জিডিপি আপ : কিন্তু ইকনোমি ডাউন ??

Pub: সোমবার, জুন ১৭, ২০১৯ ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, জুন ১৭, ২০১৯ ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহফুজুর রহমান : বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হয়ে যাচ্ছে বা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি কানাডার মতো দেশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে; দেশের নেতামন্ত্রীরা প্রয়ই এই সব কথা বলে থকেন। শুধু নেতামন্ত্রীরাই নন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন “বাংলাদেশকে জাপান বানাবো”। ২০১৯ সালের ২৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “দ্য জাপান টাইসম” পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে তার এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার নেতা মন্ত্রীদের এই সব বক্তব্য মন্তব্য অবশ্যই ইতিবাচক। নেতা মন্ত্রীদের এইসব কথা হয়ত সামনে আমরা আরো অনেক শুনবো। তবে তাদের এই বক্তব্য মন্তব্যের সাথে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্রের কি, কোন মিল আছে ? বর্তমান সরকার দাবি করে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে থেকে মধ্যমআয়ের দেশে উন্নিত হয়েছে। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকলীন সময়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে থুক্কু দিয়ে বলেছিলেন মধ্যমআয়ের দেশ বলতে কিছু নেই।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতির পরিমাপক হিসাবে বর্তমান সরকার জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) এর সূচকের উন্নতির কথাই ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য মতে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি ছিলো ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছিলো। ২০০৭ থেকে ২০১৯, গত ১২ বছর সময় লেগেছে দেশের জিডিপি ৭ থেকে ৮ শতাংশে পৌঁছতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর প্রাথমিক প্রাক্কলনে চলতি ২০১৯ সালের অর্থবছরের জিডিপি হতে যাচ্ছে ৮ শতাংশ। অর্থবছরের ৯ মাস শেষ না হতেই প্রাথমিক হিসাব থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তবে সরকারের দাবিকৃত এই জিডিপি বিশ্বসযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে দেশের গবেষনা সংস্থাগুলো।


বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষনা সংস্থা (বিআইডিএস) ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল দেশের সার্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে এক আলোচনা সভায় সরকার ঘোষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিআইডিএস এর গবেষনায় উঠে এসছে দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান বাড়েনি। সরকার রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়কে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সূচক নির্ধারনে বড় উৎস হিসাবে বিবেচনা করছে। অথচ গত কয়েক বছরে রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয় এই দুটোরই গড় প্রবৃদ্ধি কমেছে।
২০১৯ সালের মে মাসে কর্মসংস্থানের আশায় ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালি যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে ৩৯ বাংলাদেশী নিহত হয়। ২০১৫ সালেও একই ভাবে ৩১ বাংলাদেশী ভুমধ্যসাগরে ডুবে নিহত হয়েছিলো। ২০১৯ সালের ১৩ জুন রেডক্রিসেন্ট এবং রয়েটার্সের তথ্য অনুযায়ী ভুমধ্যসাগরের তিউনিশিয়া উপকূলে ৬৪ বাংলাদেশী, কর্মসংস্থানের আশায় ইউরোপ পাড়ি দেবার পথে ১২ দিন যাবৎ ভুমধ্যসাগরে ভাসছে। দেশে কর্মসংস্থান না থাকায় অবৈধ ভাবে মালয়শিয়াতেও হাজার হাজার বাংলাদেশী পাড়ি জমাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে সরকারিভাবে শ্রমিক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমানে না থাকায় এবং দেশে কর্মসংস্থানের ব্যপক ঘাটতি থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে চাচ্ছে।
২০১৯ সালের ১৪ জুন বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছেন দেশে কর্মসংস্থানের অভাব নেই। আর বাস্তবতা হলো দেশে প্রকৃতকর্মহীন বা বেকার মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ ভাগের ১ ভাগেরও বেশী। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ঘুরিয়ে বলছে এরা শ্রমশক্তির বাইরে। আর প্রকৃত বেকারের সংখ্যা দেখাচ্ছে ২৬ লাখ ৮০ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১০ লাখ ৪৩ হাজার। প্রকৃত পক্ষে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হয়ত আরো বেশী।
শধু বেকারত্বই নয় দেশে ঋণের বোঝাও বেড়েছে। আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে তার ঋণ ৬৭ হাজার ২৩৩ টাকা। গত এক বছেরে বেড়েছে ৭ হাজার ২৩৩ টাকা। আগামী এক বছরে তা আরো ৫ হাজার ৫৪৭ টাকা বাড়বে। দেশে অভ্যন্তরীন এবং আর্ন্তজাতিক বিনিয়োগ পর্যপ্ত না থাকায় একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়ছে না অন্যদিকে সরকারকে দেশ চালাতে হচ্ছে স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে এবং বিদেশ থেকে উচ্চ সূদে ঋণ নিয়ে।
গবেষনা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলছে সরকার ঘোষিত জিডিপির সাথে রপ্তানি ও প্রবাসি আয়ের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না। জিডিপি নির্ধারনে শিল্পখাতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে অথচ বেসরকারি বিনিয়োগের সাথে এর কোন মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা গত ৫ বছরে ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি দেখানো হলেও দেশে দরিদ্রের সংখ্যা আরো বেড়েছে। ২০০৫-১০ সময়ে দারিদ্র বিমোচনের হার ছিলো ১ দশমিক ৭ শতাংশ আর ২০১০-১৬ সময়ে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। এখন প্রশ্ন হলো এই উচ্চ জিডিপির লাভ কার পকেটে গেলো ? নাকি সরকারের দেয়া তথ্যে ভুল আছে ?
২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে দেশের সার্বিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচক নি¤œমুখি হওয়া সত্বেও সরকার উচ্চ জিডিপি দেখাচ্ছে। সরকারের দাবিকৃত জিডিপি বিশ্বাসযোগ্য নয়। জিডিপির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকের মজুরী বারার কথা অথচ সরকারের তথ্য উপাত্তেই বলছে শ্রমিকের মজুরী কমেছে। আয় বৈষম্য বেড়েছে। কর্মসংস্থান কমেছে। সিপিডি‘র দাবি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে তা বাস্তব সম্মত নয়। সিপিডি আরো একধাপ এগিয়ে বলেছে, সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসেব কিভাবে নিরূপণ করেছে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক ।
উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি মানেই উন্নতি, এই ধারণা থেকে উন্নত ও মজবুত অর্থনৈতিক কাঠামো সমৃদ্ধ দেশগুলো যখন সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তখন জিডিপির পিছনে লেগেছে। ১৯৬০ এর দশক পর্যন্ত একটি দেশের উন্নতির পরিমাপক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন ব্যবহৃত হতো। অর্থনীতিবিদরা জিডিপি থেকে সরে এসেছিলেন ৭০ এর দশকে এসে। কারণ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রতি অতি মোহ দেশে আয়বৈষম্য বাড়ায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো যখন বৈষম্যহীন অর্থনৈতীক কাঠামো গড়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশের সরকার তখন উঠে পড়ে লেগেছে প্রবৃদ্ধির দিকে। সেই প্রবৃদ্ধির বিশ্বাযোগ্যতা নিয়েও দেশের অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন এক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি বলতে বোঝায় দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়াই দেশের জাতীয় আয়। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে বোঝায় দেশের প্রকৃত জাতীয় আয় ও প্রকৃত মাথাপিছু আয়ের কাঠামোগত এবং আর্থসামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন। বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি নয়। প্রয়োজন প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ