fbpx
 

আওয়ামী লীগের বয়স কত ৭০ ? নাকি ৪৩ ?

Pub: শনিবার, জুলাই ৬, ২০১৯ ১:৫১ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, জুলাই ৬, ২০১৯ ২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহফুজুর রহমান : ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন বিকেলে পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। সেই হিসাবে আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ২০১৯ সালের ২৩ জুন সারাদেশে ঘটা করে পালন কারা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে প্রচলিত বহুদলীয় সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শমিক আওয়ামী লীগ) গঠন করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৬ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বা অন্যকোন রাজনৈতিক দল এবং কোন প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম দেশে ছিল না। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসাবে রাজনৈতিক দল বিধির আওতায় আবেদনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সহ ২১টি রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অনুমতি দেন। সেনাবাহীনি সমর্থিত সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েম ১৯৭৬ সালের ০৪ আগষ্ট দল গঠনের নীতিমালা (পিপিআর) ঘোষনা করেন। সেই হিসাবে ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই আওয়ামী লীগের বয়স হবে ৪৩ বছর। আর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই এই ০১ বছর ০৬ মাস বাদ দিলে আওয়ামী লীগের বয়স হয় ৬৮ বছর ০৬ মাস।
আওয়ামী লীগের বয়স ৭০, ৬৮ বা ৪৩ যাই হোক নিঃসন্দেহে দল গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ এখন সবচেয়ে আরামদায়ক ও উপভোগ্য সময় পর করছে। আওয়ামী লীগের উত্থান নিয়ে একটি বই লিখেছেন লেখক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহিউদ্দিন আহমদ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর ঢাকার মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিম উদ্দিন। ঢাকার নবাববাড়ীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগে সোহরাওয়ার্দী – আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারিরা নিজেদের অবহেলিত মনে করতেন। তখন তারা ঢাকার মুঘলটুলির ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মী শিবির স্থাপন করেছিলেন। সেখানে তারা একটি নতুন রাজনৈতীক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হক এসে তাদের সাথে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলে ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন দলের নামকরন করা হয় “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ”। পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় “নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ”। দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি হন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আর সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শামসুল হক। সহ-সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহমেদ আলী খান, শাখাওয়াত হোসেন এবং আবদুস সালাম খান। কোলকাতা থেকে এসে তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সাথে যোগ দেয়ায় তাকে কার্যনির্বাহী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কারা হয়। প্রথম ৪০ জনের কমিটি গঠন করা হয়। রোজ গার্ডেনের ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন এ কে ফজলুল হক। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল (বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল) থাকায় তিনি কোন পদে থাকেন নি। আর “নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” এর সভাপতি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান শেখ মুজিবুর রহমান। পরের বছর ১৯৫৩ সালে ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি আর নেজামে ইসলামি পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহন করে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিলো ১৪৩টি আসন। যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানী। ১৯৫৪ সালের নির্বচনে বিজয়ের পর দলের বামপন্থী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যন্যরা দল থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জোর দাবি করেন। যদিও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এর বিরোধীতা করেছিলেন। ১৯৫৫ সালের দলের কাউন্সিলে মুলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।
১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগে ভাঙন দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ তখন পাকিস্তানের সরকারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তির বিরোধীতা করে মাওলানা ভাসানী সহ দলে থাকা অন্যান্য বামপন্থী নেতারা। ওই বিরোধের একটা পর্যায়ে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের সম্মেলনে ভোটাভুটিতে মাওলানা ভাসানী হেরে যান । ১৯৫৭ সালের ১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মাওলানা ভাসানী। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ। ১৯৬৪ সালে হাসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশকে দলের কাউন্সিলের সভায় পুরোপুরি সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। এ সময় দলের মধ্যে রাশিয়া-ভারত ব্লকের আধিপত্ব বরতে থাকায় দলে কোনঠাসা হয়ে পরেন অন্যান্যরা। ১৯৬৬ সালে ০৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণার পর মাওলানা তর্কবাগীশ সহ অন্যান্যরা এর বিরোধীতা করে। ঐ বছর মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুটি দলের নাম থেকে বাদ পরে।

২৫ জানুয়ারি থেকে দেশে কোন রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক কর্মকান্ড ছিলো না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর নানা পট পরিবর্তনের পর সিপাাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে নেতৃত্ব শূন্য বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে সামনে চলে আসেন জিয়াউর রহমান । ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসাবে রাজনৈতিক দল বিধির আওতায় আবেদনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সহ ২১টি রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অনুমতি দেন। ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মহিউদ্দিন আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান বেসামরিকীকরণ কার্যক্রমের দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসাবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৭৮ সালের ০১ মে থেকে আওয়ামী লীগ সহ সকল রাজনৈতিক দলকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার অনুমতি দেন জিয়াউর রহমান। তখন থেকেই আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুজোগ পায়। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন আব্দুল মালেক। তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসাবে ছিলেন।
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের ১৩তম কাউন্সিলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে প্রথম দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সেই থেকে ৩৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে আছেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে দুই বছর ভারত সরকারের তত্বাবধানে ছিলেন। বর্তমানে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রনব মুখার্জির পাশের ফ্লাটে শেখ হাসিনাকে থাকার ব্যবস্থা করেছিলো ভারত সরকার। শেখ হাসিনা দেশে আসার ১২ দিন পরেই ১৯৮১ সালের ৩ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। ১৯৮১ সাল থেকেই শুরু হয় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নতুন যাত্রা। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা জাসদের নেতাদের এবং ভারতের ব্লকের নেতাদের তিনি কাছে টানতে থাকেন। শেখ মুজিবুর রহমানের তীব্র বিরোধীতাকারী ও হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইনু বাদলদের পরবর্তীতে মন্ত্রী পর্যন্ত বানিয়েছেন শেখ হাসিনা। দেশে এসে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতানার দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মতবাদকে দমন করতে শেখ হাসিনা নিজে ও আওয়ামী লীগ সরাসরি কাজ করতে থাকে।
এর ফল আওয়ামী লীগ পায়, যেকোন উপায়ে ক্ষমতায় আসার জন্য মরিয়া আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে। ১৯৯০ এর গণআন্দোলনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকায় ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ। মঈন ফখরুদ্দিনের সহযোগিতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয় আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পূনরায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশের জনগণ ভোট দেক বা না দেক কিংবা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক বা না হোক, যেভাবেই হোক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। এই দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু আওয়ামী লীগ ব্যপক ভাবে জনসমর্থন হারিয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ জনসমর্থন উদ্ধার করতে পরবে কিনা তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ