নুসরাত রাফি: তার আর্তনাদ আর প্রতিবাদ কি শুনবে বাংলাদেশ?

Pub: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ ২:১১ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ ২:১১ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

নুসরাত জাহান রাফি ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন, ঐ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। সোনাগাজী থানায় মামলাও দায়ের করা হয়েছিল।

এই এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহেই আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে যান নুসরাত। ষড়যন্ত্র করে তাকে সেখান থেকে ডেকে নেয়া হয়। তারপর হাতমোজা-পা মোজা এবং নেকাব পরা একদল দুর্বৃত্ত তাকে কেরোসিন জাতীয় পদার্থ ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। শোনা যায় এরা কেউ কেউ পরীক্ষার হলেও ফেরত যায়।

শতকরা ৮০ ভাগ পুড়ে যাওয়া নুসরাতকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়, অচল হয়ে আসছিল তার হার্ট-কিডনি-ফুসফুস, ঘোরের ভিতর তিনি ‘উস্তাদ’এর নাম নিতেন বলে জানা যায়, চারদিনের মতো বেঁচে থেকে নুসরাত মারা যান।

বীভৎস এই হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ উদ্বেল হয়, সামাজিক গণযোগাযোগ মাধ্যমগুলি সোচ্চার হয়, শাহবাগ থেকে শহীদ মিনার উচ্চকিত হয়, পথে নেমে আসেন সর্বস্তরের মানুষ, পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় কালো শাড়ি পরেন মেয়েরা। আমরা শুনতে পাচ্ছি দ্রুত এই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করা হবে।

এই পর্যন্ত আমরা সবাই কমবেশি জানি, পড়েছি, শুনেছি।

বাকি ইতিহাস আমাদের অজানা। আমরা জানি না, নুসরাতের ওপর যখন এর আগেও হামলা করা হয়েছিল, চুনকালি মাখাবার ঘটনা হয়েছিল তখন প্রশাসন কেন বিচলিত হয়নি। আমরা জানি না, শ্লীলতা হানির মামলা দায়ের করার পর যখন বাদীপক্ষের ওপর শুধু চাপ দেয়া হচ্ছিল সিরাজ উদ-দৌলার পক্ষ থেকে, তখন বাদীপক্ষকে নিরাপত্তা দেবার দায় কার।

জাগো মানুষ: নুসরাত হত্যার বিচারের দাবীতে ঢাকায় বিক্ষোভ ।
আমরা এও জানি না, মাদ্রাসায় কিংবা স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের কালে কেন শিক্ষকদের পূর্বাপর জীবন-ইতিহাস খতিয়ে দেখা হয় না, কেন শিশুখোর রাক্ষসদের শিশুদের পড়াতে পাঠাবার আগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এতটুকু চিন্তা করে না।

আর সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এই, আমরা আসলেই জানি না, নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারবার চেষ্টা করবার পরেও আরো কত শিশু-কিশোর এইসব আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

নুসরাত-হত্যার শাস্তি প্রদান তাই এই মামলার শেষ নয়। শিশু-কিশোর নির্যাতনের গর্হিত অধ্যায়ের অবসান হবার সূচনামাত্র।

আমাদের দেশে তো কয়েক দশক আগের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি ধর্মবিষয়ক বই মানুষকে পড়ানো হচ্ছে এবং তারা ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। অথচ এইসব শিক্ষকদের ভেতরই কেউ কেউ ছাত্রীকে ধর্ষণ করতে পারে, পুড়িয়ে মারবার ষড়যন্ত্র করতে পারে।

এইসব ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ সেই ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে, আগুন দিতে পারে তার সহপাঠীর গায়ে, আগুন দিয়ে পরীক্ষার হলে ফিরে এসে পরীক্ষা দিতে পারে, মৃত সহপাঠিনীর হত্যার বিরুদ্ধে মিছিলও করতে পারে।

শিশুরা কতটুকু নিরাপদ?: বাংলাদেশের স্কুল-মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের সময় তাদের ইতিহাস কি খতিয়ে দেখা হয়?
ইসলাম ধর্ম যাকে অন্তর থেকে শিখতে হয়, শেখাতে হয়, তাদের তো এমন অপরাধের কথা ভাবলেও কেঁপে উঠবার কথা। ধর্ম তো প্রথমত এবং প্রধানত নৈতিক সততার শিক্ষা দেবার কথা। ধর্ম তো অন্যায় না করতে শেখাবার কথা, ধর্ম তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখাবার কথা।

তাহলে মাদ্রাসায় এমন সব ভয়ানক নির্বিকার অপরাধী ছাত্র এবং নারীর প্রতি সহিংস শিক্ষকের দেখা পাচ্ছি কী করে? কেমন করে প্রতিদিনই পড়ছি এমন সব খবর, বই দেয়ার কথা বলে কওমি মাদ্রাসায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ, ইমাম কর্তৃক শিশু ধর্ষণ, মাদ্রাসা ছাত্রকে পিটিয়ে মারলেন শিক্ষক, আলেমের ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা ক্লাস ফোরের শিশু, নগ্ন ছবির ভয় দেখিয়ে হুজুরের ধর্ষণ?

আমাদের দেশে মাদ্রাসায় বহু শিশু পড়তে যায়, জীবন সুন্দর আর সার্থক করার কোমল প্রত্যাশা নিয়েই যায়। তাদেরকে বিজ্ঞানমনস্ক করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাদের ভূগোল ঠিকমতো পড়াবার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার, তারা ইবনে খলদুনের ভাষ্য অনুযায়ী এখনো পৃথিবী ফরাসের ন্যায় চ্যাপ্টা জানে কি না তা দেখবার দায় রাষ্ট্র অস্বীকার করতে পারবে না।

জীবন সুন্দর আর সার্থক করার কোমল প্রত্যাশা নিয়েই শিশুরা মাদ্রাসায় পড়তে যায়।
তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে নারীর প্রতি- বিজাতীয়ের প্রতি- বিধর্মীর প্রতি বিদ্বেষ চর্চা শেখানো হচ্ছে কি না, তা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের বৈকি। কমবয়স্ক শিশুরা কেন পরিণতবয়স্ক শিক্ষকের সাথে একই কামরার মেঝেতে শুয়ে থাকবে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সর্বোপরি, তাদের অনেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশু- পিতৃ-মাতৃহীন শিশু- দুষ্টুমির কারণে বাপেখেদানো শিশুও অনেক…এদের প্রতি মাদ্রাসায় যে অসম্ভব শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চলে তা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। হাজার হাজার শিশু (ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে) যদি শারীর-মানসিক নিপীড়নের স্মৃতি নিয়ে বড় হতে থাকে, তবে তা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য কখনোই শুভ হতে পারে না।

শুধু রাষ্ট্রের আর প্রশাসনের দায়িত্বর কথা বলে গেলাম। সামাজিক দায়িত্বও তো আমাদের অনেক। শিশু তার প্রতি নির্যাতনের কথা অনেকভাবে প্রকাশ করে, মুখ ফুটে বলে- ছবি এঁকে বলে – জিনিসপত্র তছনছ করে বা পুতুল বিকৃত করে বলে- ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়ে নিরুচ্চারেও বলে। আসুন তাদের বিশ্বাস করি। নির্যাতনের কথা বলে দেয়া বেয়াদবি নয়, নির্যাতনের কথা চাপা দিয়ে আবার নির্যাতকের কাছে পাঠানো বে-ইনসাফি।

আর সে যদি পুড়ে মরতে মরতে বলে যায়— “আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলবো, সারা পৃথিবীর কাছে বলবো, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবার জন্য।” তাহলে তার পক্ষে প্রতিবাদ না করলে আমি-আপনি মানুষই নই।

মাঝে মাঝে আন্তরিক ক্লান্তিতে মনে হয়, কত প্রসঙ্গে আর কতবার পথে নামতে হবে? যতবার মানুষের বেঁচে থাকবার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে, সুন্দরভাবে বাঁচবার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে, ততবার। আমাদের এ অঙ্গরাগ, মিছিলের পায়ে ওড়া ধূলি।

আমাদের সমাজ অনেক বদলেছে, সাধারণ মানুষের ভিতরে যে সরলতা- যে ইমানদারি আগে দেখা যেত, তা নেই। প্রশাসন নিজেই যদি দোষদুষ্ট হয়, অপরাধের যদি ক্রমাগত ক্ষমা জোটে, তাহলে সাধারণ মানুষের চরিত্র বদলাবেই।

নগর পুড়বার আগুন যেমন দেবালয়কেও কবলিত করে, তেমন করেই ধর্মশিক্ষার আলয়গুলি এই সর্বব্যাপী সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। সমাজে অপরাধের কমতি নেই, ধর্মীয়-শিক্ষা দেবার স্কুল ও মাদ্রাসার ভিতরেও অপরাধের অন্ত নেই, সেইসব অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষক- ছাত্রকে সোচ্চার হতে দেখা যায় না তাই। বরং তাদেরকেই আমরা দেখতে পাই ঘৃণ্য অপরাধীর ভূমিকায়।

নুসরাতের বাবা আহাজারি করে বলেছেন— ঘরবাড়ির আগুন দেখা যায়, মনের আগুন দেখা যায় না। যে ফুটফুটে কিশোরী আর ইহপৃথিবীর নীল আকাশ দেখবে না, হাত ভরে রেশমি চুড়ি পরবে না, সে যে বলে গেছে— আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলবো?

সে যে বিশ্বাস করে গেছে বাংলাদেশকে বলে দিলে এই অত্যাচারের অবসান হবে, নিপীড়নকারীর শাস্তি হবে। বাংলাদেশ এইসব শিশু-কিশোরহন্তাদের ক্ষমা করে দেবার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাক।

নুসরাতের বিদেহী আত্মার সত্যিকারের শান্তি হোক।
সাগুফতা শারমীন তানিয়া
লেখক, লন্ডন


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ