বাংলাদেশে এ যাবতকালের সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর নির্বাচন?

Pub: রবিবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮ ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮ ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আফসান চৌধুরী : ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন এমনকি হওয়ারই কথা ছিল না। অনেকেই মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতা, সহিংসতা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে এবং নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাবে। বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে যখন মামলায় দোষি সাব্যস্ত করা হলো এবং জামিন নাকচ করা হলো, তখন বিশেষ করে এই ধারণার জন্ম নিয়েছিল। সে সময় বিএনপি বলেছিল যে, তার মুক্তির জন্য বিএনপি জাতীয় আন্দোলনে যাবে। যে কোন দিন জামিনের আশা করা হচ্ছিল।

জামিন দেয়া হয়নি এবং ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে সহিংসতাও হয়নি। কৌশল হিসেবে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এটা ছিল অপ্রত্যাশিত কারণ এটা বিএনপির অতীত রেকর্ডের সাথে মেলে না। অবশ্যই দলটি এটা বুঝেছিল যে সহিংসতা দিয়ে খুব বেশি অর্জন করা যাবে না। দলটি বলেছিল যে, যাই হোক না কেন খালেদা জিয়াকে ছাড়াই তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু (ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলের মধ্যে) সংলাপের পর বিএনপির অবস্থানের একটা সুক্ষ্ম পরিবর্তন হয়: খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচনটা এখন হয়েছে “আমরা ক্ষমতায় আসার এক দিনের মধ্যেই বেরিয়ে আসবেন খালেদা”। এটা বিএনপিকে রাজনীতি ও নির্বাচনে জিইয়ে রেখেছে।

চীনের কোন মাথা ব্যথা আছে?

আওয়ামী লীগ খুবই খুশি হবে বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া পর পর দুটি নির্বাচনে পার পেয়ে যাওয়াটা কঠিন। বাস্তবতটা স্বীকার করা যাক – এ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন নির্বাচনের গ্রাহক স্থানী নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা নয়, কারণ তাদের এখানে খুব সামান্যই ইস্যু রয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্ভবত অন্যভাবে ভাবছে। অবশ্য, বাংলাদেশে পশ্চিমারা কোন বিষয় নয়, বিষয় হলো এখানকার দুই শক্তিধর প্রতিবেশী।

এটা ভাববার সুযোগ খুব সামান্যই রয়েছে যে চীন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাবে কারণ সীমানা/সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা বাংলাদেশের সাথে নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের কোন অংশ নেই। দুই দেশের মধ্যে একমাত্র প্রতিকূল ইস্যু হলো রোহিঙ্গারা যাদেরকে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মাধ্যমে বের করে দিয়েছে মিয়ানমার এবং যারা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। চীন ইয়াঙ্গুনকে সমর্থন দিয়েছে এবং প্রকাশ্যেই তারা সেটা করেছে। এখন জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো, গণহত্যাকারী একটি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করাটা চীনের জন্য কোন সমস্যা হয়নি, কারণ তারা কোন পরাশক্তির সাথে নেই। তবে, যে কোন রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর পেছনে লেনদেনের একটা ব্যাপার থাকে, তাই তাদেরকে একা ছেড়ে দিলে এটা চীনের স্বার্থেই বেশি কাজে লাগবে। তাই পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ এবং ওবিওআর নিয়ে আলোচনা করাটাই ভালো। তাই, চীন এখানে অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক নয়, অন্তত ঢাকার ক্ষেত্রে।

ভারতের অবস্থান কোথায়?

ভারতের বিষয়টি ভিন্ন। বাংলাদেশের সাথে ভারতের তিনটি বড় ইস্যু রয়েছে: ক) উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাথে তাদের ট্রানজিট সুবিধা রয়েছে, যেটা গেছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে, যেটা রক্ষা করাটা তাদের প্রয়োজন; খ) ভঙ্গুর উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং সেখানকার সক্রিয় জঙ্গি যাদের তীব্রতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, এবং বাংলাদেশ সরকারের বিদ্রোহীদের আশ্রয় না দেয়ার নীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; এবং গ) ভারত এমন একটা সরকার চাইবে যারা পাকিস্তানের সাথে ব্যবসায় করতে চাইবে না, কারণ এর মাধ্যমে ঢাকা থেকে গোয়েন্দাবৃত্তি শুরু হতে পারে।

যেহেতু আওয়ামী লীগ এখানে ভারতের সব ধরণের চাহিদার সাথে মিলে যায়, তাই এখানকার নির্বাচনের ব্যাপারে চীনের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ রয়েছে ভারতের। অবৈধ অভিবাসী আরেকটি ইস্যু এবং বাংলাদেশে কোরবানির জন্য অবৈধ গরু আমদানিও আরেকটি ইস্যু। ভারতে, অভ্যন্তরীণ জনমত গড়তে গরুর মাংসের রাজনীতি ভালো কাজ দেয়।

বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসতে পারে, তাহলে তারা আগের চেয়ে বেশি বন্ধুসুলভ হবে। কিন্তু ভারতের একটা ভাল বন্ধু দরকার, যারা কোন ‘খারাপ’ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জিতে আসবে না। তাই আরও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে একটা ইতিবাচক প্রভাব এখানে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এটাই বলেছেন।

এটা কি ‘ভালো’ নির্বাচন হবে?

সবাই নিশ্চিতভাবে এটা জানে যে, বিএনপি-কেন্দ্রীক জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট ভবিষ্যতে ক্ষমতায় কর্তৃত্ব করার কথা বলেছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব বিএনপিকে অর্থপূর্ণ দল হতে সাহায্য করেছে – শুধু ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত দল নয় যারা ক্ষমতার জন্য জামায়াতে ইসলামির সাথে জোট গড়েছে এবং অনেকেই যেটাকে বিএনপির সবচেয়ে বড় বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রচারযন্ত্র এই দিকটার উপরই মনোযোগ দিয়েছে এবং ফ্রন্টের বিরুদ্ধে এটাকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই যে, ভোটারদের বিবেচনায় এটা প্রধান কোন ইস্যু কি না। যদি নির্বাচন-পূর্ব কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে, কিন্তু প্রচারণার বিনিয়োগের তুলনায় এটা ততটা দৃশ্যমান হয়নি। অর্থনীতির অবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যু এখনও প্রাধান্য পাচ্ছে, রাজনৈতিক ইস্যু নয়।

জনগণ কি চায়?

বাংলাদেশীরা চায় একটা নিরাপদ ও সহিংসতা-মুক্ত নির্বাচন, এর বেশি কিছু নয়। তারা যদি ভোট দেয়ার সুযোগ পায়, তাহলে তো খুবই ভালো। যদি তারা সুযোগ না পায়, তাহলে ভোটারদের একটা অংশ শুধু হতাশ হবে, অধিকাংশই হবে না। রাজনীতি এবং জনগণের মধ্যেকার দূরত্বটা বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই চলে আসছে, তাই তাদের প্রত্যাশাটা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মধ্যে নেই, রয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মধ্যে।

চাহিদা, প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষার মাত্রা অনেক, কিন্তু প্রবৃদ্ধি নির্ভর, কর্মসংস্থান বিমুখ অর্থনীতিও একটা বাস্তবতা। শাহবাগ আন্দোলনের পর গত দুই বছরে সবচেয়ে বড় যে দুটো আন্দোলন হয়েছে, সেগুলো ছিল চাকরি ও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে। দুটোতেই নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা এবং অবশ্যই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়েই ভোটারদের এই অংশের উদ্দেশ্যে একটা বার্তা দিয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতার মাত্রা অনেক বেশি এবং সেটা একটা প্রভাব ফেলছে। জনগণ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং সহিংসতা যদি চলতে থাকে, তাহলে অনেক ভোটারই তাদের ভোট দেয়ার চেষ্টা থেকে দূরে থাকবে। তবে, ২৪ ডিসেম্বর থেকে সেনা মোতায়েন করা হবে এবং প্রচারণায় উত্তেজনা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভোটদান যদি নিরাপদ হয়, জনগণ খুশি হবে সেখানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন যদি সেখানে বড় এবং অর্থপূর্ণ বিরোধী দল থাকে। একচেটিয়া বিজয় যে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ভালো, সেটা বোঝার মতো যথেষ্ট স্মার্ট তারা হয়েছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ