বাংলাদেশে সুস্থ অর্থনীতির অন্যপিঠ

Pub: বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫, ২০১৯ ১:০৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫, ২০১৯ ১:০৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আলী রীয়াজ :
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি অব্যাহতভাবে তার উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখবে ২০২০ সালেও। এটা স্বস্তি দিয়েছে সরকারকে। যা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোবল বৃদ্ধি করছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ভূমিকার জন্য আওয়ামী লীগ সমালোচিত হচ্ছে। ওই নির্বাচনকে বিশ্বের রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা ‘প্রহসনের’ বলে ব্যাপকভাবে আখ্যায়িত করেছেন।
যদিও বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব হিসাবের চেয়ে এসব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কম, তবু ব্যাপকভাবে একমত যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শতকরা ৭ ভাগের ওপরে, যা এখনও আকর্ষণীয় বিষয়। বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম এই দেশটি। কিন্তু ইতিবাচক রিপোর্টের সঙ্গে হুঁশিয়ারিও রয়েছে, যা সরকার বা তার সমর্থকদের উল্লেখ করার ঘটনা বিরল।

দেশটির ব্যাংকিং খাত মারাত্মক সংকট মোকাবিলা করছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার কথা হলো, পরিমাণে ক্রমবর্ধমান নন-পারফারমিং লোনের (এনপিএল) বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

২০১৮ সালের জুনে এনপিএল-এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০৮০ কোটি ডলার। অর্থনীতিতে যা মোট আউটস্ট্যান্ডিং লোনের শতকরা ১০.৫ ভাগ। এই পরিমাণ আরো বাড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে ব্যাংকিং খাতটি ঋণখেলাপিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। খেলাপিদের বিষয়টিতে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সরকার ব্যাংকিং খাতে অর্থ সরবরাহ করে চলেছে। বার বার প্রস্তাব করছে বেইল-আউট। একই সঙ্গে কম সুদে ঋণ পুনঃনির্ধারণে অনুমতি দিচ্ছে সরকার।

সরকারের এই নমনীয় মনোভাব এজন্য যে, অনেক খেলাপি তাদের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টি বিবেচনা করা হয় তা অনেক সময় রাজনৈতিক যোগসূত্র। একই রকম ঘটনা বিবেচনা করা হচ্ছে ঋণ পরিশোধের সময় পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে, যেন তা কখনোই ফেরত দিতে হবে না। প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। তাদের এমন দুর্বল পারফরমেন্স সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে আরো তিনটি ব্যাংক। এটা হলো ক্লাসিক আত্মীয়করণ।

ব্যাংকিং খাতটা হলো সার্বিক ত্রুটিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থার একটিমাত্র প্রতীকী খাত। ভয়াবহ দুর্নীতি ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এখানে একটি আদর্শে পরিণত হয়েছে। যেন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা অথবা এর নেতাদের জন্য সবকিছুই সম্ভব।

নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে গত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হতে সাহায্য করেছে। এর অর্থ হলো নির্বাচনী ব্যবস্থায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ভোটাররা। অস্বাভাবিক কম ভোটার ভোট দিয়েছেন ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে এবং সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া উপজেলা নির্বাচনে। এতে ফুটে ওঠে যে নাগরিকদের নির্বাচনের প্রতি আস্থা টুটে গেছে।

এটা দুর্ঘটনাক্রমে ঘটে নি। ঘটেছে পরিকল্পনামতো। সমাজকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে এবং সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করতে যে সমন্বিত প্রচেষ্টা তা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে এবং আরো ক্ষমতার অধিকারী হতে সাহায্য করছে। বিস্মিত হওয়ার বিষয় নয় যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একদলীয় ব্যবস্থা, যা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান চালু করেছিলেন ১৯৭৫ সালে, তা ভোটারবিহিন নির্বাচনের সমস্যা সমাধানের একটি উপায়।
বাংলাদেশিদের মধ্যে পরিহার ও ক্ষমতাহীন হওয়ার একটি মেজাজ আছে। অপকর্ম, যার ফলে আগে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হতো, নৈতিক ক্ষোভের সৃষ্টি করতো তা ক্রমশ গা-সওয়া হয়ে উঠেছে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনে আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে এবং সরকার মাঝেমধ্যেই অতিমাত্রায় আইনি পদক্ষেপ ব্যবহার করছে। এর মধ্য দিয়ে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। বিরোধী দল বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিজেদের সংগঠিত করতে এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর ব্যর্থতা হলো হতাশার একটি কারণ।

নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। তারা প্রকাশ্যে বলেছে, তাদের নির্বাচিত ৬ জন সদস্য জাতীয় সংসদে যোগ দেবেন না। কিন্তু বিরোধীদলীয় জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একটি অংশ গণফোরাম পার্টির দু’জন এমপি রীতি ভঙ্গ করেছেন। তারা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছেন, অন্যরাও কি তাহলে একই লাইন অনুসরণ করবেন কিনা।
ঢাকার বাতাস গুজবে ভারি হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, বিএনপি ও সরকারের মধ্যে বোঝাপড়ার একটি চুক্তি হচ্ছে। এতে বলা হবে, ওই নির্বাচিত ৬ জন এমপিকে পার্লামেন্টে যোগদানের বিনিময়ে প্যারোলে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া হচ্ছে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে।

কিন্তু এ গুজবকে উড়িয়ে দিয়েছে বিএনপি। দুটি দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে রয়েছেন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে আরো ৩৪টি মামলা মুলতবি আছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। আইনজীবীরা তার জামিন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সরকার তা আটকে দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তবে সরকার বলেছে, বিচার বিভাগীয় কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো হাত নেই। জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৩৪৪টি আসনে অপ্রত্যাশিত বিজয় ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল এখনও মনে করছে যে, জাতীয় সংসদের নৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য বর্জন করা ওই ৬ জন সদস্যকে তাদের ফেরানো প্রয়োজন। এবং দৃশ্যত দেখানো হবে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ম্যানেজড। বিএনপিকে পার্লামেন্টে ফেরাতে চাওয়া বাইরের চাপে কিনা অথবা দলের ভিতরে উদ্বেগের কারণে কিনা তা একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন। তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক অবনতিশীল ধারা বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের ওপর ভয়াবহ অসন্তোষ নিজেই নিজের প্রকাশ ঘটায়, কখনো তা দলহীন সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে, যেমন শ্রমিক অসন্তোষ। আলাদা আলাদা বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভকে একত্রিত করে পপুলার এজিটেশন বা জনপ্রিয় ক্ষোভের চিত্রের প্রকাশ ঘটায়। এর মধ্যে রয়েছে জানুয়ারিতে গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন। মার্চে দ্বিতীয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন।

পাটকলখাতে চলমান অসন্তোষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ। এর পরে আরো আছে হয়তো। এসব এখনও সরকারের প্রতি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে নি। কিন্তু বাংলাদেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে যে অসন্তোষ বাড়ছে তারই প্রতিনিধিত্ব করে।
(ড. আলী রীয়াজের লেখা এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন ইস্ট এশিয়া ফোরামে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিঙ্গুইজড প্রফেসর)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ