মিডনাইট ইলেকশন নির্বিঘ্ন করতেই গণতন্ত্রের মা’কে রাখা হয় কারাবন্দী

Pub: রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ ৩:০৭ অপরাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ ৩:০৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামসুল আলম:

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকার নিয়ে দেশে বিদেশে চলমান আলোচনায় ঘুরে ফিরে দু’টি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে: ১) ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতি এবং ২) খালেদা জিয়ার কারাবাস।

৩০ ডিসেম্বরের তথাকথিত নির্বাচনের পূর্নাঙ্গ মূল্যায়ণ পেতে হয়ত আরও সময় লাগবে, তবুও একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ঐ নির্বাচন প্রহসণে আগের রাতের ব্যালট বাক্স ভরা থেকে শুরু করে সরকারী দলের ভোট ডাকাতি, জাল জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল, ভোটারদেরকে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করা, বিরোধী দলের অর্ধ লক্ষ নেতা কর্মীদের বেআইনীভাবে আটকে রেখে এবং বিদেশী পর্যবেক্ষদেরেকে দেশে ঢোকা রুদ্ধ করে দিয়ে ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের হাজার কোটি টাকা উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে প্রায় শতভাগ বা কোথাও তারও বেশি ভোট নিজেদের পক্ষে দেখিয়ে সরকারী দল আওয়ামীলীগ যেভাবে নির্বাচনটি কব্জা করে নিয়েছে, তার বিবিধ বিবরণ দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই চাতুর্যপূর্ন ও বাটপারির নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো নিরপেক্ষ পূর্নাঙ্গ তদন্ত চেয়ে চাপ সৃষ্টি করেছে। এনিয়ে মিডনাইট সরকার খুবই বিব্রত, বিশেষ করে যে বিএনপি তিন বার ক্ষমতায়, এখনও যার ক্ষমতায় থাকার কথা, সে দলকে যখন ৫/৬ আসনে বুকড করে দেয়া হয়, যেখানে বিএনপির প্রার্থী নিজেই ভোট দিতে পারে না, যেখানে বিএনপি প্রার্থীকে শূণ্য ভোট দেখানো হয়, আগের নির্বাচনের বিএনপি প্রার্থী যেখানে ৩/৪ লাখ ভোট পেয়েছিল সেখানে এবার ২/১ শ ভোটপ্রাপ্তি, অথচ আ’লীগ প্রার্থীর গায়েবী ভোট হয়ে যায় ৩/৪ লাখ- এসব কেমন করে হলো, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আ’লীগ নেতারা গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছে! টিভি টকশোতে সরকারী বুদ্ধিজীবি স্তাবকরা শুধু ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝিয়ে চলেছেন- নির্বাচনে ডাকাতি হলেও সঠিক হয়েছে তাদের বিবেচনায়, মাঝরাতে ভোট না কাটলেও নাকি ফলাফল এমনই হতো! তবে এই ভোট ডাকাতির নির্বাচনের দ্বারা সবাইকে হাতে কলমে বুঝিয়ে দিলো, আ’লীগের সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, আর এ কারনেই দরকার কেয়ারটেকার দরকার। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কি পরিবেশ প্রয়োজন, সেটা সবাই এবার হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করছে।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গত এক বছর ধরে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে (আসলে সলিটারী কনফাইনমেন্টে আছেন)। দুর্নীতি সংক্রান্ত দুদকের দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত, যে বিচারকের কাছে সুবিচার পাওয়া যাবে না বলে অনাস্থা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া, তাকে দিয়েই রায় ঘোষণা করা হয়! অন্যদিকে বিচারক এতটাই মোটিভেটেড ছিলেন যে, আদালতে দেয়া খালেদা জিয়ার বক্তব্যের অংশবিশেষকে উল্টো অর্থে ব্যাখ্যা করে অপরাধের স্বীকারোক্তি বানিয়ে ফেলেছেন! অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ঐ টাকা আত্মস্যাৎ তো হয়নি বরং ব্যাংকে পড়ে আছে তিনগুণ হয়ে। তাছাড়া ঐটাকা কোনো সরকারী তহবিলের টাকা ছিলনা, বরং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার নামে এতিমখানা নির্মান করতে কুয়েতের আমিরের দেয়া অনুদানের অংশবিশেষ। সেই অনুদানের অর্ধেক টাকায় বাগেরহাটে এতিমখানা করা হয়, এবং তা নিয়ে কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি। অথচ যে টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে, সেটা আত্মস্যাৎ হিসাবে চালিয়ে দিয়ে খালেদা জিয়াকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে! অন্যদিকে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জমি কেনায় অনিয়মের অযুহাত তুলে খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের জেল দেয়া হয়, যার সাথে খালেদা জিয়া জড়িতই নন। এই দুই মামলায় জামিন পাওয়ার পরও আরও ৩৫টি মামলায় কোনোটায় শ্যোন এরেস্ট, কোনোটায় প্রাপ্য জামিন না দিয়ে, এমনকি জামিনের শুনানী করতে টালবাহানা করে বছর পার করে দেয় আজ্ঞাবহ আদালত। বিশেষ করে কুমিল্লায় গাড়ি পোড়ানোর মামলায় সম্পূর্ন অন্যায়ভাবে জড়িত করা হয়েছে বেগম জিয়াকে, যেখানে ঘটনার আগে পরে তিনি ছিলেন পুলিশ দ্বারা গৃহবন্দী, এবং সেখানকার টেলিফোন ইন্টারনেট লাইন কেটে, জ্যামার দিয়ে মোবাইল নেটাওয়ার্ক বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তেমনি এক সময়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সংঘটিত রহস্যজনক বাস পোড়ানোর ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী করা হয়, এবং সেখানে দুটি মামলায় জামিনের আবেদন নাকচ করতেই বছর পার করে দেয় নিম্ন আদালত! আরো কয়েকটি ঠুনকো বানোয়াট মামলায় নিম্ন আদালত বা হাইকোর্ট জামিন দিলেও এটর্ণী জেনারেল সেই জামিন বাতিল করতে আপীল বিভাগে ছুটে গিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছেন একাধিকবার। এসব ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ৭৫ বছর বয়স্ক সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে আইনানুগ সুবিধা থেকে বঞ্ছিত করে তাকে কারারুদ্ধ রাখাকে হাসিনা তার এক নম্বর প্রায়োরিটি হিসাবে বাস্তবায়ন করেছে।

কিন্তু সরকার কেনো খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখতে চায়? কেনো শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বেগম জিয়ার জামিন সহ প্রাপ্য আইনী সুবিধাগুলি দলন করে এক বছর ধরে আটকে রেখেছেন? এর কারণ খুঁজতে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। তিন দশকের ঘটনাবলীর দিকে তাকালে দেখা যাবে নব্বই পরবর্তী ৯১ সালের প্রথম নির্বাচনে যেখান আ’লীগ নেত্রী জয় নিশ্চিত ধরে কেবিনেট তৈরী করে ফেলেছিলেন, সেখানে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর তিন বছরের মধ্যেই কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে আ’লীগ মারাত্মক আন্দোলন শুরু করে সংসদ ছেড়ে যায়, পরে তা আদায় করে ৯৬ সালে জনতার মঞ্চের কর্মকর্তাদের সহায়তায় ফলাফল কারচুপি করে ক্ষমতায় বসেন শেখ হাসিনা। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি আবার ব্যাপকভাবে পরাজিত হন খালেদা জিয়ার কাছে। এর পরেই তিনি সতর্ক হয়ে যান। মেয়াদ শেষে ২০০৭ সালের নির্বাচনটি বয়কটের মাধ্যমে জরুরী সেনা শাসন এনে শিখন্ডি জেনারেল মইনের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে ৯০% আসন লিখে নিয়ে নাম-কা-ওয়াস্তের নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় বসেন শেখ হাসিনা। এই পিরিয়ডে তিনি কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধানটি বাতিল করে দেন। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যেতে রাজী না হলে বেগম খালেদা জিয়াকে পুলিশ ও বালির ট্রাক দিয়ে গৃহবন্দী রেখে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ১৫৪টি আসনে সিলেকশনের ইলেকশন করেন শেখ হাসিনা, বাকী ১৪৬টিতে ভোট পড়ে ৫ শতাংশের মত। ঐ নির্বাচনটিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ডিপলি ফ্লড’ ইলেকশন আখ্যা দিয়ে তিন মাসের মধ্যে আরেকটি ফেয়ার ইলেকশনের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু টালবাহানা ও চরম ফ্রডবাজি ও অত্যাচার নিবর্তনের দ্বারা নির্বাচনের সে দাবিকে থামানো হয়।

বিনাভোটের সরকারের মেয়াদ শেষে আসে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ভোটে অংশ নিলেও প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তখনও বসা ছিলেন শেখ হাসিনা। দেশে বিদেশে এমনকি প্রতিবেশী দেশের জরিপে উঠে আসে আ’লীগের ভরাডুবির আগাম সতর্কবার্তা। এ নির্বাচনে খালেদা জিয়া যাতে অংশ নিতে না পারেন, সেজন্য তাঁর বিরুদ্ধে ২টি মামলায় রায় দিয়ে অযোগ্য করে রাখা হয়, যদিও একই অবস্খায় সরকারী দলের অনেকে ভোট করেন। খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রেখেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু শিডিউল ঘোষণার প্রথম দিন থেকে সরকারী দলের প্রচন্ড মারমুখি আক্রমন এবং পুলিশবাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় ও তান্ডবের মুখে বিরোধী দলকে মাঠে নামতেই দেয়া হয়নি। আর এইভাবে নির্বাচনটি নির্বিঘ্নে করার লক্ষেই সুপরিকল্পিতভাবে খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা হয়েছিল কারাগারে। কারণ তিনি বাইরে থাকলে দেশী বিদেশী চাপ তৈরী করতে পারতেন, ফলে সরকারের কূটকৌশল ভেস্তে যেত। অবশেষে, দলবাছাই ডিসি/এসপি/প্রিজাইডিং/পোলিং অফিসার নিয়োগ দিয়ে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে নৌকাকে বিজয়ী করা হয়। ব্যালটে সিল দেয়ার দায়িত্বটি পালনে করে পুলিশের লোকেরাই। আর এ কারণে তাদেরকে১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দেয় সরকারী দল। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে এই প্রথম দেখতে পেলো- ভোটের আগেই কেমন করে নির্বাচন শেষ হয়ে যায়!

তবে ঐ ভোটের আগে থেকে কারাবন্দী খালেদা জিয়াকে নানা শর্তের জালে আবদ্ধ করে মুক্তি দেয়ার টোপ দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল সরকার। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য এই বয়সে খালেদা জিয়া ত্যাগ স্বীকার করছেন, অসুস্থ শরীরে কারাগারে রয়েছেন, কিন্তু আপোষ করেননি। জনগনের সাথে বেইমানী করে শেখ হাসিনার সাথে আঁতাত করলে তিনি কেবল মুক্তিই পেতেন না, সুযোগ সুবিধা নিয়ে আরাম আয়েশে থাকতে পারতেন। কিন্তু গণতন্ত্রের মা হয়ে তিনি জনগনের সাথে থেকেই সংগ্রামের পথে আছেন, একটি সুন্দর সুখি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টায়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ