আমার দেখা বর্তমানের আধুনিক তুরস্ক। (এক)

Pub: বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ ২:১৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ ২:১৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড. এম এ আজীজ (লন্ডন) :
ভূমিকা: দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর পূর্বে ১৯৮৪ইং সৌদি আরব যাওয়ার পথে স্বল্প সময়ের জন্যে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যাত্রা বিরতিতে একটু দেখার সুযোগ হয়েছে। তাতে মনটাই খারপ হয়ে গিয়েছিল। তখনও আমার তুরস্ক ও ঐ দেশের মুসলিমদের সম্পর্কে তেমন কোন ধারনা ছিলনা। তারও আগের ঘটনা আমি বৃটেনে ১৯৭৬ইং সনে আসার পর একদিন ইস্ট লন্ডন মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তে যাই। তখন কিন্তু ইস্ট লন্ডন মসজিদ আজকের মত বিশাল ইউরোপের সবচাইতে বড় প্রতিষ্ঠিত মসজিদ আকারে ছিলনা। বর্তমানে প্রায় এক সাথে ২০,০০০ বিশ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে। বর্তমান জায়গায় তখন তেরপালের ছাদ ছিল। চার দিকে অস্থায়ী কিছু দিয়ে ঘেরা ছিল। কোন বিল্ডিং ছিলনা। মসজিদের বাহিরে দেখতে পেলাম একদল মহিলা কান্নাকাটি করতেছে। অবাক হলাম পরনে স্কার্ট ও মাথায় বব কাট চুল কোন স্কার্ফ বা মাথা কভার নাই। অনেক পুরুষও আছে। দেখতে ও পোষাক আসাকে একেবারে ইংরেজ। এদেশের সাদা খ্রিস্টান ও তাদের মধ্যে রং ও চেহারায় কোন পার্থক্য নাই। তবে মসজিদের সামনে কেন কাঁদতেছে ?
তখনও বিশ্ব মুসলিমদের ব্যাপারে আমার পুরাপুরি ধারনা ছিলনা। সবে মাত্র বাংলাদেশ ছেড়ে লন্ডনে আসা। যাই হোক এক ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম এরা কারা? কেন কাঁদে? বললেন এরা হলো তুরস্কের মুসলিম, তাদের কোন এক আত্মীয় মারা গেছেন তার এখানে জানাজা হয়েছে। তাই কাঁদতেছে। জানা থাকা ভালো তখনকার দিনে আমার জানা মতে সমগ্্র বৃটেনে একমাত্র মরহুম হাজি তাসলিম আলী সাহেবই মুসলমান মৃতদের বডি কালেকশান, গোসল দেয়া, জানাযা, কবরের ব্যবস্থা করা ও প্রয়োজনে মৃতদেহ নিজ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন।
তার্কিশ মুসলমানদের এই অবস্থা দেখে সত্যিই অবাক হলাম। তার কিছুদিন পর তার্কিশ এয়ার লাইনে ওমরা করার উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুল হয়ে রওয়ানা দিলাম। এয়ার লাইন যে হোটেলে রেখেছিল তাতে যা দেখলাম বলার মত নয়। স্থানীয় লোকেরাও খাইতে ও আনন্দ করতে এসেছে। তাদের আনন্দ ফুর্তির অবস্থা আরও ভয়ানক যা তখনকার দিনের একজন বাংলাদেশী মুসলমানের চিন্তারও বাহিরে। রেস্টুরেন্টের ডাইনিং রুমে মদ নাচ গান সবই চলছে। গানের ও নাচের জন্যে ডাইনিং রুমে স্টেইজ রয়েছে। গানের সাথে সাথে স্টেইজে যুগল নাচ। এক দুই যুগল নামে আবার অন্যরা উঠে। এই ভাবে চলছেই। যা তখনকার দিনে আমাদের বাংলাদেশে দেখিও নাই খুব একটা শুনিও নাই। কতইনা আজব!
যেই তার্কী খেলাফাত, ইসলামী ভাব ধারায় শত শত বছর সমগ্র আরব দেশ (সৌদি আরব মক্কা ও মদীনা সহ, জর্দান, সমগ্র প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইরাক, ওমান, কুয়েত, কাতার বাহরাইন আরব আমিরাত, ইয়ামেন) আফ্রিকার মিশর, সুদান, ইরিত্রিয়া, তিউনিশিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া, ইউরোপের গ্রীস, সাইপ্রাস, ক্রিমিয়া, জর্জিয়া, আরমেনিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া, বসনিয়া হার্জগোভিনা বিশাল সা¤্রাজ্য শাসন করেছিল আজ সব হারিয়ে তাদের দেশের মুসলমানদের এই করুন হালচাল।
যাই হোক পশ্চিমের শোষকেরা মুসলমানের রাজত্বকে ধ্বংশ করার সাথে সাথে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আচার আচরনের থেকেও অনেক দূরে সরে নিয়েছে। হয়তো কোন দেশে বেশ ও কোন দেশে কম। আর তাই মুসলিম দেশে আজ ইসলাম ও পশ্চিমাদের রেখে যাওয়া আচার আচরনের মধ্যে দ্বন্ধ লেগেই আছে। বাংলাদেশেও মরহুম কবি গোলাম মোস্তাফার ভাষায় একদল আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মোল্লা (যারা বর্তমান দুনিয়ার জ্ঞান বিজ্ঞানের সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান রাখেনা) আর এক দল পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের ধর্মের তেমন কোন জ্ঞান রাখেনা) গোল্লায় পরিনত হয়েছে। তাই তিনি মোল্লা ও তরুন প্রবন্ধে একই দেশে ও পরিবারের দু ভাইয়ের দ্বন্ধের অবস্থা সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছিলেন।
সা¤্রাজ্য হারা, নিজেদের ধর্ম হারা বিকৃত সভ্যতায় অভ্যস্থ তুরস্কের সব চাইতে বড় শহর ইস্তাম্বুল। মাদ্রাসায় পড়–য়া এক যুবক ইসলামী ভাব ধারায় বিশ্বাসী ছোট বেলায় অলিতে গলিতে জীবিকা নির্বাহের জন্যে সেমিট রুটি, মেলন ও লেমন বিক্রি করেছিল। আজ পৃথিবীর অন্যতম প্রভাব শালী এবং আধুনিক শক্তিশালী তুরস্কের একাধারে ১৬/১৭ বছর শাসন কারী অত্যন্ত প্রতাফশালী শাসক। একই সাথে গনতন্ত্রকামী, ও অত্যন্ত সফল প্রেসিডেন্ট রজব তায়ীফ এরদোয়ানের বর্তমানের আধুনিক তুরস্ক সম্পর্কে অনেক কিছু শুনতেছি ও পড়াশুনা করতেছি। সাথে সাথে পরিবর্তিত তুরস্ক দেখার জন্য মন সদা অধীর হয়ে আছে।
“প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও তাঁর পার্টির সফলতা এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে ইসলামী নেতাদের বা আমাদের শিক্ষনীয়” এই হেড লাইনে আমি কিছু লেখা লেখতেছি। তার তথ্যাদি স্বচক্ষে দেখার জন্য ও জানার জন্য এবং লেখাগুলো জনগনের জন্য প্রকাশ করার পূর্বে বর্তমানে দেশটির অবস্থা দেখা উচিত মনে করছিলাম। তাই আমার এবারের তার্কি সফর।
এখানে উল্লেখ করার মত কয়েক বছর পূর্বে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যখন লন্ডন প্রধান মন্ত্রী হিসাবে সফরে এসেছিলেন তখন জনাব মরহুম ব্যারিস্টার আজহার আলী সাহেবের মাধ্যমে তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। তার পর আমরা দুজনে একসাথে তুরস্কে যাবো বা কোন একটি সেমিনারে অংশ গ্রহন করবো এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল া তিনি আকষ্মিক ভাবে ইন্তেকাল করায় আর তা হয়ে উঠলোনা। ইতি মধ্যে আমাদের কয়েকজন বাংলাদেশী ভাই লন্ডন হতে বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহন করায় আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা হলো। শুধু হলিডে করার জন্যেতো যে কোন সময় যাওয়া যায় তাতে কিছু স্মরনীয় স্থান দেখা আর ফটো উঠানো ছাড়া বেশী কিছু জানা যাবেনা। আমার কিন্তুু অফিসিয়ালী অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা তাই বর্তমানের ক্ষমতাশীন শাসক ও অফিসিয়াল ভাইদের সাথে কিভাবে দেখা করা যায় সে জন্যে যোগাযোগ করার চেস্টা শুরু করলাম। ভাই হাসান বাসরী ও ভাই হাকান এরদেম এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক সেই ব্যবস্থা করে দিলেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যদিও তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা কিনÍু সবচাইতে বড় শহর হলো ইস্তাম্বুল।৮কোটি জনগনের মধ্যে ২কোটি ৫০লাখ ইস্তাম্বুলে বাস করে। ঐতিহাসিক স্থানগুলোর অধিকাংশই এই শহরেই অবস্থিত। ব্যবসা বানিজ্যের কেন্দ্রস্থল। শিক্ষা – সেমিনারের কেন্দ্র। এমনকি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের রাজনৈতিক পার্টি আদালত ভে কালকিনমার অর্থাৎ ন্যায় বিচার ও উন্নয়ন সংক্ষেপে একে পার্টির হেড অফিস ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় অফিসগলোও ইস্তাম্বুলেই অবস্থিত। এই ইস্তাম্বুল হতেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উত্থান যেই শহরে জীবিকার জন্যে ফেরী করেছিল।
নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ হলো তারপর ২২ অক্টোবর লন্ডন হতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে রওয়ানা হলাম। বেশ কিছু নেতৃবৃন্দের সাথে কথামত দেখা হলো। অনেক কিছু জানতে চাইলাম উত্তরও পেলাম এবং লেখার জন্য লিখিত উত্তর চাইলাম বললো তৈরা করে যথা সময়ে পাঠিয়ে দেবে। কথামত ইতিমধ্যে পাঠিয়েও দিয়েছে।যে জিনিষগুলো আমি দেখার ও বুজার চেস্টা করেছি তা সংখেপে বর্ননা করার চেস্টা করবো। প্রকৃতপক্ষে আমার আসল লেখা যে জন্যে এবার ইস্তাম্বুলে যাওয়া তা পরে প্রকাশ করা হবে। তার পূর্বে আমার এবার সফরের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষনের বর্ণনা এখানে পাঠকদের উদ্দেশ্যে দেয়া হলো।
কামাল আতাতুর্ক এয়ারপোর্ট:Kamal Ataturk Airport
প্রথমে এয়ারপোর্টে নেমেই হাজার হাজার লোক দেখে কিছুটা চিন্তিত হলাম, কখনযে বের হতে পারবো আল্লাহ পাকই জানেন। কারন লন্ডনের নিজের দেশের বৃটিশ পাসপোর্ট থাকা সত্বেও স্টানস্টেড এয়ার পোর্ট ও মাঝে মাঝে হিথরো এয়ারপোর্টেও এত বেশী সময় লাগে যাতে পাঁয়ে ব্যাথা শুরু হয় বিশেষ করে স্টানস্টেড ও আমেরিকার কেনেডি এয়ারপোর্টে একাধিক বার এই অবস্থার সন্মুুখিন হতে হয়েছে। একাধিকবার লন্ডনের স্টানস্টেড এয়ারপোর্টে প্রায় ৩ ঘন্টা লেগেছিল। যাই হোক সব চিন্তা মিথ্যা প্রমানিত হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ইমিগ্রেশান অফিসারের নিকট হাজির হলাম। পাসপোর্ট চেক করে বললো ভিসা নাই, ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দিলো ভিসা কাউন্টার। মাথায় যেন বাড়ি পড়লো, কখন ভিসা নেবো আবার কখন এত বড় লাইন ধরে কাউন্টারে আসবো। বলে রাখা ভাল সবাইর থেকে জানি বৃটিশ পাশপোর্ট থাকলে ভিসা লাগেনা এর মানে হলো পোর্ট ্এন্ট্রি ভিসা অর্থাৎ এয়ার পোর্টে গেলেই স্টাম্প দিয়ে ভিতরে যেতে দেয়। কিন্তু বর্তমানে এয়ারপোর্টে অথবা অন লাইনে ভিসা নিতে হয় এই কথাটা কেহুই বলে নাই। নতুবা অন লাইনে নিয়েই রওয়ানা হতাম অথবা এয়ারপোর্টে নেমেই ভিসা নিয়ে তারপর কাউন্টারে যেতাম। অবশ্য প্রায় ৩৫ বছর পূর্বে যখন গিয়েছিলাম তখন কোন ভিসারই দরকার ছিলনা। জীবনে এই প্রথম খোঁজ খবর না নিয়ে শিক্ষা হলো। ভিসা কাউন্টারে গেলাম, অবাক হওয়ার মত কান্ড এক মিনিটে ২০ পাউন্ডে একটা রেডি স্টিকার লাগিয়ে দিল। দৌড়ে লাইনে এসে দেখি অবাক, এত সব লোক কোথায় গায়েব হয়ে গেলো। তার মানে তার্কিরা কথা নাই শুধু কাজ আর কাজ। অসংখ্য কাউন্টার খুলে রেখেছে। কোন মুসাফিরের/ট্যুরিষ্টের যেন কোন কস্ট না হয় তারা সেই ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রেখেছে। এই সব কারনেই এই বছর গত ৯ মাসেই শুধু ৩৫ মিলিয়ন তথা ৩ কোটি ৫০ লাখ ট্যুরিস্ট তার্কিতে হলিডে করতে গিয়েছে। বছর শেষে ৪কোটি ট্যুরিস্ট আসবে বলে ধারনা। এয়ারপোর্টের সার্ভিসের ব্যাপারে কোন অভিযোগ নাই। পত্রিকার খবরে দেখা গেছে এই বছর একজন টেক্সি ড্রাইভার একজন ট্যুরিস্টকে অতিরিক্ত চার্জ করার কারনে ৫বছর জেলের সাস্তি দেয়া হয়েছে। এই হচ্ছে এয়ারপোর্ট ও হাজার হাজার টেক্সি সার্ভিসের ব্যবস্থা। নিরাপদে সবাই এয়ারপোর্ট হতে নিজের হোটেলে যেতে পারতেছে। এয়ার পোর্টের ভিতরেই টেক্সির অনেক গুলো অফিস আছে। আপনি গন্তব্যস্থানের ভাড়া নির্ধারন করে নিতে পারেন। তবে দরাদরি করতে পারেন তাতে সামান্য সস্তায় যাতায়াত করতে পারবেন টেক্সি যোগে। (চলবে)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ