারই মুখে মুখে ।অর্থ আর স্বার্থ দুটোই কিছু সংখ্যক মানুষ ও রাজনীতিবিদকে পশু বানিয়ে ফেলে, যার খেসারত দেয় অগণিত সাধারণ মানুষ।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য এ মাদক পাচারের সাথে জড়িত । গত মে মাসের ৪ তারিখ হঠাৎ মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হলে মাদক কারবারিদের সাথে সখ্যের কারণে চট্রগ্রাম রেঞ্জের ডি.আই.জি এস.এম মনির উজ জামানকে, ২৯ মে দামুর হুদা মডেল থানর ওসি আকরাম হোসেনকে, ৩০ মে চরভদ্রাসন থানার এ এস আই জুয়েল হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে । বদিরা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় দেশ ছেড়ে পালায়, রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় অধরা, অন্যদিকে দু’চার জন খুচরা ইয়াবা বিক্রেতাকে হত্যা ও গ্রেফতারের ডামাডোলে বিরোধী দলের সমর্থক নিষ্পাপ অনেককে হত্যা ও হয়রানী করায় এ অভিযান ব্যর্থ হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯(১) ধারা মতে ” এ্যালকোহল ব্যতীত অন্য কোন মাদকদ্রব্যের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানী, রপ্তানী, সরবরাহ, ক্রয়, বিক্রয়, ধারণ, সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, প্রয়োগ ও ব্যবহার করা যাইবে না, অথবা এতদুদ্দেশ্যে কোন প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ গ্রহণ, অর্থ বিনিয়োগ কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পরিচালনা বা উহার পৃষ্ঠপোষকতা করা যাইবে না৷” আগেই বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্যের এ পাচার ও ব্যবসার সাথে জড়িত আছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র, শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা জাল বিস্তার করে আছে দেশের সীমা ছাড়িয়ে আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলে।আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলো থেকে নিয়ে আসা এ পণ্য তুলে দেয়া হয় তরুণদের হাতে। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ- মায়ানমার সীমান্তের কিছু কিছু পয়েন্ট মাদক পাচারের আখড়া।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ ধারার বাস্তবায়ন না হওয়াতে ক্রমেই বেড়ে চলেছে এর ব্যবহার, বাণিজ্য ও পাচারসহ সংশ্লিষ্ট আরো নানাবিধ কর্মকাণ্ড।

সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীগণের ঝিমুনীর সুযোগে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মচারীদের ম্যানেজ করে দেশের আনাচে-কানাচে দীর্ঘদিন যাবৎ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে লক্ষ্য-লক্ষ্য ফেন্সিডিল, কোটি, কোটি ইয়াবা ।ওপারে ভারতীয় সীমান্তে শুধুই বাংলাদেশের জন্য অগণিত কারখানায় তৈরী হচ্ছে ফেন্সিডিল ! ভারতের কেউই নাকি ওসব খায়না , উৎপাদিত ফেন্সিডিল সবটুকুই বিভিন্ন কায়দায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এপাড়ে, বাংলাদেশে ! ফেন্সিডিলের নেশায় অভ্যস্ত ব্যক্তিদের চরম কোষ্ঠকাঠিন্য, ঝিমুনী, কর্ম বিমুখতা, পুরুষত্বহীনতা, রক্তচাপ, সিজোফ্রোনিয়া, ক্যান্সার ইত্যাদি আক্রমন করে খুব দ্রুত ! আবার মায়ানমার থেকে আসছে বাবা (ইয়াবা), কোটি-কোটি বাবায় সয়লাব হয়ে আছে দেশ ! বলা হয় যে, একটি দুটি ইয়াবা সেবন করলেই মস্তিস্কের কিছু ছোট রক্তনালী নষ্ট হয় এবং নিয়মিত করলে, খুব অল্প বয়সে ব্রেইন ষ্ট্রোক করে প্যারালাইজড বা চলাচলে অক্ষম হওয়ার আশংকা ৯৫%। এছাড়া ওজন কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হ্যালুসিনেশন, উন্মাদের মত আচরণ, গোয়ার্তুমি এবং পুরুষত্ব হারানো ও বন্ধ্যাত্ব হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে।এ ছাড়াও হরেক রকমের নেশাদ্রব্য রয়েছে হাতের নাগালেই । নেশার টাকা যোগাতে আসক্ত ব্যক্তিরা একসময় চুরি, ডাকাতি, বাটপারি করতে বাধ্য হয়, অনেক নারীকেই স্বেচ্ছায় বেশ্যার খাতায় নাম লেখাতে দেখা গেছে !

১৮৫৭ এর সিপাহী বিপ্লব, ১৭৫৭-১৯৪৭ বৃটিশ বিরোধী সংগ্রাম, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তৎপরবর্তী অসংখ্য গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্যের ধারক স্বাধীন এ ভূখন্ডের সচেতন যুব সমাজকে নেশায় বুদ করে রাখার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার রাজনীতির লিপ্সা একাকার হয়ে দেশকে নেশার স্বর্গরাজ্য বানানো হয়েছে । তা না হলে আঠার কোটি সচেতন সংগ্রামীকে অর্থনৈতিক শোষন ও বিনা ভোটে শাসন করা সম্ভব নয়, তা ইতিহাস ভালোভাবেই সাক্ষ্য দেয় ।

আমার মতে মাদকের সংজ্ঞা রচনা করতে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে ইচ্ছাকৃত ভুল করেছে এবং ইয়াবা ও ফেন্সিডিল পাচার ও ব্যবহারকে প্রচ্ছন্ন ভাবে প্রমোট করেছে । যদিও এ দুটোই মরণ নেশা, কিন্তু এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই রাতারাতি বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিকানা লাভ করেছে ।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বর্তমান প্রজন্ম। পৃথিবীব্যাপী এলকোহল সহজলভ্য, এলকোহল পাশ্চাত্য সভ্যতার অংশ ! বিয়ার, মৃত সঞ্জিবনী, কেরু কোং এর তৈরী হালকা মাত্রার এলকোহল সহজলভ্য থাকলে এবং সিগারেটের চেয়েও কম নিকোটিন সম্পন্ন ও তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ভেষজ গাজা সীমিত পর্যায়ে সেবনের সুযোগ থাকলে তরুনরা ইয়াবা কিংবা ফেন্সিডিলের মরণ ফাঁদে আটকা পড়তো না । এ অঞ্চলে হাজার বছরের ঐতিহ্য গাজা সেবন করে সাধু-সন্নাসীদের মতো গাইতো,

“এক টানেতে যেমন তেমন
দু’টানেতে রোগী
তিন টানেতে রাজা উজির
চার টানেতে সুখী !”

কিংবা এলকোহল পানের উচ্ছ্বাসে মনের আনন্দে বা চরম দুঃখে সুর ভাজতো ;

“নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে,
চোখের তারায় রং জমেছে,
এখন কোনো দুঃখ নেই,
নেই কোনো ভাবনা,
এমন করেই দিন যদি যায় যাক না।”

খুব সহজেই তাদেরকে এলকোহল বা গাজার আড্ডা / নেশা থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো, কিন্তু রক্তে এবং সমাজের সর্বস্তরে পরিকল্পিতভাবে ড্রাগ আসক্তি মহামারির মতো বিস্তারের সুযোগ করে দিয়ে রাতারাতি ড্রাগের নীল ছোবল থেকে আসক্ত ও অভ্যস্তদের ফিরিয়ে আনা একটি অসম্ভব ও হাস্যকর চেষ্টা ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সকল প্রকার নেশার বিরুদ্ধে ।
নেশা করাকে ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। ইসলামের প্রাথমিক যুগে নেশা করা অবৈধ ছিল না। তবে তা ক্রমান্বয়ে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। প্রথমত মদকে একটি নেয়ামত ও আকর্ষণীয় পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,(ক) ‘আর খেজুর ও আঙুর গাছের ফল থেকে তোমরা গ্রহণ কর মাদক এবং ভাল খাদ্য। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্য মহান উপদেশ রয়েছে’ -(সুরা আন নহল: ৬৭)। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধারাবাহিকতায় মদ বা নেশাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন,(খ) ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। হে নবী! আপনি বলে দিন, এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়’ -(সুরা আল বাক্বারা: ২১৯)। এর পরবর্তীতে অবতীর্ণ হয় (গ) ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না। যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে সক্ষম হও যা তোমরা বলছ’-(সুরা আন নিসা: ৪৩)। পরিশেষে মদ নিষিদ্ধের অমোঘ ঘোষণা নিয়ে নাজিল হয় (ঘ) ‘হে ঈমানদারগণ ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, স্থাপনকৃত মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারক তীর অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা ইহা হতে দূরে থাক। যেন তোমরা সফলকাম হতে পার’ -(সুরা আল মায়িদা: ৯০)। এভাবেই মহান রাব্বুল আলামিন মদ বা নেশা জাতীয় জিনিসগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

তারপরও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা যে কাউকে আকৃষ্ট করতেই পারে ;
“পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্নিশে কার্নিশ,
ফুটপাথ বদল হয় মধ্যরাতে
বাড়ি ফেরার সময়, বাড়ির ভিতর বাড়ি, পায়ের ভিতর পা,
বুকের ভিতরে বুক
আর কিছু নয়—”

আর যদি ড্রাগের বিরুদ্ধে সত্যিকারের যুদ্ধ ঘোষণা করতে বিলম্ব করা হয়, যদি দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ইয়াবা ও ফেন্সিডিল সিন্ডিকেটের রাঘব বোয়াল সহ চুনো-পুটিদের সমূলে ধ্বংস না করা হয় তবে, ঘরে ঘরে বড় হতে থাকবে ঐশীরা, ধ্বংস হবে পরিবার, সমাজ, প্রজন্ম ও বাংলাদেশ নামক রক্ত দিয়ে অর্জিত একটি স্বাধীন ভূখন্ড !!


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1562 বার