fbpx
 

কৃষকের ধানে আগুন, কার লাভ! কার ক্ষতি!

Pub: রবিবার, মে ২৬, ২০১৯ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: রবিবার, মে ২৬, ২০১৯ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহফুজুর রহমান : দেশের সাধারণ কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন; ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে সড়ক অবরোধ করছেন। এমনকি আত্মহত্যাও করছেন। ২০১৯ সালের ২১ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের অভাবী কৃষক ঈদে সন্তানদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঠিক সে সময় দেশের কৃষকদের বঞ্চিত করে ভারত থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে। হিলি স্থল বন্দরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে শুধুমাত্র হিলি স্থলবন্দর দিয়েই ভারত থেকে ১১ হাজার ৮শ ৬৮ মেট্রিক টন, ফেব্রুয়ারী মাসে ৭ হাজার ৯শ ৬৫ মেট্রিক টন, মার্চ মাসে ৯ হাজার ৬শ ৯৭ মেট্রিক টন এবং এপ্রিল মাসে ৮ হাজার ২শ ১২ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। চলতি মে মাসেও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে এখন পর্যন্ত ভারত থেকে ৬ হাজার ৩শ ৪৪ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের সবকটি স্থল এবং নৌবন্দর দিয়ে প্রতিনিয়তই চাল আমদানি করা হচ্ছে।
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা সত্বেও সরা বিশ্বেই ফসলের উৎপাদন নির্ভর করে প্রকৃতির উপর । অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার কৃপার উপরই নির্ভর করে শস্যের ফলন। আল্লাহর রহমতে দেশে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি করা প্রচুর চালের মজুদ থাকায় এবং ভারত থেকে চাল আমদানি অব্যাহত থাকায় দেশের কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পচ্ছেন না। সরকার লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে কৃষকদের স্বার্থে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রজ্জাক ২০১৯ সালের ১৮ মে রাজধানীতে আইডিবি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন “ এই মুহুর্তে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে দাম বাড়ানোর কোন সুজোগ সরকারের নেই। গুদাম সংকট এবং রাজনৈতিক কারণে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে গেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কৃষকদের নাম দিয়ে লুটপাট করবে।” তিনি আরো বলেছেন ‘ফ্রান্সের কৃষকরাও দুধ বেচতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেয়।”কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশের কৃষকরা ধানে আগুন লাগিয়ে দিতেই পারে। সরকারের ভাষ্য মতে বাংলাদেশতো এখন সিঙ্গাপুর কানাডাকে ছাড়িয়েও বহুদুর।
আর খাদ্যমন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য এমপি ধিরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেছেন ‘প্রয়োজনে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে বঙ্গপসাগরে ফেলে দেয়া হবে।”
তবে এই পরিস্থিতিতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্টারনেটের ৫জি সেবা নিয়ে বেশ উচ্ছোসিত। ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হাইস্কুল মাঠে এক জনসভায় শেখ হাসিনা ১০ টাকা সের চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেলেন। গত দশ বছরেও শেখ হাসিনা সেই প্রতিশ্রুতি পূরন করতে পরেননি। ধানের বাম্পার ফলনে শেখ হাসিনার সামনে এইবার সেই সুজোগ এলেও দেশের জনগণকে দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে তার আগ্রহ নেই। কারণ ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারীর নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বুঝে গেছেন জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরন না করেলেও কোন সমস্যা নেই।
ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার সংকটে একটি বিষয় স্পষ্ট, দেশে কি পরিমান খাদ্যশস্যের উৎপাদন হচ্ছে, কি পরিমান ঘাটতি আছে এবং কোন খাদ্যশস্যের কি পরিমান আমদানি করা প্রয়োজন তার কোন সঠিক হিসাব বা তথ্য সরকারের কাছে কিংবা কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। সরকার এই সব বিষয় নিয়ে কাজ কারার গুরুত্ব বা প্রয়োজন বোধ করে না। যদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সঠিক ভাবে কাজ করতো তাহলে এই সংকট তৈরী হতো না। আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করে বাংলাদেশকে খাদ্যে সংয়সম্পূর্ন করা এই সরকারের অন্যতম সাফল্য। এখন বলাই যায় সরকারের এই দাবির কোন ভিত্তি নেই। কারণ সরকারের কাছে যদি সঠিক তথ্য থাকতো তাহলে সরকার আগাম ব্যবস্থা নিতো। ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ রাখতো। আর একদিকে সরকার বলছে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন অন্য দিকে প্রতি বছরই বাংলাদেশকে লাখ লাখ টন খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমান প্রায় ৪০ লাখ টন চাল আমদানি করেছে।
বর্তমানে দেশে ধানের কেজি ৮-১২ টাকা এবং মন ৩৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা আর কৃষকের ধানের উৎপাদন খরচ মনপ্রতি ৯০০ টাকা এবং মান অনুযায়ী চালের কেজি ৪০-৬৫ টাকা। ধানের দাম কমার পরও রহস্যজনক কারণে দেশে চালের দাম কমছে না। সম্প্রতি দি এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বিআরআইইএফ প্রকাশিত ‘দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব রাইস ট্রেড বিটুইন বাংলাদেশ ইন্ডিয়া এন্ড নেপাল” শীর্ষক গবেষনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২০ মাসে শুধুমাত্র ভারত থেকে প্রায় ২৪ লাখ টন চাল আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয়েছে ৯৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৫৫ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৩ হাজার টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ৪০ লাখ টন। ২০১৯ সালে এখন পর্যন্ত ২ লাখ টন আমদানি করা হলেও পাইপলাইনে আরো ৩ লাখ ৮০ হাজার টন রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো কেনো চাল আমদানি বন্ধ করা হচ্ছে না বা কৃষকদের পাশে সরকার দাড়তে পারছে না ? শুধুমাত্র কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিলেও কৃষকদের বাঁচাতে এবং ধানের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কেনো সরকার ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে পারছে না ? এর কারণ হলো সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী ও এমপিরা খাদ্যশস্য আমদানি ব্যবসার সাথে জড়িত। যদি সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মুল্যে ধান কিনে, তাহলে সরকারি দলের এইসব প্রভাবশালী নেতারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে, অপর দিকে কৃষকরা লাভবান হবেন। দেশের সাধারণ জনগণ কমদামে চাল কিনতে পারবেন। আর যদি সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনে তাহলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন, দেশের সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হবেন, অপরদিকে খাদ্যশস্য আমদানির সাথে জড়িত প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের নেতারা লাভবান হবে। যেহেতু এই সরকারকে ক্ষমতায় বসতে দেশের সাধারণ জনগণের প্রয়োজন পরেনি তাই সরকার দেশের কৃষক বা সাধারন জনগণের পক্ষে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ভারত থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রাখলে ভারতের কৃষকরা লাভবান হবে, ভারত সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের পাশে থাকবে।
দেশের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে জড়িত। জিডিপির প্রায় ২৩ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ অথচ এই খাতেই সরকারের কোন গুরুত্ব নেই ? এখন যত কিছুই করা হোক না কেনো বা যত পদক্ষেপই গ্রহণ করা হোক না কেনো ক্ষতিগ্রস্থ হবেন দেশের সাধারণ কৃষক এবং সাধারণ জনগণ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ