স্মরণে শাহ আব্দুল করিম একে কুদরত পাশা

Pub: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

হাওরাঞ্চলের মানুষের শোকের মাস সেপ্টেম্বর। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর লক্ষ ভক্তকে কাদিয়ে এ নস্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন হাওর পাড়ের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জন বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম। শাহ আব্দুল করিম না থাকলেও তার রেখে যাওয়া গান আজোও মুখরিত করে মানুষকে। শাহ আব্দুল করিম শুধু বাউল নন। তিনি একজন রাজনীতিক ও দেশের যে কোন সংকটময় মুহুর্তে তিনি প্রহরীর মতো দেশ মাতার কাছে দাড়িয়েছেন। আজকে দেশের এ সংকটময় মুহুর্তে আব্দুল করিমের মতো গুনে মানুষের প্রয়োজন অনেক বেশী ছিল। তাহলেই হয়তবা আমরা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট উত্তোরনের কোন পথ খুজে পেতাম।
হাওর-বাওর-খাল-বিল ও নদী-নালার দেশ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ ইংরেজীর ১৫ ফেব্রুয়ারী এ কাল জয়ী পুরুষ শাহ আব্দুল করিম জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইব্রাহীম আলী এবং মায়ের নাম নাইওরজান বিবি। ভাটির নিজস্ব পরিবেশ ও প্রকৃতি এখানকার মানুষদের করে তোলে ভাবুক, আউল-বাউল, শাহ আব্দুল করিমও তাদের মধ্যে একজন। কৃষি মজুর অভাবী পরিবাবে তাঁর জন্ম। অভাবের সাথে যুদ্ধ করে শুরু হল জীবন।
শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতি চারন করতে গিয়ে দিরাই-শাল্লার সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ২০০৯ সালে করিম লোক উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, সংসারের অভাব, কালনীর কাল জল, আর ভরাম হাওরের ঢেউ রাখাল বালক শাহ আব্দুল করিমকে বাউল সম্রাটে পরিণত করেছে। শাহ আব্দুল করিমের একমাত্র পুত্র শাহ নুর জালাল পিতার স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, এই মিনতি করিরে বন্ধু চাইরা যাইওনা, আমিতো জানিরে বন্ধু তুমি আপনা। না একমাত্র পুত্রের সে আহ্বানে তিনি সাড়া দেননে। সে সহ ¥রা সবাইকে শোক সাগওে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি জমান পরপারে। বাউল সম্রাটের ভক্ত বাউল নূর জাহান তার মনের আকুতি প্রকাশ করে বলেন, আশি বলে গেলো বন্ধু আইলোনা/আসবে বলে আশায় রইলাম, আশাতে নইরাশা হইলাম/ বাটাতে পান সাজাই তইলাম, আইয়া বন্ধে খাইলোনা। নূর জাহানরা মনে করেন তাদের গুরু গানের মাধ্যমেই তাদের মাঝে বেচে থাকবেন আজীবন। শুধু নূর জাহান নয় হাজার করিম ভক্তরা ভীর জমান শাহ আব্দুল করিমের মাজার উজানদল গ্রামে। শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যু বার্ষিকীকে গিরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে করিম ভক্তরা আসতে শুরু করছেন উজান দল গ্রামে।
দেশ মাতৃকার প্রতি শাহ আব্দুল করিমর ছিল অগাদ ভালোবাসা। দেশের যে কোন সংকটময় মুহুর্তে নিজে আবিভূত হয়েছেন স্বমহিমায়। নিজের সৃষ্টিকর্ম দিয়ে দেশকে সব সময় কিছু দেয়ার চিন্তা করেছেন এ গুনী। কোন কিছুর বিনিময় তিনি কখনো আশা করেননি। শাহ আব্দুল করিমের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৫৪’র নির্বাচন ৬৯এর গণ আন্দোলন, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে স্বরচিত গনসঙ্গীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশ মার্তৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর গণসঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ থান ভাসানী তাঁর পিটে হাত রেখে বলেছিলেন-বেটা, গানের একাগ্রতা ছাড়িও না, তুমি একদিন গণ মানুষের শিল্পী হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণসঙ্গীত শুনে একশ পচাশি টাকা দেন, শেখ মুজিব ১১ টাকা দিয়ে বলেন, তোমার মতো শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে।
দেশের জন্য শাহ আব্দুল করিম যেমনি ছিলে উদার দেশও তার প্রতিদান দিতে চেষ্টা করেছে। অসংখ্য পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন এ গুণী বাউল সম্রাট। ২০০১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শাহ আব্দুল করিমকে ’একুশে পদক’ প্রদান করে। এছাড়াও মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পদক, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নাগরিক সংবর্ধনা, নিউয়র্ক হাসন রাজা লোক উৎসব সম্মাননা সহ অসংখ্য পদক ও সম্মননার তালিকা রয়েছে এ গুনী শিল্পীর।
মন মজালে ওরে বাউলা গান/ তুমি আমায় যা দিয়েছো কি দেব তার প্রতিদান।…..তথ্য গান গেয়ে গেলেন যারা মরমী কবি আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি। বিপন্ন মানুষের দাবী করিম চায় শান্তি বিধান। বাউল গানের জন্য দেশে এখন পর্যন্ত কোন উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। শাহ আব্দুল করিম বাউল একাডেমী প্রতিষ্টা করা এখন দিরাইবাসী তথা সাড়া দেশের বাউল ভক্তদের প্রাণের দাবী। ২০০৯ সালের করিম লোক উৎসবে দিরাই-শাল¬ার সাংসদ ঘোষনা দিয়েছেন আগামী লোক উৎসবের আগেই বাউল করিম একাডেমীর কাজ শুরু হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোন বাস্তবায়ন লক্ষ করা যায়নি। শাহ আব্দুল করিমের শেষ ইচ্ছা ছিল করিম একাডেমী প্রতিষ্টা করা। তিনি মরে গেলে যেন দেশের করিম ভক্তরা তথা বাউল মনা মানুষগুলো বাউল গানের চর্চা করতে পারে এ প্রতিষ্টান থেকে। সে লক্ষে নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় কাজ শুরুও করেছিলেন। কিন্তু তার বাস্থবায়ন গঠেনি। বিভিন্ন সময় সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যাক্তিরা বাউল আব্দুল করিম একাডেমী প্রতিষ্টার প্রতিশ্র“তি দিলেও তা আলোর মূখ দেখেনি। তাই করিম ভক্তরা দেশের বৃত্তবান, স্থানীয় সাংসদ এবং প্রশাসনের সংশি¬ষ্ট সবাইকে আহ্ববান জানিয়েছেন শাহ আব্দুল করিমের শেষ ইচ্ছা পূরনে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর জন্য।
শাহ আব্দুল করিম ছিলেন একজন নিস্বার্থ বাউল। তিনি নিজের জন্য কিছুই করেননি। এমনকি ভাবেনওনি। তাই তিনি তার বিরাট সৃষ্টি কর্ম প্রায় দেড়হাজার গান মানুষের জন্য রেখে গেছেন। নিজ উদ্যোগে সেই গানের বই প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে বাজারে রয়েছে তাঁর কয়েকটি বই। তাঁর প্রথম বই আফতাব সঙ্গীত তাঁর সহ ধর্মীনির নামে বইটির নাম। এর পর প্রকাশিত হয়েছে, গণ সঙ্গীত, ধল মেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে, সর্বশেষ ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র। এছাড়াও বাংলা একাডেমী তাঁর ১০ টি গান ইংরেজীতে অনুবাদ করে বের করেছে।
শাহ আব্দুল করিম একজন আধুনিক বাউল। তার গানের কথা ও সুরে এর পরিচয় পাওয়া যায়। শাহ আব্দুল করিমের গান সকল মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়। বাউল সমাজের কাছে তার গান যেমনি জনপ্রিয় নতুন প্রজন্মের কাছে তা আরো বেশী জনপ্রিয়। শাহ আব্দুল করিম তার গানের মাঝে বেছে থাকবেন আমাদের কাছে আজন্ম। কিন্তু শাহ আব্দুল করিমের শেষ স্বপ্ন পুরণে আমরা কি কিছুই করতে পারিনা। আসুন আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নেই শাহ আব্দুল করিম বাউল একাডেমী প্রতিষ্টার জন্য।
হাওর-বাওর-খাল-বিল ও নদী-নালার দেশ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ ইংরেজীর ১৫ ফেব্রুয়ারী এ কাল জয়ী পুরুষ শাহ আব্দুল করিম জন্ম গ্রহণ করেন। এবং ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর লক্ষ ভক্তকে কাদিয়ে এ নস্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন শাহ আব্দুল করিম। তার মৃত্যু দিবসে অজশ্র শ্রদ্ধা।

লেখক, সাংবাদিক ও উন্নয়ণকর্মী।

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1106 বার

আজকে

  • ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ১৪ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 
 
 
 
 
সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com