fbpx
 

গ্যাস বিক্রির মুচলেকা সমাচার: সত্যি মিথ্যা : শামসুল আলম

Pub: বৃহস্পতিবার, জুলাই ১১, ২০১৯ ১:০৩ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জুলাই ১১, ২০১৯ ১:০৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের মিডনাইট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইদানিং একটি অভিযোগ করে থাকেন যে, বেগম খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন আমেরিকার কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে! বিষয়টিকে বানোয়াট বলে বিএনপি খানিকটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বটে, কিন্তু তারপরও শেখ হাসিনা বিরামহীনভাবে ঐ চর্বিত চর্বণ চালিয়েই যাচ্ছেন। তাহলে বিষয়টা কি- একটু তলিয়ে দেখা যাক?

কবে থেকে এই আওয়াজ শুরু করেছেন শেখ হাসিনা?
পত্রিকা ঘাটলে দেখা যায়, ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম বলেন, ‘গ্যাস বেচতে রাজি হইনি বলেই ২০০১ সালে আমাদের ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি।’ পরের মাসে ৫ মার্চ ২০১১ খুলনার খালিশপুর প্রভাতি মাধ্যমিক স্কুল মাঠের জনসভায় শেখ হাসিনা এবার বিএনপিকে জড়িয়ে বললেন, ‘বিএনপি সরকার বিগত দিনে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। আমেরিকান কোম্পানি গ্যাস বিক্রি করবে, আর ভারত তা কিনবে। আমেরিকার ঐরূপ প্রস্তাবে তিনি (হাসিনা) নাকি রাজী হননি, বরং বলেছিলেন, আগে দেশীয় প্রয়োজন মিটিয়ে ৫০ বছরের মজুদ থাকলে তারপরে গ্যাস বিক্রি করা যেতে পারে।’ (প্রথম আলো, ৬ মার্চ ২০১১)। এরপরে ২৪ ও ২৫ মার্চ ২০১১ জাতীয় সংসদে তিনি আরও বিস্তারিত ভাবে বললেন, ‘২০০১ সালে ওই নির্বাচনে জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছিল। কিন্তু গ্যাস বেচতে রাজি হইনি বলেই ক্ষমতায় আসতে পারিনি। ওই গ্যাস আমেরিকা কিনে ভারতের কাছে বেচতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা তাতে রাজি হইনি।’ এ বিষয়ে তিনি একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে সংসদে জানান, “২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের বাসায় আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছিল। এ বৈঠকে আমি ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ও মরহুম আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া অংশ নেন। বৈঠকে বললাম, ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ রেখে রপ্তানির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ কথা বলে চলে এলাম। বিরোধীদলীয় নেত্রী থেকে গেলেন। এরপর যা হওয়ার তা-ই হলো। তিনি ক্ষমতায় গেলেন।”

পরবর্তীতে একটা লম্বা বিরতি দিয়ে ২০১৭ সালের মার্চ মাসের ১১ তারিখে রাজধানীতে যুব মহিলা লীগের সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে আবার জোরেশোরে একই বক্তব্য শুরু করেন। এবারে তিনি গল্পটিকে আরও লম্বা করেন! এবং তাতে যুক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে। ২০০০ সালে বিল ক্লিনটনের ঢাকা সফরকালেও নাকি তাকে (হাসিনাকে) গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তিনি (হাসিনা) নাকি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উক্তরূপ বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলেন, হাসিনার উত্থাপিত গ্যাস বিক্রির মুচলেকা গল্পটি সর্বৈব মিথ্যা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি (হাসিনা) কিভাবে এমন কথা বলছেন? ২০০১-এর ক্ষমতায় আসার আগের ঘটনা যদি এটা হয়, তখন তো বিএনপি বিরোধী দলে ছিল। তাহলে বিএনপি মুচলেকা দিল কিভাবে? তাছাড়া ক্ষমতায় এসে বিএনপি যে ভারতকে কোনো গ্যাস দেয়নি, তা তো সকলেই দেখেছেন। এতে পরিষ্কার প্রমান হয় যে, শেখ হাসিনার ঐ অভিযোগটি আসলে একটি স্টান্ডবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। এরপর প্রশ্ন উঠবে, হাসিনার কথামতো তবে কি গ্যাস বিক্রি না করায় ২০০৮ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি? অথবা শেখ হাসিনা কি গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েই ২০০৮ বা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় গেছেন?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু বলেন, ভিত্তি, সত্যতা ও প্রমাণ ছাড়া কোনো স্টেটমেন্ট কেউ করে থাকলে তাঁকে কিংবা তাঁদেরই তা প্রমাণ করতে হবে। আমাদের কিছু বলার নেই।
অন্যদিকে বিএনপির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ ধরনের কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা জনগণকে অস্বীকার করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের নির্বাচন ছিল অবাধ ও নিরপেক্ষ। জনগণের ভোটেই বিএনপি ক্ষমতায় গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তিনি (হাসিনা) বলেছেন, ২০০১ সালে ভারতের ‘র’ এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। হঠাৎ করে শেখ হাসিনার ‘র’ এর বিরুদ্ধে বক্তব্যপ্রদান বেশ রহস্যজনক। ‘র’-এর বিরুদ্ধে তার এ বক্তব্য একটি পাতানো খেলা ও তামাশারই অংশ বলে আমরা মনে করি।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. হুমায়ূন কবীর এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো সংবেদনশীল বিষয় জনসমক্ষে বলার সময় যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উপস্থাপন করলে লোকজনের বুঝতে সুবিধা হয়।

বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকতে তিনি কি এ অভিযোগ তুলেছিলেন?
২০০১-০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায়, তখন শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। এই পিরিয়ডে তিনি কি সংসদে বা বাইরে বিএনপির বিরুদ্ধে এই তথাকথিত “গ্যাস বিক্রির মুচলেকা” সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ করেছিলেন বা বক্তব্য দিয়েছিলেন? আমরা কিন্তু এমন কিছু জানি না। তখন জনগন তার ঐরূপ কোনো কিছু শুনতে পায়নি। ২০০১ সালে হাসিনা ক্ষমতা হারিয়েছেন, এটা তার কাছে খুবই সিরিয়াস বিষয় হওয়ার কথা, আর যদি কোনো তথাকথিত মুচলেকার কোনো বিষয় থাকত, তবে তিনি অত্যন্ত বাজেভাবে তা ব্যবহার করে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলতেন। নাই জিনিসকে তিনি বানিয়ে বানিয়ে বিশ্বভ্রমান্ড কাঁপাতে ওস্তাদ। কারণ ওটাই তার অভ্যাস এবং চরিত্র। তাই গ্যাস বিক্রির মুচলেকা সংক্রান্ত কোনো নূন্যতম বিষয় থাকলে তিনি সেটা কোনো অবস্থাতেই ছাড়তেন না। বরং ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর নির্বাচনে হেরে যাবার পর ডে ওয়ান থেকে তিনি চিৎকার করে বিশ্ব কাঁপিয়ে তুলতেন, এবং এটা নিয়ে তিনি পুরো পাঁচ বছর অবশ্যই দেশময় উলটপালট করে ফেলতেন। কিন্তু সত্যি সত্যি তাকে তেমন কিছু করতে দেখা যায়নি। এর মানে দাড়াচ্ছে, মুচলেকার ঐ অভিযোগটি আসলে সত্যি নয়, বরং ২০০৯ সালে ক্ষমতায় বসার পরে নতুনভাবে সৃজণ করা।

কার্টার প্রসঙ্গঃ
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০০১ সালের ১লা আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের এনডিআইর (ন্যাশনাল ডেমোক্রোটিক ইনিস্টিটিউটের) প্রতিনিধি হয়ে তিনি ঢাকায় ঐ সফর করেছিলেন বাংলাদেশের আসন্ন ১লা অক্টোবরের নির্বাচনের পরিবেশ দেখতে। এ নিয়ে পিপলস ডেইলি ও কার্টার সেন্টারের রিপোর্ট, “Former US President Carter to Assess Bangladeshi Election Environment- Carter’s visit is part of the non-governmental initiatives by global organizations to watch the coming parliamentary election. Observers feel that Carter’s visit demonstrate the support of the international community for a fair and peaceful election in Bangladesh. Former Prime Minister Sheikh Hasina, also pledged not to boycott the next Parliament and to help ensure that the opposition plays a meaningful role in the new legislature, no matter which party formed the government. I have called on Khaleda Zia to respectfully the pre-electoral agreements to ensure a full and legitimate role for the opposition under the new government, especially in Parliament and with respect to the role of the Speaker”. অর্থাৎ ১লা অক্টোবরের নির্বাচনের পরিবেশ দেখতে প্রেসিডেন্ট কার্টারের বাংলাদেশে সফর। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেসরকারী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণের অংশ হিসাবে প্রেসিডেন্ট কার্টার তিন দিন ব্যাপী ঢাকা সফর করেন। পর্যবেক্ষরা মনে করেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে কার্টারের এই সফর সহায়ক হবে। সফরকালে তিনি প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান, এবং দুইনেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ঐ বৈঠকে শেখ হাসিনা তাকে কথা দেন, যে পার্টিই ক্ষমতায় যাক না কেনো, সংসদ বয়কট করবেন না, এবং সংসদকে কার্যকর করতে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখবেন। অন্যদিকে, বেগম খালেদা জিয়াও কথা দেন যে, নির্বাচন আয়োজনের প্রতি তাঁর আস্থা আছে, এবং নতুন সরকারে ও সংসদকে কার্যকর করতে বিরোধী দলের আইনসঙ্গত ভূমিকা পালনের উপর জোর দেন, বিশেষ করে স্পিকারের ভূমিকা। এই আলোচনায় গ্যাস বিক্রির শর্ত বা মুচলেকার মত কোনো চমক লাগানো বিষয় ছিল না। এরূপ কোনো বিষয় কি নির্বাচনের পরিবেশ সংক্রান্ত প্রকাশ্য আলোচনায় আসতে পারে? মানুষের কমনসেন্স কি বলে? প্রেসিডেন্ট কার্টার কি এতটাই অবিবেচক বা বুদ্ধিহীন ছিলেন যে, বিবদমান উভয়পক্ষের সামনে গ্যাস বিক্রির মত একটি ব্যবসায়িক আলাপ বা তথাকথিত শর্ত নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন? এরকম বিষয় কল্পনা করাও যে অসম্ভব! কেবল কোনো রংহেডেড বা মাথাখারাপের পক্ষেই এমন চিন্তা করা বা গল্প বানানো সম্ভব!

ক্ষমতায় আসতে বিএনপি সেসময় মুচলেকা দিয়েছিলো মন্তব্য করে শেখ হাসিনা দাবী করেন, ‘এটার আমি প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বিএনপি তাদেরকে মুচলেকা দিয়ে দিলো, ক্ষমতায় গেলে গ্যাস তারা বিক্রি করবে।’ আলোচনার এক পর্যায়ে ভোজ থেকে চলে আসার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চলে এলাম। বিএনপির নেতারা ওখানে থেকে গেলেন। তারপর, তাদের মধ্যে গ্যাস বেচার চুক্তি করেই ২০০১ সালে তারা ক্ষমতায় এলো (সুত্র: বাংলা টিবিউন, এপ্রিল ০৬, ২০১৭)।……এখানে দেখা যাচ্ছে- শেখ হাসিনা নিজেই বলছেন, কার্টার সাহেবের ঐ বৈঠক থেকে তিনি ( হাসিনা) ও তার দলের লোকেরা আগেই উঠে এলেন। তাহলে বিএনপি মুচলেকা দিয়েছে, এমন ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী উনি (হাসিনা) কি করে হতে পারেন? এটা কি কোনো বাস্তবসম্মত বয়ান? উনি কি জ্বীন নাকি অশরীরি কোনো দানব? কোথাও থেকে উঠে চলে গেলে সেখানে কি করে আবার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়া সম্ভব? এটা কোনো সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে বোধগম্য নহে। বরং স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলছেন, এবং নিজের ফাউল কথাতে নিজেই ধরা পড়ে গেছেন আদালত ঘোষিত রংহেডেড।

প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ইস্যু:
শেখ হাসিনার বক্তব্য এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং এরপরে নিজেকে আরও অনেক মহান দেশপ্রেমিক (!) ও বিশাল বড় কিছু ফলাতে গল্পটিকে আরও লম্বা করলেন। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে নতুন করে গল্প ফাঁদলেন, এবং টেনে আনলেন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন অবধি। ক্লিনটন সাহেব যুক্তরাষ্ট্রের কর্মরত রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঢাকা সফর করেন ২০০০ সালের ২০ মার্চ, ঢাকায় তখন আওয়ামীলীগ সরকারে। ঐ সফর নিয়ে অনেক অকান্ড হয়েছিল। বিশেষ করে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের বৈঠক বাতিল করতে হাসিনার সরকার যার পর নাই চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে জঙ্গি ভয় দিতে হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের তিন সিনিয়র কর্মকর্তা মস্উদ মান্নান (লীগ নেতা মান্নান সাহেবের ছেলে), হুমায়ুন কবির, এবং মিজারুল কায়েস মিলে ইংরেজী ভাষায় ইসলামী জঙ্গীবাদের নামে ২টি ভুয়া পুস্তিকা তৈরী করে মার্কিন দূতাবাসে পাঠায়, যাতে করে আমেরিকানরা জঙ্গি হামলার আতঙ্কে পড়ে! ‘Politices of Bangladesh: Democracy vs religious fundamentalism’ এবং ‘Fang of fantices’ পুস্তিকা দু’টিতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারের জন্য বিএনপি ও তার সহযোগী শক্তিগুলোকে দায়ী করে তাদের সাথে আফগানিস্তানের আল-কায়েদাকে যুক্ত করে দেয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ও উদ্যোগে ঐ পুস্তিকা প্রচারণার পর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তার বাংলাদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করেন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানীর পাশে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যেতে পারেননি। তবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ঢাকা ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের বলে যান, বাংলাদেশ হলো “Moderate Muslim” দেশ। ঐ পুস্তিকাগুলি পরে কূটনৈতিক ব্যাগযোগে বাংলাদেশের সকল মিশনে পাঠানো হয়, এবং বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিতরণ করে বাংলাদেশকে ইসলামি জঙ্গিপ্রবণ এলাকা হিসাবে প্রচার করা হয়। পুস্তিকা লিখক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐ তিন কর্মকর্তাকে শেখ হাসিনার সরকার নানাভাবে পুরষ্কৃত করে পররাষ্ট্রসচিব ও বড় বড় দেশে রাষ্ট্রদূত বানায়। মোটকথা, বাংলাদেশকে মুসলিম জঙ্গিবাদী দেশ বানাতে শেখ হাসিনার সরকার আগাম প্রচার শুরু করে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ঐ সফরের সময় থেকে! ঐ সফর নিয়ে হাসিনা নতুন বয়ান হাজির করেন যে, ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও নাকি গ্যাস বিক্রি করার শর্ত দিয়েছিলেন, যা তিনি (হাসিনা) তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে দাবী করেন। তবে এটা আমি (লেখক) নিশ্চিত করছি যে, তখন বিল ক্লিনটনের সাথে দু’নেত্রীর একসাথে কোনো বৈঠক হয়নি, ফলে তখন ক্লিনটন সাহেব উভয়কে গ্যাস বিক্রির কোনো শর্ত দিয়েছিলেন, এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নাই। উল্টো ঐসময় হাসিনার সরকারের প্রচন্ড বাধার মুখে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সাথে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠকটি আয়োজন করেছিলাম আমি নিজে (শামসুল আলম)।
https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10155273333763636&set=a.276673213635&type=3&theater

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দেওয়ার অভিযোগ হাসিনা তুললেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নাই। তাছাড়া ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় বসার পর আমেরিকাকে গ্যাস তুলতে কোনো অনুমতি দেয়নি, বা ভারতের কাছে কোনো গ্যাস বিক্রিও করেনি। যদিও তা দেয়ার ক্ষমতা বিএনপির ছিল। এতে করে হাসিনার কথিত ‘গ্যাস বেচার মুচলেকা’র অভিযোগ অসাড় হয়ে পড়ে। তবে, বাস্তবে দেখা গেছে, তবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গোপসাগরের গ্যাসক্ষেত্র অসম শর্তে আমেরিকান কোম্পানির কাছে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। ২০১১ সালের ১৬ জুন শেখ হাসিনার সরকার মার্কিন কোম্পানী কনকোফিলিপকে বিতর্কিত চুক্তিতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ৫,১৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়। ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুলতে আমেরিকা-ব্রিটেনের যৌথ মালিকানার এশিয়া এনার্জিকে ইজারা দিতে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তবে কি ২০০৮-৯ সালে হাসিনা ক্ষমতায় যেতে আমেরিকাকে গ্যাস ও বিদ্যুত দেয়ার শর্তে রাজী হয়েছিলেন? অবশ্য তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, দেশের জন্য গ্যাস রেখে বিক্রি করতে তার কোনো অসুবিধা নাই- তার মানে তিনিও গ্যাস বেচতে রাজী ছিলেন! পরবর্তীতে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা মহেশখালীতে হাইপ্রেসার জোনে গ্যাস অনুসন্ধানে ও তোলার দায়িত্ব দেন ভারতকে। তাই মুখে তিনি যাই বলুন না কেনো, চরম বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র আমেরিকা ও ভারতের হাতেই হস্তান্তর করেছেন শেখ হাসিনা! মানে দাড়ায়, গ্যাস উত্তোলন হলে তারা গ্যাস রপ্তানী করতে পারবে। এভাবেই কি মুচলেকার শর্ত পূরণ করলেন মিডনাইট প্রধানমন্ত্রী? আর শুধু গ্যাসক্ষেত্র কেনো, ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা বহু গোপন চুক্তি করেছেন, যা তিনি নিজেই বলে ফেলেছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে” (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ৩১ মার্চ ২০১৮)। যা কিছু দিয়েছেন ও গোপন চুক্তি করেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা থাকলেও সেসব সংসদে তোলেননি। গোপন চুক্তির শর্তগুলো জনগন জানতে পারেনি। তাই জনগনের প্রশ্ন, দেশের ক্ষতি করে কি কি অন্যায্য শর্তে চুক্তিতে আমেরিকা ও ভারতকে জাতীয় সম্পদ দিয়ে ও স্বার্থ ছেড়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন তিনি?

এখানে আরেকটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন যে, হাসিনা গ্যাস বিক্রির আমেরিকান শর্তের কথা বলছেন দু’জন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে। মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্টারকে নিয়ে গল্পটা বলেছেন, যে সফরটি হয়েছিল ২০০১ সালের আগস্ট মাসে। আর দ্বিতীয় গল্পটি করছেন কর্মরত প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে নিয়ে, যিনি বাংলাদেশে আসেন তারও দেড় বছর আগে ২০০০ সালের ২০ মার্চ। এই ক্লিনটন সাহেবও নাকি হাসিনাকে গ্যাস বিক্রির শর্ত দিয়েছিলেন। তাহলে হাসিনার কতামত, আগে ঘটেছিল ক্লিনটনের ঘটনা। কিন্তু তখন ক্লিনটনের সাথে দু’নেত্রীর বৈঠক হয়েছিল আলাদা ভাবে। সে সময় বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী। স্বাভাবিকভাবে তার হাতে গ্যাস বিক্রি করার কোনো ক্ষমতাই ছিল না, তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন গ্যাস বিক্রি সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবও তখন দিতে পারেন না। এর অর্থ দাড়ায়, হাসিনা যে গল্পটি বলেছেন, এটি একটি মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্য। অতএব, যেহেতু ক্লিনটন সাহেবকে নিয়ে হাসিনা গ্যাস বিক্রির মিথ্যা গল্পটির সুত্রপাত ঘটিয়েছেন, কাজেই পরের কার্টারের গল্পটিও মিথ্যা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ‘গ্যাস বেচতে বিএনপির মুচলেকা’ সংক্রান্ত গল্পটির কোনো প্রমাণ বা সত্যতা বা যুক্তিসঙ্গত কেনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেলো না। ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে বিএনপি যদি ক্ষমতায় এসে থাকত, তবে সেটার একটা আউটকাম তো থাকত, নাকি? ইতিহাস কিন্তু সাক্ষ্য দেয় ভিন্ন কিছু- বিএনপি ভারতকে কোনো গ্যাস দেয়নি, এটাই সত্য। তার মানে দাড়াচ্ছে, ‘গ্যাস বেচতে মুচলেকা’- এটি হাসিনার একটি উলঙ্গ মিথ্যাচার! জনসাধারণ জানে, এসব করে তিনি বেশ মজাই পান! গোয়েবলসের থিউরি মেনে তিনি একটি মিথ্যা কথা বার বার বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চান, বা মানুষকে কনফিউজড করতে চেষ্টা করেন। তার কৌশল হলো, মিথ্যা হলেও একই কথা বার বার বললে কিছু না কিছু তো পাবলিকের মাথায় ঢুকাবে! গ্যাসবিক্রি নিয়ে তার ক্রমাগত বক্তব্য যে পাগলের প্রলাপ, তা ইতোমধ্যে মানুষের কাছে ধরা পড়ে গেছে। কেননা, তিনি প্রথমে বললেন, গ্যাস বিক্রি করতে তিনি (হাসিনা) রাজী হননি তাই তিনি ক্ষমতায় আসতে পারেননি! পরে তাতে ঢোকালেন বিএনপিকে! এরপরে টেনে আনলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কাছে মুচলেকা! সবার শেষে আনলেন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের নাম! এভাবেই তিনি ক্রমাগতভাবে মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন, যখন যেমন খুশি! একজন আদালত ঘোষিত রংহেডেড বা উন্মাদ ইচ্ছেমত মিথ্যাচার ও আউল বাউল বক্তব্য দিতেই পারেন, তবে তা নিয়ে মার্কিন দূতাবাস যেমন কোনো বক্তব্য দেয় না, তেমনি বেগম খালেদা জিয়ারও জবাব দিতে রুচিতে বাধে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনা বিএনপির নামে গ্যাস বেচার এই মিথ্যাচার কেনো করতে গেলেন? এর জবাব অন্যত্র পাওয়া যাবে, তারই বক্তব্য থেকে, যেখানে তিনি বলেছেন, “যার মনে যেইটা, ফাল দিয়ে ওঠে সেইটা”, অর্থাৎ উনার (হাসিনার) মাথায় যেহেতু গ্যাস বিক্রি করে বা গ্যাসক্ষেত্র দিয়ে হলেও সরকারে যাওয়ার ফন্দি ছিল, তাই তিনি সেটা আগেই অন্যের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকতে পারেন! তবে এসব করে বেশি দিন পার পাওয়া যায়না। আসল সত্যটাই বেরিয়ে আসে দ্রুতই।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ