গণতন্ত্র : সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্র ও নির্বাচন

Pub: বুধবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮ ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮ ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবদুল আউয়াল মিন্টু :
বিশ্বমানের নিরিখে জামাইকা গণতান্ত্রিক দেশ। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন হয় নিয়মমাফিক। দেশটির বিচার বিভাগ পৃথক ও স্বাধীন এবং তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত। জামাইকার সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ও বলিষ্ঠ, নাগরিক সমাজ প্রাণবন্ত। বিশ্বপর্যায়ে গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফ্রিডম হাউজ’ ক্রমাগতভাবেই জামাইকাকে ‘মুক্ত দেশের’ কাতারে স্থান দিয়েছে। জামাইকা বর্তমানে সহিংসতার কবলে পড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও ক্ষতবিক্ষত। এর মূল কারণ, যুগের পর যুগ রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিজ রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনকে অনৈতিকভবে অপব্যবহারের সাথে সাথে এলাকার সঙ্ঘবদ্ধ, স্থানীয় সশস্ত্র গ্যাং বা মাস্তান বাহিনীকে ভোট সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছেন। তাদের ব্যবহার করে বিরোধীদলীয় কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিস্তেজ করে রাখেন। রাজনীতিকেরা তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেসব মাস্তান বাহিনীর গডফাদারদের দেশের সম্পদ লুট করার সুযোগ করে দেন। অথবা নিজেরা যা লুট করেন, তার ভাগ দেন। এটা বেশির ভাগ করা হয় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ঋণের নামে ব্যাংক থেকে টাকা লুণ্ঠন ও জমিজমা দখলের সুযোগ করে দিয়ে। এ ছাড়াও সরকারি চাকরি, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে।

একটু ধ্যান-ধারণার সাথে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের অবস্থাও আজকাল তাই। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামাইকাকেও ছাড়িয়ে আমরা এক ধাপ এগিয়ে গেছি। যেমন- অফিসের সুপেয় পানি সরবরাহ থেকে আরম্ভ করে এলাকার দোকানপাট, ঘরবাড়ি নির্মাণের ইট, বালু, রড, সিমেন্ট এগুলোর সরবরাহ কাজ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পালিত ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে দিতে হবে। হাট, ঘাট, মেলা, ব্রিজের টোল, বাজারের ইজারা, গরুর হাটের ইজারা, এসবই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের দিতে হবে। না হলে কন্ট্রাক্টর, সরবরাহকারী বা মালিকের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের সাথে হাত না মেলালে সরকারি কর্মকর্তারাও বিপদের আশঙ্কায় ভোগেন। এগুলো ছাড়াও পাসপোর্ট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ, এমনকি হাসপাতালের বিছানা পেতে হলেও এখন শাসকগোষ্ঠীর কোনো অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর মাধ্যমে যেতে হবে। তার জন্য চড়া মূল্য দেয়া বাধ্যবাধকতা। এর ফলে আসল ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই এখন অনেকটা লুটপাটের মাধ্যম হিসেবে অনন্যোপায় হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জামাইকার রাজনীতিবিদদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী দল শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। তারপরও তারা সবসময় পেয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়। সরকারি দল বা ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে অপারগ। মাদক পাচার ব্যবসায় থেকে প্রচুর টাকা আয় করে। টাকা ও রাজনৈতিক মদদ এ দু’য়ের সমন্বয়ে তারা এমন শক্তি অর্জন করেছে যে, এখন ছক উল্টে গেছে। রাজনীতিকেরা এখন জীবন বাঁচানোর জন্য এখানে-সেখানে তাদের আশ্রয় খোঁজেন। তারা নিজেদের এখন অসহায় মনে করেন। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অনেক রাজনীতিক এখন পুলিশের কাছে না গিয়ে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ বাহিনীর গডফাদারদের ওপর একান্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে থাকায় বর্তমানে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। রাজস্ব আয়ের দিক থেকে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ছে। সঙ্গত কারণে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়ে গেছে। আয়ে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। শহর-নগরে বিশাল বিশাল বস্তি গড়ে উঠেছে। পুলিশ হয়ে উঠেছে হিংস্র ও অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতীক। সাধারণ জনগণ তাদের ঘৃণা করে। নিরাপত্তার হুমকিতে পড়লেও রাজনীতিকেরা এখন আর পুলিশের কাছে যেতে চান না। বর্তমানে জামাইকায় হত্যা, খুন-জখমের হার পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ।

কম্বোডিয়া, ইউক্রেন, ইরাক, কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, কলম্বিয়া, হাইতি, ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকো ছাড়াও পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার ব্যবস্থা একনায়কতান্ত্রিক নয়, গণতন্ত্র এখনো যেখানে পরিপক্বতা লাভ করেনি, সেসব দেশে এ অবস্থা বিরাজমান। বর্তমানে বাংলাদেশে মাদক পাচার ব্যবসায়সহ সব কারণ পুরোদমে বিদ্যমান। বাংলাদেশ বর্তমানে একই পরিস্থিতির দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
একইভাবে মেক্সিকোকে উদাহরণস্বরূপ নেয়া যেতে পারে। ৫০ বছর ধরে একই ঘটনা ঘটছে দেশটিতে। এক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ বাহিনী শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মাদক পাচার বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। এসব বাহিনী মেক্সিকোর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এতই শক্তিশালী যে, মাঝে মধ্যে তারা দেশটির সশস্ত্রবাহিনীকে হার মানায়।

গত দশকে এসব বাহিনী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৯০ হাজার (২০১৪ ডিসেম্বর) লোক প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছেন রাজনীতিক, পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিচারক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, বড় বড় শহরের মেয়র ও প্রাদেশিক গভর্নর। বর্তমানে সে দেশে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য জানের ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, এসব বাহিনী বর্তমান বিরোধী দল আরপিআইয়ের সমর্থনপুষ্ট। দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকাকালে জামাইকার রাজনীতিকদের মতো তারাও এসব বাহিনীকে ভোট সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছেন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দমন করার জন্য ব্যবহার করছেন। বর্তমানে অনেক রাজনীতিবিদ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় খোঁজেন।

পাশ্চাত্যের নির্বাচন সনদ
বহু বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত, অগণতান্ত্রিক বা নব্য-গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক সংস্কার, গণতন্ত্র, সুশাসন, দারিদ্র্য কমানো, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তৃতীয় বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত বেশির ভাগ মানুষ পশ্চিমা শক্তির দিকে তাকিয়ে থাকে নিজ দেশে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল ও জনগণও এদিক থেকে পিছিয়ে নেই। বিশ্বায়নের এ যুগে পাশ্চাত্যের (বিশেষ করে পরাশক্তি) অনেক উন্নত দেশের অনেকেই এ ধরনের তৎপরতাকে আজকাল অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের মতো সাধারণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে।

বিভিন্ন দেশে অহরহ জাতি-গোষ্ঠীগত দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জাতিসঙ্ঘের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন দেশে শান্তি রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলো নিজ দেশের সেনা পাঠাতে অনীহা, অদূরভবিষ্যতে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের শক্তিশালী অবস্থান, একই সাথে রাজনৈতিক ও বিশ্ব সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পদধ্বনি, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের সংজ্ঞা নিয়ে মতবিরোধ ও ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের নেতিবাচক পরিণতি, বিভিন্ন মহাদেশে আঞ্চলিক নিরাপত্তাজনিত কারণে (যেমন দক্ষিণ এশিয়া) উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, তৃতীয় বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যর্থতা, এসব কারণে পশ্চিমা দেশের সরকার এবং সাহায্য সংস্থাগুলো আজকাল গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য চাপ দেয়ার পরিবর্তে চলমান রাজনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে বলে দৃশ্যমান। এ ছাড়াও ধাতব, তেল ও অন্যান্য খনিজস¤পদের নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে সম্ভবত পশ্চিমা দেশগুলো বর্তমানে সুশাসন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, স্বাধীনতা ও সমতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পূরণে অনীহা না দেখালেও তা থেকে দূরে সরে আসছে বলে বোঝা যায়।

এটা আরো প্রতীয়মান যে, আজকাল পশ্চিমা দেশগুলো দেশে দেশে তাদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য পুরনো ধাঁচে একনায়কসুলভ ও অগণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ নিচ্ছে। সুদান, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, তিউনেশিয়া, মিসর, কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশকে এর প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয়া যায়। সাম্প্রতিককালে অনেক দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সম্ভাব্য সব ধরনের কারচুপি করা হয়েছে। শাসকেরা দাবি করেন, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। এসব নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রেসিডেন্ট ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। অথবা সংসদ নির্বাচনে সরকারি দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়। এরপরও পাশ্চাত্যের নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা এসব নির্বাচনকে ‘মুক্ত ও নিরপেক্ষ’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

আবার যেসব দেশে পশ্চিমা দেশগুলো এ সার্টিফিকেট দিতে অপারগতা প্রকাশ করে, সেসব দেশে পিছিয়ে পড়া পুরনো বিশ্বশক্তি (যেমন, রাশিয়া) এবং উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো (যেমন, চায়না) এ ধরনের কারচুপির নির্বাচনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে সমর্থন যোগায়। উত্তর কোরিয়া, কিরগিস্তান, কম্বোডিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও মিয়ানমারকে এসব দেশের উদাহরণ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। তবে হঠাৎ করে মনে হচ্ছে যে, পশ্চিমা দেশগুলো আবার তাদের পুরনো নীতিতে ফিরে আসছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি পুনরায় মনোযোগ দিচ্ছে। ক্যাম্বোডিয়া ও ভেনিজুয়েলাকে দৃষ্টান্ত বলে ধরে নেয়া যায়। এসব দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ না হওয়ায় ক্ষমতাসীনদের অনেকেই এখন পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন ধরনের, যেমনÑ অর্থনৈতিক, ভ্রমণ ও ব্যাংকিং লেনদেনে অবরোধ ও বাধার মুখে পড়েছে।

তবে বিগত বছরগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর শিথিলতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনেরা নিজ স্বার্থে গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া ও অতীতের গণতান্ত্রিক অর্জনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলেছে। তারা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে গোটা সমাজকেই নিরাপত্তাহীন করে ফেলেছে। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, মাদক ব্যবসায় ইত্যাদি দমন করার নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করেছে। নিজ বা দলীয় স্বার্থে এবং ক্ষমতা স্থায়ী ও কুক্ষিগত করার জন্য দর্জির নিখুঁত মাপের মতো করে শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করছে। ব্যাংকসহ সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন করে যাচ্ছে। ব্যবসায় বাণিজ্য সম্প্রসারণে আইন ও রীতিনীতি উপেক্ষা করে দলীয় সমর্থকদের সহায়তা করছে। এসবই এক দিকে যেমন বাংলাদেশ তার অতীতের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অর্জনগুলোকে স্থিমিত করে ফেলেছে, আবার অন্য দিকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দরজাও বন্ধ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ অবশ্য এসব দিক থেকে আরো একধাপ এগিয়ে আছে। বর্তমান সরকার সংসদে আইন পাস করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য দুর্নীতিকে আইনগতভাবে হালাল করে নিয়েছে। যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে দরপত্র আহ্বান ও অনুমোদন করা হয়েছে বা হবে, সেগুলো সম্পর্কে ভবিষ্যতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। এ ধরনের ব্যবস্থাকে সহজেই বলা যায়, আইন করে চুরি করলেও শাস্তি দেয়া যাবে না। এ ধরনের আইনের অর্থই হলো ক্ষমতার অপব্যবহারকে আইনসম্মত করে নেয়া। অন্য দিকে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর চাপের মুখে সরকারি ক্রয়নীতি প্রণয়ন করা হলেও সরকার এর কোনো তোয়াক্কা করে না। অথচ খবরের কাগজ ও টেলিভিশনে নিত্য প্রচার চালানো হয়, সরকার জনস্বার্থে ক্রয়নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করছে। তাতে অনুমেয় যে, আইনের শাসন দৃশ্যত অবলুপ্ত হয়ে গেছে। সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে বড় আকারের বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচার বিভাগের দলীয়করণ ও দুর্বলতার সুযোগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে দমননীতি চালাচ্ছে। বিরোধীদের দমন করার লক্ষ্যে তাদের দাগি অপরাধী হিসেবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। গায়েবি বা মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধীদের হয়রানি করা হচ্ছে। অন্য দিকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের জামিন পাওয়ার অধিকারেরও কোনো তোয়াক্কা করছে না। অন্য দিকে আবার ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের ক্ষেত্রে অতীতের সব মামলা, তা হোক ডাকাতি, জমি দখল, ধর্ষণ থেকে হত্যা মামলা পর্যন্ত সবই পাইকারি হারে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে শাসকগোষ্ঠীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আর তেমন কোনো মামলা হয় না। এসবই করছে বিচার বিভাগকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে।

বিদেশীরা যাই করুক বা বলুক, যারা বাংলাদেশে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার, স্বাধীনতা ও সমতা, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে তাদের নিজেদেরই সংগ্রাম করে যেতে হবে। সংগ্রাম করতে হবে তাদের বিরুদ্ধে, যারা কারচুপির নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়, যারা জনগণের কণ্ঠরোধ করতে কুণ্ঠিত নয়, যারা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে, যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে, যারা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে, যারা গায়ের জোরে নিজ ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করে, যারা সংসদকে কার্যকর করতে চায় না, যারা বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করে জনগণকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন করে সমাজকে গণতন্ত্রায়নের পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে সংগ্রামের অংশ হিসেবে ধরে নিতে হবে। সংগ্রাম করে অধিকার আদায় করতে না পারলে, শাসন ও সুশাসনের পরিবর্তে দুঃশাসন ও কুশাসন মেনে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হবে এবং অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নিচু স্তরের মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত করার ‘রূপকল্প ও স্বপ্নকে রূপগল্প’ হিসেবে বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকতে হবে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সংস্কারের মাধ্যমে সুবিন্যস্ত করে সুশাসনে রূপান্তরিত করতে না পারলে জনগণের স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই রয়ে যাবে। সেই সাথে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের শিক্ষা থেকে এও বলা যায়, শাসকগোষ্ঠী যে স্বপ্নই দেখুক না কেন, সেগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
লেখক : সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1165 বার